১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬:৩৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২৫
মোঃ শামছুল আলম
‘আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান,
সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।
ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়ায় বায়ু
কলমি লতায় দোলন লেগেছে, ফুরাল ফুলের আয়ু।’
[“সুখের বাসর” ‘নক্সীকাথার মাঠ’]
ঋতুচক্রের পরিক্রমায় বঙ্গঋতুনাট্যে শরতের পরে শূন্যতা, রিক্ততা ও বিষণ প্রকৃতির মেদুরতাহীনতায় আবির্ভূত হয় হেমন্ত ঋতু! শরৎ প্রকৃতির বহু বর্ণিল ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের স্নিগ্ধতার আবেশ মানবমনে শিহরণ তোলে না, শিহরণ তোলে হিমসমীরণে অদূরবর্তী তুষরের আগমনীবার্তা! হেমন্ত ঋতুর প্রারম্ভে ব্যাপ্তচরাচরে বিস্তীর্ণ নয়নসম্মুখে কেবলই বৈরাগ্যের বিষন্নতা, হতাশা ও রিক্ততার অশুভ ধ্বনি। কিন্তু পক্ষকাল অন্তে হেমন্তের শুভাশিসে রাশি রাশি ভারা ভারা কনক আভাময় পাকা ধান মাঠে মাঠে শোভা পেতে থাকে! রৌদ্রখর তপ্তদাহ উপেক্ষা করে যে কৃষক ফলিয়েছে সোনা ধান ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে তার অন্তঃস্তল থেকে বেরিয়ে আসে প্রাপ্তির নির্মল হাসি! প্রকৃতির এই যে কল্যাণময়ী রূপশ্রী, অকাতরে অন্নের সংস্থান বঙ্গবাসীকে প্রাচুর্যময়ী হেমন্তের অকৃপণ ভালবাসারই নামান্তর!
“বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে,
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে,
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।”
রবি ঠাকুরের- সে আহ্বানেই মায়াময় স্নিগ্ধরূপ নিয়ে এসেছে হেমন্তের সকাল! সকালের প্রথম রোদের বর্ণচ্ছটায় গাছের পাতাগুলো খিলখিল করে হেসে ওঠে! ঝলমল করে ওঠে, তখনই হালকা শীতের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে!
দৃষ্টিসীমা যতোদূর গিয়ে পৌঁছে দেখা যায়, আলোকজ্জ্বল অপূর্ব একটি সকাল তার অভাবনীয় সৌন্দর্য নিয়ে যেন অপেক্ষমান! গাছেদের নরম-কচি পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি রোদ আর সুনীল আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে! প্রকৃতির মাঝে এভাবে সৌন্দর্য ফুটে ওঠার ছবিটি দৃশ্যমান হয়ে থাকে বলেই বোধ হয় দৃশ্যময়তার বিবেচনায় হেমন্তের প্রতিটি সকালই শ্রেষ্ঠ!
ধানের শীষে, ঘাসের বুকে, পাতার শরীরে শিশির জমে থাকার গভীর সৌন্দর্যের পটভূমি তুলে ধরে বলেই প্রতিটি হেমন্তের সকালের রয়েছে নিজস্বতা। প্রকৃতি এমন একটি অভাবনীয় রৌদ্রোজ্জ্বল হেমন্তের সকালের রূপ আমাদের সামনে তুলে ধরে যেন সফলতার চিত্রই উপহার দিচ্ছে!
জীবনযাপনের যন্ত্রণাকাতর দীর্ঘ পটভূমি পেরিয়ে এমনই একটি আলোকময় চিরসুন্দর সকালের অনুপ্রেরণাই যেন কাম্য আমাদের। আমাদের আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে সত্য ও সুন্দরের অনুভূতি নিয়ে কর্তব্য-কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ার সংকল্প যেন প্রকাশ করছে সকালটি! প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্যাবলীর সমন্বয়ে গাঁথা হেমন্তকালের প্রতিটি সকাল বেলাকার রূপ।
হেমন্তের প্রতিটি প্রহরই যে মুগ্ধতার! হেমন্তের ঘুঘু ডাকা দুপুর, বাঁক খেয়ে ধানক্ষেতে নেমে আসা বালিহাঁসের ঝাঁক, কাকতাড়ুয়ার মাথায় বসে থাকা ফিঙে, শেষ বিকালে পশ্চিম আকাশ রাঙিয়ে দেয়া সাত রঙের রংধনু! আর ভাবুক সন্ধ্যার প্রফুল্লতা ছেয়ে যায় মানুষের ভেতর জগৎ! জ্যোৎস্না ডুবানো আলোকিত রাতও যে প্রকৃতিকে করে তোলে লাস্যময়ী! হেমন্তের এমনই মায়াময় প্রকৃতি মানব মননে অদ্ভুত তন্ময়তার সৃষ্টি করে! সেই তন্ময়তায় জেগে ওঠে প্রেম! এ প্রেম যেমন ঐশ্বরিক, তেমনই স্রষ্টার নিপুণ সৃষ্টি প্রকৃতির!
তাই তো আল্লাহ সবুহানাহুতায়ালা প্রকৃতিকে নিয়ে ভাবতে বলেছেন। সাধকরাও বলেছেন, ‘প্রকৃতির মাঝেই খোঁজ মেলে স্রষ্টার।’ হজরত হাসান বসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে এক ঘণ্টা পরিমাণ চিন্তাভাবনা করা সারা রাত ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’
হেমন্ত আসে, হেমন্ত যায়। হেমন্ত মানেই আমরা এখন অনেকেই ভাবি নবান্নের ঋতু। কিন্তু হেমন্ত যে এক বহুরূপী প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ এক ঋতু, সে কথা ভুলে যাই! খানিকটা ঠাণ্ডা, খানিকটা গরম, অনেকটাই নাতিশীতোষ্ণ- এরকম এক আবহাওয়ার ঋতু হল হেমন্ত! কখনও ঝড়-মেঘ, কখনও কুয়াশা। সবুজ ধানক্ষেতগুলো ধীরে ধীরে সোনারঙে বদলে যাওয়া। অতিথি পাখিদের আগমন শুরু। গাঁয়ে গাঁয়ে খেজুর গুড় আর পিঠের ঘ্রাণ। ঝকমকে তাজা মাছে সাজানো জেলেদের ডালা। এই তো আমাদের অনেক রূপের হেমন্তের প্রকৃতি আর সে প্রকৃতির আশ্রয়ে আমরা একটু অন্যরকম হই হেমন্তের মানুষগুলো!
আমরা তো ক্রমশই দূরে সরে যাচ্ছি প্রকৃতির গভীর সান্নিধ্য থেকে। উপলব্ধির চেতনায়ও এখন আর ধরা পড়ে না প্রকৃতির সুনিবিড় দৃশ্যপটগুলোর তাৎপর্য। ছয় ঋতু বাংলার প্রকৃতির বুকে যে গভীর সৌন্দর্য শোভা ছড়িয়ে রেখেছে- তাও যেন হৃদয় দিয়ে দেখার ক্ষমতা আমরা হারিয়ে ফেলছি। আবার ভয় হয়, যেভাবে পৃথিবীর জলবায়ু বদলাচ্ছে তাতে আগামীতে আমরা আমাদের এই আপন হেমন্তকে খুঁজে পাব তো!

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D