১৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১:৫৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০২০
ফারুক আনসারি : করোনাভাইরাসের প্রাণঘাতী মহামারীতে গোটা বিশ্ব আজ আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করছে। প্রতিটি দেশ নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করছে। প্রতিটি দেশই খুব চিন্তাভাবনা করে শান্তভাবে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে, যেকোনোভাবেই হোক নিজেদের জনগণকে এ প্রাণঘাতী মহামারী থেকে বাঁচাতে হবে। প্রতিটি দেশে সরকার ও বিরোধীদল এক জোট হয়ে এ মহামারীকে পরাস্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতে উল্টো স্রোত বয়ে চলেছে।
সরকারি দলের লোকজন প্রকাশ্যে একে ধর্মীয় আবরণ দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ও পোষ্য মিডিয়া রাত-দিন এ চিন্তায় ব্যস্ত যে, যেভাবেই হোক করোনাকে মুসলমানদের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এর আড়ালে পুরো দেশে মুসলমানদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। এরা কতটা সঙ্কীর্ণমনা ও মানবতার শত্র“, যারা এমন বিপদের মুহূর্তেও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ এমন পরিস্থিতিতে পুরো দেশকে এক হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কেননা, করোনা কোনো সাধারণ মহামারী নয়, বরং এটা এক আসমানি বিপদ। সবাইকে এক হয়েই এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আর এটা সামান্য কয়েকদিনের লকডাউনেই শেষ হয়ে যাবে না। বরং আরো অনেক দিন এর সাথে লড়াই করতে হবে।
সতর্কতার সাথে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ধৈর্য ধারণ করতে হবে। অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু আফসোসের বিষয়, আজ ত্যাগের পরিবর্তে সঙ্কীর্ণমনা লোকেরা এ করোনাকেও হিন্দু-মুসলিম বানাতে তৎপর। ভারতে করোনার আতঙ্ক বাড়তে শুরু করে ১৮ মার্চ। এ জন্য ১৯ মার্চ রাত ৮টায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে ভাষণে ২২ মার্চ জনতা কারফিউ জারি করেন। এরপর সারা ভারতে করোনার ভয়ঙ্কর থাবা ছড়িয়ে পড়ে। ২২ মার্চ চলে গেল। ২৩ মার্চ মহারাষ্ট্রে আট দিনের জন্য লকডাউন দেয়া হলো। পরের দিন ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী আবারো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং ভারতে ২১ দিনের লকডাউন ঘোষণা করলেন। এর দুদিন পর ২৬ মার্চ দিল্লির হজরত নিজামুদ্দীন তাবলিগের মারকাজের ঘটনা সবার সামনে এলো। সেখানে উপস্থিত এক হাজার ৮০০ মানুষ ভারতের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াল। অথচ সরকারকে গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল- ১৩ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তাবলিগি ইজতেমার অনুষ্ঠান সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য ছিল। কিন্তু সরকার এটা নিয়ে কোনো আপত্তি করেনি।
যখন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো মারকাজের বিষয়টি সামনে নিয়ে এলো, তখন তাবলিগের মারকাজের আমির মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে পুলিশ এফআইআর নথিভুক্ত করে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত পোষ্য মিডিয়া চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছে, ভারতে তাবলিগ জামাতের লোকেরাই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। ভারতের যেখানেই কোনো দাড়ি-টুপিওয়ালা করোনা উপসর্গ রোগী পাওয়া গেছে, তাকেই এ তাবলিগের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে। এ সব উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর জানা নেই যে, তাবলিগ জামাত কী? তারা শুধু দাড়ি-টুপিওয়ালা ব্যক্তির সাথে প্রকাশ্য বিবাদের ময়দান খুলে বসেছে। মুম্বাইয়ে ফ্লপ মহারাষ্ট্রীয় রাজনীতিবিদ রাজঠাকরে বলেন, তাবলিগ জামাতের যে কেউ করোনা আক্রান্ত হবে, তাকে গুলি করা উচিত। রাজঠাকরে কি জানেন, তাবলিগ জামাত কী? এর লক্ষ্য কী? কিন্তু তিনি তার অভ্যাসের সেবাদাস হয়ে হিন্দুত্ববাদের পোশাক পরিধানের পর এ ধরনের বক্তব্য দেয়ার জন্য খ্যাতিও অর্জন করেছেন। একইভাবে বিজেপির কয়েকজন নেতা তাবলিগ জামাতকে পুঁজি করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করেছেন। তাবলিগ জামাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণারও কথা অবিরাম বলা হচ্ছে।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, যিনি দিল্লি দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের খোঁজখবর নেয়ারও সুযোগ পাননি, তিনি এ কথা বলে নিজের আঁচল রক্ষার চেষ্টা করেছেন, পুলিশ কেন্দ্রের অধীনে। যদি পুলিশ কেন্দ্রের অধীনস্তই হয়, তাহলে আপনি তাবলিগ জামাতের বিরুদ্ধে এফআইআর নথিভুক্তের কথা কেন বললেন? করোনাভাইরাস হোক, কিংবা অন্য কোনো প্রাণঘাতী মহামারী হোক, এগুলো সম্পর্কে মুসলমানদের বিশ্বাসÑ এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে আসে। আমরা এগুলো সত্য মেনে নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা করলে দেখতে পাই, এ ভারতে মুসলমানদের সাথে জুলুম-নির্যাতন কম হয়নি। আমরা কখনোই খোলাখুলি তা প্রকাশ করিনি। বরং প্রতিটি জুলুম সহ্য করে চলেছি। ভারতজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে তাবলিগ জামাতের কী ধরনের ভূমিকা রয়েছে, এটা কেউ স্পষ্ট করে বলছে না। সবাই শুধু দোষারোপ করে যাচ্ছে। মৃত্যু চিরন্তন সত্য। তার সময় নির্ধারিত। কিন্তু আজ মানুষ ভাগ্যের এই নির্মম লিখনের কাছে মার খাওয়ার পরও এটাকে খেলতামাশা মনে করছে। তারা এ মহামারীকেও ধর্মীয় আবরণ দিচ্ছে। সারা ভারতে করোনায় প্রায় ৩৯৬ জন লোক (১৫ এপ্রিল পর্যন্ত) মারা গেছে। তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ৪০ থেকে ৮০-৯০ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে যারাই মারা গেছে, তাদের সবাইকে করোনা আক্রান্ত বলা হয়েছে। অথচ এসব মৃতদের মধ্যে কিছু হার্ট অ্যাটাকে, কিছু টিবিতে, কিছু দীর্ঘ জ্বরে, কিছু কিডনি অকেজোতে এবং কেউ হাঁপানি রোগে মারা গেছে। যখনই এদের কেউ মারা গেছে, তখনই তাদের করোনা সন্দেহ করে তাদের পরিবারগুলোকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে। একে তো ভারতে উপকরণের যথেষ্ট অভাব রয়েছে, কিন্তু ভারত এখনো এটাকে সাম্প্রদায়িকতার রঙ দিতে ব্যস্ত। অথচ চীন, যেখান থেকে এ রোগ ছড়িয়েছে, তারা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আজ তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আফসোস হয়, ভারত আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে নিয়ে বর্তমান পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে ফল দাঁড়ায়, ভারত উন্নয়নের পথে অনেক পেছনে চলে গেছে। ভারতের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে। বড় বড় শিল্প ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুই কোটি মানুষ বেকার হয়ে গেছে। সরকারের এ নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। বরং তাদের চিন্তা ছিল তিন তালাক, রামজন্মভূমি, কাশ্মির থেকে ৩৭০ ধারা বিলুপ্তি এবং রুপির ধাক্কাধাক্কিতে সরকার ভাঙা ও গড়ার। এ জন্য ভারত আজ এতটা পিছে চলে গেছে যে, তাকে আবার আসল অবস্থায় ফিরে যেতে ১০ বছর সময় লাগবে। তবে যদি এই সরকারই বিদ্যমান থাকে, তাহলে উন্নয়নের দিকে এক পা চলাও বেশ কঠিন হবে। ভারত শত শত বছর ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে টিকে আছে। তাকে ভেঙে দিয়ে এবং ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর যে দর্শন চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়েছে, তাতেই ভারত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই টাটকা নমুনা করোনাভাইরাস। যাকে তাবলিগ জামাতের সাথে যুক্ত করে এ দোষারোপ করা হচ্ছে যে, মুসলমানরা ষড়যন্ত্র করে ভারতে করোনা ছড়িয়েছে। এটা তো ভাবা উচিত যে, এ ধরনের অপবাদ লাগানোর পরিণামটা কী হবে? সবার বিবেকে কি ছাই পড়েছে? উপরওয়ালা সবকিছু দেখেন ও বুঝেন। কিন্তু ভারতের রাজনীতিবিদরা কিছুই বুঝছেন না। এমন নাজুক ও কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা ধর্মীয় বিদ্বেষের খেলা খেলে যাচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক উর্দুটাইমস থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D