সিলেটে শিশু ফাহিমা হত্যাকারী জাকিরকে আদালতে গণপিটুনি

প্রকাশিত: ১০:৪১ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২৬

সিলেটে শিশু ফাহিমা হত্যাকারী জাকিরকে আদালতে গণপিটুনি

চার বছরের শিশু ফাহিমা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি জাকিরকে আদালতে গণপিটুনি দিয়েছে জনতা।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) কোর্ট লকাফ থেকে সিলেট আদালতের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আসামিকে হাজির করার সময় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন আদালত সূত্র।

আদালত সূত্র জানায়, গত ১১ মে রাতে ফাহিমাকে হত্যার অভিযোগে তার প্রতিবেশী চাচা জাকির হোসেনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পর থেকে সে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে। মঙ্গলবার শিশু ফাহিমা হত্যা মামলার আদালতের পূর্ব নির্ধারিত ধার্য তারিখ ছিল। ওইদিন সকালে কারাগার থেকে জাকিরকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের আদালত লকাফে আনা হয়। পরে লকাফ থেকে আদালতে নেওয়ার সময় উপস্থিত জনতা পুলিশের সামনে জাকিরকে গণপিটুনি দেয়।

এ ঘটনার ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আদালতের বারান্দায় হঠাৎ একদল লোক জাকিরকে মারধর শুরু করে। এসময় পুলিশ মারধরকারীদের সরিয়ে জাকিরকে রক্ষার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশ জাকিরকে নিয়ে প্রিজনভ্যোনে উঠে পড়ে।

এদিকে, শিশু ফাহিমা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মাত্র এক মাস পাঁচ দিনের মাথায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি জাকির হোসেন ও তার দুই সহোদর জয়নাল আহমদ ও আবুল কালামকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে জাকির হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। লাশ গুমে সহযোগিতার জন্য তার দুই ভাই জয়নাল ও কালামকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

নিহত ফাহিমা আক্তার (৪) সিলেট সদর উপজেলার কান্দির গাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে।

হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. জাকির হোসেন (৩০) একই গ্রামের পশ্চিম পাড়া ধন রায়ের চক এলাকার বাসিন্দা মৃত তোতা মিয়ার ছেলে। জাকির ভিকটিমের সম্পর্কে চাচা।

গত ৮ মে (শুক্রবার) বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুদিন আগে (৬ মে) সে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলো।

এরপর সোমবার (১১ মে) রাতে ফাহিমাকে যৌন নির্যাতন ও হত্যাকারী তার প্রতিবেশী চাচা জাকির হোসেনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয় সে। বর্ণনা করে ঘটনার লোমহর্ষকতা।

সে জানায়- শিশু ফাহিমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করেছে। এ সময় জাকিরের বাড়িতে কেউ ছিলেন না। নির্যাতন সইতে না পেরে ফাহিমা অজ্ঞান হয়ে যায়। অপরাধ ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ফাহিমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে জাকির। এরপর স্ত্রীর ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে কচি নিথর দেহটি ব্যাগে রাখে সে। পরে ওড়নাসহ ফাহিমার মরদেহ বাড়ির পাশের একটি পুকুরপাড়ের ডোবায় ফেলে দেয় জাকির।

৫ ভাই-বোনের মধ্যে ফাহিমা ছিল চতুর্থ। তার বড় বোন ফাইজা বেগমের বয়স ১৪ বছর, ফারজানার বয়স ১০ বছর, ভাই রিহাদের বয়স ৯ বছর ও রিফাতের ১৩ মাস। আদরের মেয়েকে হারিয়ে তাদের বাবা রাইসুল হক ও মা রুবিনা বেগম হয়ে গেছেন স্তব্ধ। শোকে পাথর।

বড় বোন ফাইজা বেগম জানান- আমার বোনটা অনেক আদরের ছিল। ওরে আমি গোসল করিয়েছি। নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দিয়েছি। আমার সঙ্গে খেলা করেছে, আমার সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমিয়েছে। আমার এত মায়ার বোনটাকে কিভাবে মারলো এই পাষণ্ড। আমার বোনটাকে যেভাবে হত্যা করেছে এভাবে তারও মৃত্যু চাই। তার ফাঁসি চাই।

আদরের মেয়ে ফাহিমাকে হারিয়ে আহাজারি করতে করতে এখন অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন রুবিনা বেগম। তার শুধু একটাই কথা- ঘাতক জাকিরের ফাঁসি চাই।

গত ১২ মে জাকিরকে গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলনে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ৬ মে সকালে ফাহিমাকে একটি দোকান থেকে সিগারেট এনে দিতে পাঠানো হয়। শিশুটি সিগারেট এনে দেওয়ার পর তাকে নিজের ঘরে ডেকে নেন জাকির। এসময় তার স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। ঘরের দরজা বন্ধ করে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় আসামি। তবে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানায় পুলিশ।

পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। মরদেহ প্রথমে ঘরের ভেতরে একটি ব্রিফকেসে লুকিয়ে রাখা হয়। এলাকায় খোঁজাখুঁজি শুরু হলে পরে লাশ সরিয়ে বাড়ির পেছনে রাখা হয়। সেখান থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে গভীর রাতে পাশের একটি ডোবায় লাশ ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে মরদেহ পানিতে না ডোবায় পাশেই রেখে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত জাকির।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, অভিযুক্তের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাদর ও ব্রিফকেস উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব আলামত জব্দ করে তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হবে। এই হত্যার ঘটনায় সিলেটজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। ফাহিমা হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে আন্দোলনে নামেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফাহিমার বাড়িতে গিয়ে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট