অভিশংসিত হওয়া তিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

প্রকাশিত: ৯:৫৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

অভিশংসিত হওয়া তিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদিত হয়েছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে। এর মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসিত হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসিত হয়েছিলেন অ্যান্ড্রু জনসন ও বিল ক্লিনটন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের কারণে দায়িত্ব ছাড়তে হয়নি। এক নজরে তাদের অভিশংসিত হওয়ার কারণ সম্বন্ধে জেনে নেওয়া যাক।

অ্যান্ড্রু জনসন : ১৮৬৮
১৮৬৪ সালে আব্রাহাম লিংকনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন জনসন। লিংকনের দ্বিতীয় মেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল, গৃহযুদ্ধ অবসানের পর কীভাবে কনফেডারেট অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে তা। লিংকনের পুনর্গঠন পরিকল্পনা ছিল সময় সাপেক্ষ। দক্ষিণের রাজনীতিকদের শাস্তি এবং মুক্ত দাসদের পূর্ণ নাগরিক সুবিধা দেওয়ার পক্ষে ছিলেন তার দলের তথাকথিত র‍্যাডিক্যাল রিপাবলিকানরা।

দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৪২ দিনের মধ্যে হত্যা করা হয় লিংকনকে। এর ফলে পুনর্গঠনের দায়িত্ব বর্তায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসনের কাঁধে। দ্রুতই কংগ্রেসে র‍্যাডিক্যাল রিপাবলিকানদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। তিনি কনফেডারেট নেতাদের ক্ষমা ও দাসদের রাজনৈতিক অধিকারের প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে বিরোধিতা করেন। ১৮৬৭ সালে কংগ্রেস ‘টেনার অব অফিস’ আইন পাস করে। এই আইনের ফলে সিনেটের অনুমোদন ছাড়া মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে অব্যাহতি দিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়।

এই আইনকে অসাংবিধানিক মনে করে অনড় জনসন তার যুদ্ধমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন। যিনি ছিলেন কংগ্রেসের র‍্যাডিক্যাল রিপাবলিকানদের একজন মিত্র। জনসনের বিরোধিরা প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসন প্রস্তাব আনেন। প্রতিনিধি পরিষদে ১২৬-৪৭ ভোটে অভিশংসিত হন এই প্রেসিডেন্ট।

বিল ক্লিনটন : ১৯৯৮
হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব নেওয়ার পরই আইনি জটিলতা ও যৌন কেলেঙ্কারির মুখে পড়েন ক্লিনটন। ১৯৯৩ সালে ক্লিনটন ও ফার্স্ট লেডি হিলারি তথাকথিত ‘হোয়াইটওয়াটার বিতর্কে’ জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের তদন্তের মুখে পড়েন। ১৯৯৪ সালে ক্লিনটনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন পাওলা জোন্স নামের এক নারী। তিনি দাবি করেন, ১৯৯১ সালে একটি হোটেল কক্ষে তাকে হয়রানি করেন ক্লিনটন।

ক্লিনটনের অভিশংসিত হওয়ার পেছনে এই দুইটি অভিযোগের ভূমিকা ছিল। স্বতন্ত্র কাউন্সিলর কেনেথ স্টারকে হোয়াইটওয়াটার ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেয় জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু তিনি অভিশংসন করার মতো কোনো প্রমাণ পাননি। তবে জোন্সের আইনজীবী একটি গোপন খবর পান যে, হোয়াইট হাউসের ইন্টার্ন মনিকা লিওনস্কির সঙ্গে ক্লিনটনের যৌন সম্পর্ক রয়েছে। যদিও এই অভিযোগ লিওনস্কি ও ক্লিনটন উভয়েই অস্বীকার করেন।

কেনেথ স্টার তার তদন্তের মনোযোগ এই অভিযোগের দিকে দেন। মূলত লিওনস্কি ও হোয়াইট হাউসের সাবেক কর্মী লিন্ডা ট্রিপের ২০ ঘণ্টার ফোনালাপ তার হাতে আসার পর এই উদ্যোগ নেন তিনি। ওই ফোনালাপে লিওনস্কি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এরপর স্টার এফবিআইর একজনকে আড়িপাতার যন্ত্রসহ রিৎজ কার্লটন হোটেলে লিওনস্কির কাছে পাঠান। সেখানে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন হোয়াইট হাউসের এই ইন্টার্ন।

পুরো ঘটনা যখন প্রকাশ হয়ে পড়ে ক্লিনটন বাধ্য হন অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে। এজন্য টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। স্টারের তদন্ত দল লিওনস্কির সঙ্গে ক্লিনটনের যৌন সম্পর্কের ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে তারা তুলে ধরেন যে, তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে ক্লিনটন মিথ্যাচার করেছেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রতিনিধি পরিষদ বিল ক্লিনটনকে অভিশংসিত করে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প : ২০১৯
তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে এ অভিশংসন প্রস্তাব পাস হয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে দেখা যায়, সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে রীতিমতো চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। ওই ফোনালাপের ভিত্তিতে গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার পর ট্রাম্পের অভিশংসনের দাবি সামনে আসে। তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে তদন্ত শুরু করে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ। ১৩ ডিসেম্বর পরিষদের হাউজ জুডিশিয়ারি কমিটিতে অভিযোগের ওপর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলে ২৩-১৭ ভোটে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হয়। আর বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) প্রতিনিধি পরিষদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ২২৯ জন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের অভিশংসনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ১৯৭ জন রিপাবলিক প্রতিনিধি।

সূত্র- সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট