বড়গাং নদীতে ইজারা আইন লঙ্গন করে বালু উত্তোলন, নদী পাড়ের জনপদ মারাত্বক ঝুঁকিতে

প্রকাশিত: ৬:৩৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৯, ২০২৬

বড়গাং নদীতে ইজারা আইন লঙ্গন করে বালু উত্তোলন, নদী পাড়ের জনপদ মারাত্বক ঝুঁকিতে

মোঃ রেজওয়ান করিম সাব্বির, জৈন্তাপুর


সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার দ্বিতীয় বৃহত্তর বালু মহাল বড়গাং নদী। সরকার সুনির্দিষ্ট নিয়ম মোতাবেক নদীটি ইজারা প্রদান করে রাজস্ব আদায় করছে। ইজারাদার স্থানীয় প্রভাবশালী বালু খেকু চক্রের সাথে আতাত করে অতিরিক্ত মুনাফ লাভের আশায় ইজারা আইন লঙ্গন করে বড়গাং নদীর পাড়, ফসলী জমি, স্থানীয় বাসিন্ধাদের বসতবাড়ী, কবরস্থান, শ্মশান এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ মারাত্বক ঝুঁকিতে ফেলে দেদারছে বালু উত্তোলন করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জাঙ্গালঘাট, খেয়াঘাট, লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব, গোয়াবাড়ী, রূপচেং (পাতলাখাতার বাড়ী), গরুরঘাট এলাকায় প্রতিদিন কয়েক শত নৌকার মাধ্যমে নদীর পাড়, ফসলী জমি, স্থানীয় বাসিন্ধাদের বসতবাড়ী, কবরস্থান, শ্মশান এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ মারাত্বক ঝুঁকিতে ফেলে বালু উত্তোলন করছে প্রভাবশালী বালু খেকু চক্র। ইজারা আইন অনুযায়ী নদীর উভয় পাড়ের নূন্যতম ১৫ মিটার জায়গা খালি রেখে নদীর ভিতর অংশ হতে মেনুয়েল পদ্ধতীতে বালু আহরণ করার অনুমতি রয়েছে।

সানি-সোহা এন্টারপ্রাইজ ১৪৩২ বাংলা সনের বৈশাখ মাস হতে ইজারা আদায়ের দায়িত্ব গ্রহনের ৫ মাস পর হতে এলাকার প্রভাবশালী বালু খেকু মহলের সাথে আতাত করে নদীর মধ্যভাগ এর পাশাপাশি বড়গাং নদীর উল্লেখিত স্থান সমুহের উভয় পাশ হতে দেদারছে ইজারা আইন লঙ্গন করে রাজস্ব আদায়ের নামে বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছেন। ফলে প্রভাবশালীরা ইজারাদারের বৈধ চালানের মাধ্যমে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। যার কারনে ইতোমধ্যে গোয়াবাড়ী চা-শ্রমিক সম্প্রদায়ের (কুলি বস্তির) শ্মসানঘাট, রূপচেং পাতলাখাতা বাড়ী সংলগ্ন রূপচেং কবরস্থান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াপদা বেড়ীবাঁধ, স্থানীয় বাসিন্ধাদের বসতবাড়ী, ফসলী জমি বালু উত্তোলনের ফলে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

এনিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসী কয়েকদফা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে মৌখিক ভাবে অভিযোগ জানান। অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, সহকারি কমিশনার (এসিল্যান্ড) পলি রানী দেব গত রমজান মাসে কয়েক দফা অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় ইজারাদার কর্তৃক ইজারা আইন লঙ্গন করে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ার পরও রহস্যজনক ভাবে ইজারাদার সানি-সোহা এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে কোন প্রকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। যার কারনে ইজারাদার অবৈধ ভাবে নদীরপাড় ও ফসলী জমি কর্তনকারীদের ইজারার বৈধ রাজস্ব আদায়ের চালান দিয়ে সহযোগীতা করছে। যার কারনে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনকারীরা ইজারাদারের কাঁদে পা দিয়ে অপকর্ম করছে। ফলে অল্প সময়ে অতিরিক্ত মুনাফাতে ইজারাদার আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিনত হচ্ছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে ইজারাদার চন্দন তালুকদার নৌকাপ্রতি বালুখেকু চক্রকে ৪শত টাকা করে দিয়ে নিজে ৬শত টাকা হারে অবৈধ আয় করছেন। গত রমজান মাসে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীসহ বড়গাং ও সারী নদী ইজারাদারগনের মধ্যকার এক বৈঠকে সানী-সোহা এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি সিদ্দিক মিয়া সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা ও জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা এর সম্মুখে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে এরকম কর্মকান্ড আর হবে না মর্মে নিশ্চিয়তা দেন। কিন্তু তার ২দিন পর হতে অদ্যাবদী পর্যন্ত একই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

এদিকে এলাকার বদরুল আলম, হোসাইন আহমদ, কামরুল ইসলাম, ফখরুল ইসলাম সহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা বলেন, বড়গাং নদী সরকার বৈধ ভাবে অতিত হতে বর্তমান পর্যন্ত ইজারা আইন মেনে রাজস্ব আদায় করে আসছে। ১৪৩২ বাংলা সনে সানী-সোহা এন্টারপ্রাইজ ইজারাগ্রহনের পর যে হারে নদীর পাড় কর্তন করছে তাতে বড়গাং নদীপাড়ে মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কৃষকের ফসলী জমি, বসতবাড়ী, কবরস্থান, শ্মসানঘাট ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ মারাত্বক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। যেহারে নদীর পাড় কর্তন করা হচ্ছে তাতে আগত বন্যায় পানি উন্নয়ন বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের সৃষ্টি হবে। কবরস্থান, শ্মসান ও মানুষের বসতবাড়ী নদীতে বিলিন হবে। তারা সানী-সোহা এন্টারপ্রাইজ সহ বালুখেকুদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করার অনুরোধ জানান। সেই সাথে ইজারা আইন লঙ্গন করার জন্য ইজারা বাতিলের দাবী জানান।

এবিষয়ে জানতে সানী-সোহা এন্টারপ্রাইজ পরিচালক চন্দন তালুকদার এর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সানী-সোহা এন্টারপ্রাইজের স্থানীয় প্রতিনিধি সিদ্দিক মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নদীরপাড় কর্তনের বিষয়টি স্বীকার করে এতে সানী-সোহা এন্টারপ্রাইজ জড়িত নয় বলে জানান। সানী-সোহা এন্টারপ্রাইজ জড়ীত নয় কিন্তু ঐস্থানের উত্তোলিত বালু হতে আপনি রাজস্ব আদায় করছেন মর্মে প্রশ্ন করা হলে ‍তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

এবিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, আমরা নিয়মিত ভাবে অভিযান পরিচালনা করে আসছি। এছাড়া আপনাদের সম্মুখে আমরা কঠোর ভাবে ইজারাদারকে হুসিয়ার করে দিয়েছি। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের অনুমতি চাওয়া হবে। আদেশ পেলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট