ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে সিলেট, ভোগান্তিতে এসএসসি শিক্ষার্থীরা

প্রকাশিত: ৮:৪৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২৬

ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে সিলেট, ভোগান্তিতে এসএসসি শিক্ষার্থীরা

হঠাৎ করেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে সিলেট। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শীঘ্রই এর উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলেও জানান সিলেটের বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। এই সময়ে লোডশেডিং বৃদ্ধি শিক্ষার্থীদের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো।

এদিকে লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, এমনিতেই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। এরমধ্যে দিনভর ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনমনে নাভিশ্বাস উঠছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দা ভাবের মধ্যে দিনব্যাপী ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিংয়ের কারণে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে গ্রীষ্মের শুরুতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। উৎপাদন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। তবে এর কার্যকর কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছেনা।

সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সিলেট অঞ্চলে পিডিবির ১৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলেছে ১৩০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৪০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ২৫ শতাংশ।

এদিকে সিলেট জেলায় ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ৮৩ মেগাওয়াট। জেলায় বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে ২৮ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয়েছে ২৫ শতাংশের বেশী।

যদিও পিডিবির এই হিসেবের সাথে বাস্তবতার তেমন মিল পাওয়া যাচ্ছেনা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১২ ঘন্টার মধ্যে গড়ে ৭ ঘন্টার বেশি বিদ্যুৎ মিলেনি। সেই হিসেবে লোডশেডিং হয়েছে কম হলেও ৫০ শতাংশ। কিন্তু পিডিবির হিসেব বলছে ২৫ শতাংশ লোডশেডিংয়ের কথা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, হঠাৎ চাহিদা বেড়েছে। সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি, ফলে সরবরাহ কম থাকায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আপাতত এই অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা নেই। কারণ জাতীয়ভাবে উৎপাদন না বাড়লে লোডশেডিং কমার সম্ভাবনা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে বাড়ছে লোডশেডিং। নগরীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রাখা হলেও গ্রাম অঞ্চলে সারাদিনে গড়ে ৬/৭ ঘণ্টা মিলছেনা বিদ্যুৎ।

এদিকে, পরিস্থিতি সামাল দিতে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধসহ বেশ কিছু কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে আনা হয় পরিবর্তন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আংশিকভাবে অনলাইনে পরিচালনার কথাও বিবেচনায় আছে। এত কিছুতেও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলছেনা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির উৎপাদন ও চাহিদার পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবারের গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা থাকছে। তবে জ্বালানি (গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল) সংকটের কারণে এ পরিমাণ বিদ্যুতও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, গত কয়েকদিন থেকে সিলেটে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় গরমে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। লোডশেডিংয়ের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ঘরে বাইরে কোথাও একটু স্বস্তি মিলছেনা। দিনের বেলায় ১ ঘন্টা পর পর থাকছেনা বিদ্যুৎ। এমনকি রাতেও একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের তীব্রতা ও লোডশেডিংয়ে সীমাহিন দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থরা পড়েছেন বিপাকে। তীব্র গরমে অতিরিক্ত ঘেমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই। অফিস-আদালতে কাজে নেমে এসেছে স্থবিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব।

জানা গেছে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের তেমন আশার বাণী শুনাতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে গরমে চাহিদা বেড়েছে কিন্তু সেই আলোকে উৎপাদন বাড়েনি। তাই সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। শহরে লোডশেডিং ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হলেও উপজেলা পর্যায়ে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। গ্রামীণ এলাকায় দিনে গড়ে ৬-৮ ঘন্টা বিদ্যুৎ মিলছেনা।

সিলেটের ব্যবসায়ী মতিউর রহমান জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু ডিজেলও কিনতে মিলছেনা। ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে খরচ বৃদ্ধি পেলেও বাড়ছেনা উৎপাদন।

সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। উপজেলা পর্যায়ে প্রতিদিন কমপক্ষে সাত থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বেশি হয়। শহর থেকে গ্রাম, সবখানে ভয়াবহ লোডশেডিং। গ্রামে রাত-দিন সমানতালে চলে লোডশেডিং।

এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকাগুলো পিডিবি’র অধীনে থাকায় অনেকটা রুটিন করে লোডশেডিং করা হয়। তবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীনে থাকা গ্রামীণ জনপদের মানুষকে কঠিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গ্রামে ২৪ ঘণ্টার বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎহীন থাকে বলে অভিযোগ করেন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারা। গত রোববার (১২ এপ্রিল) থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে বলেও জানিয়েছেন গ্রামীণ জনপদের লোকজন।

এ ব্যাপারে গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা জাকারিয়া তালুকদার বলেন, এক সপ্তাহেরও কম সময় পর অর্থাৎ ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু। এখন যেভাবে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা আছে। একঘণ্টা পাওয়া গেলে দুই ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হয়। এভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে।

সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ একটি বিপনী বিতানের স্বত্তাধিকারি আনোয়ার হোসেন বলেন, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। সকালে খুলতে খুলতে ১১টা বেজে যায়। এরমধ্যে সারাদিনের অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ থাকেনা। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করা ছাড়া কোন উপায় নেই।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট