১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:৫২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৫
শাহ মনসুর আলী নোমান : বিদ্যার শিখা যাঁর স্পর্শে দীপ্তিময়,সেই মহান শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড.আতফুল হাই শিবলী স্যারের আজ ৮১তম জন্মবার্ষিকী।হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দীঘলবাক গ্রামের আলোকিত পরিবারের সন্তান প্রফেসর ড. আতফুল হাই শিবলী ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪ সালে ভারতের গৌহাটিতে জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞানতাপস আতফুল হাই শিবলী সারা জীবন আলো বিলিয়ে দিয়েই গেছেন।তাঁর মধ্যে পাওয়ার কোন প্রত্যাশা ছিল না,ছিল না কোন পদের প্রতি লোভ। সারা জীবন মানুষের কল্যাণে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন। বহু মানুষের জীবন গড়ার কারিগর এবং অসংখ্য মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন তিনি। শিক্ষার্থীবান্ধব এই মহান শিক্ষাবিদ সারা জীবন সমাজ দেশ, জাতি ও অন্যের কল্যাণে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।
‘মানবতার চূড়ান্ত সৌন্দর্য নিঃস্বার্থ সেবায় লুকায়িত’ – এই বাণী যেন তাঁর জীবনের সারসংক্ষেপ। শিক্ষক সমাজের একটি অংশ দলীয় রাজনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ।কিন্তু প্রফেসর শিবলী ছিলেন সেই দলীয় রাজনীতির অনেক উর্ধ্বে একজন মহান শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী।তাঁকে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের কয়েকটি স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগদানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।বাংলাদেশের বৃহৎ দুইটি রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন শাসনামলে সরকার দলীয় শিক্ষক নেতৃবৃন্দ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সরকার সমর্থক শিক্ষক পরিষদে যোগ দেয়ার শর্তে উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।কিন্তু তিনি বিনয়ের সহিত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন “উপাচার্য হিসেবে যোগ দিতেই পারি,কিন্তু কোন শর্ত মেনে আমি উপাচার্য হতে রাজি নই।”
আতফুল হাই শিবলী রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন (১৯৫৮ সালে) এবং রাজশাহী কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট (১৯৬০ সালে) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ১৯৬৩ সালে স্নাতক সম্মান (বিএ অনার্স) এবং একই বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর (এমএ)পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। উভয় পরীক্ষায় তিনি (স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।তিনি ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় (SOAS) থেকে ‘ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন (১৯৬৬ – ১৯৬৯)। তিনি প্রফেসর পদে উন্নীত হন ১৯৮৩ সালে।বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এই মহান শিক্ষাবিদ খুবই দক্ষতা এবং বিচক্ষণতার সহিত দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য হিসেবে।তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, উপ-উপাচার্য,ইতিহাস বিভাগ ও সামরিক বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ ( আইবিএস) এর পরিচালক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর ডিন এবং শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অত্যন্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালন করে দেশে – বিদেশে প্রচুর সুনাম ও সুখাতি অর্জন করেন।ড.আতফুল হাই শিবলী ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গবেষণাধর্মী জনপ্রিয় গ্রন্থ হল ‘Abdul Matin Chaudhary of Asam (1895-1948): Trusted lieutenant of Mohammad Ali Jinnah’. ‘বাংলাদেশ সাংবিধানিক ইতিহাস (১৭৭৩-১৯৭২)’ গ্রন্থটি ‘আইন ও বিচার’, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেIপ্রফেসর শিবলী রাজশাহীস্থ হেরিটেজ আরকাইভস-এর একজন ট্রাস্টি ও ‘স্থানীয় ইতিহাস’ জার্নাল এর সম্পাদক ছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সভা, সেমিনার – ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন। স্বল্পমেয়াদী ফেলোশীপ-এ আমেরিকা ও ভারতে গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ইউজিসি এর সদস্য হিসেবে চীন, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, শ্রীলংকা, ব্যাংকক ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহিত তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। শিক্ষাবিদ শিবলী International Association of Historians of Asia-এর সেক্রেটারী জেনারেল, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া হিস্ট্রি এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ আর্কাইভস এড রেকর্ড ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি সহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক সংগঠনের সহিত সম্পৃক্ত ছিলেন।
তিনি একজন নির্লোভ এবং পরোপকারী ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়নে, সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সক্রিয় সহযোগিতা, উদ্যোগ ও উপদেশ প্রদান করে সাধারণ মানুষের মনে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে আছেন। দেশে শিক্ষার মান উন্নয়নে তিনি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈতনিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।তাঁর দেখানো পথ এবং নীতিমালা অনুসরণ করেই বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বর্তমানে একটি সুসংগঠিত পর্যায়ে।
ড. শিবলী ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।তাঁর স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একাডেমিক ভবনে ইতিহাস বিভাগের উদ্যোগে তাঁর নামে একটি কক্ষ নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর মহান স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।প্রফেসর শিবলীকে সমাজে অসামান্য কর্মের জন্য মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা পদকে ভূষিত করা হোক।বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট, গবেষক ও শিক্ষা প্রশাসক ; সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D