সাইপ্রাসে হত্যার পর পাতা দিয়ে ঢেকে রাখে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর লাশ

প্রকাশিত: ১১:০২ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২৬

সাইপ্রাসে হত্যার পর পাতা দিয়ে ঢেকে রাখে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর লাশ

প্রবাসের মাটিতে লেখাপড়া করতে গিয়ে হত্যার শিকার হন নরসিংদীর রায়পুরার যুবক শাহরিয়ার আহমেদ ওরফে ইমন (২২)। তাকে হত্যার পর লাশ গুম করার চেষ্টা করে অপহরণ কারীরা। দীর্ঘ দশ দিন পর শাহরিয়ার আহমেদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে রবিবার (২১ জুন) শাহীন বাবু (২২) নামে এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে সাইপ্রাস পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যেই ওখানকার একটি জঙ্গলের ভেতর পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা শাহরিয়ারের লাশ ও হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা|

নিহত শাহরিয়ার আহমেদ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার উত্তরবাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে শাহরিয়ার সবার বড়। তিন মাস আগে শিক্ষার্থী ভিসায় ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসে যান তিনি। সাইপ্রাসের লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় তিনি বসবাস করতেন। সেখানে তার রুমম্যাট ছিল তার গ্রামের প্রতিবেশী রায়হান।

শাহরিয়ারের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গত ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন পূর্বে শাহরিয়ার শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে যান। বিদেশে যাবার পূর্বেই অনলাইনে সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে যাওয়ার পর তার খরচ হিসেবে পরিবারের লোকজন প্রতি মাসে ৫০/৬০ হাজার টাকা পাঠাতে হতো। পরিবারের উপর চাপ কমাতেই শাহরিয়ার কাজের সন্ধান করতে থাকে। এক পর্যায়ে কাজের সন্ধান পায়।

গত ১১ জুন বিকেলে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে শাহরিয়ার জানান, কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। আজ রাত থেকে ডিউটি শুরু। দোয়া কইরো। কাজ পাওয়ার কথাটি প্রবাসি পিতা ও তার রুমেম্যাট রায়হান মিয়াকে জানান।

রায়হান তাকে বলেছিলেন, ‘সেখানে গিয়ে লোকেশন পাঠাস।’ কোনো প্রয়োজন হলে যেন যোগাযোগ করা যায় সহজে। পরে স্থানীয় সময় রাত ৯টায় কাজের স্থানে পৌঁছে রায়হানের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে লোকেশন পাঠান শাহরিয়ার। কিছুক্ষণ পর রায়হান ফিরতি মেসেজে ‘ওকে’ লিখলেও তা আর সিন করেনি শাহরিয়ার। কিন্তু রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকেই বাবা নাসির মিয়ার কাছে একটি ম্যাসেজ পাঠানো হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছি। ছেলেকে ফিরে পেতে চাইলে ৩৫ হাজার ইউরো দিতে হবে (যা বাংলাদেশি টাকায় ৫০ লাখ)| যদি দেন ছেলেকে ফিরে পাবেন, না দিলে তার চোখ ও কিডনি খুলে বিক্রি করে দেব।’ রাতেই বাবা পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি জানান। তবে সবাই ভেবে ছিল, হয়তো শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ আইডিটি ‘হ্যাকড’ হয়েছে। পরদিন ১২ জুন সকালে কাজ থেকে আর ফিরে আসেননি শাহরিয়ার। এরপরই রায়হান ওখানকার স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়ে রিপোর্ট করেন। পরে পুলিশের সাথে ওই লোকেশনে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ২৪ ঘণ্টাই অনলাইনে সচল ছিল শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। প্রতিদিনই পরিবারের কাছে মুক্তিপনের টাকা চাওয়া হচ্ছিল।

শাহরিয়ারের ভাই নয়ন আহমেদ জানান, শাহরিয়ারের কোনো খোঁজ না পেয়ে এক পর্যায়ে আমরা মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে রাজি হই এবং অপহরণকারীদের সাথে দর-কষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশি টাকায় পাঁচ লাখে চুক্তি হয়। পরে রবিবার (২১ জুন) দুপুরে চুক্তি অনুযায়ী টাকা পাঠাতে ব্যাংকে যাই। ওখানে গিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে টাকা পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেই এবং অপহরণকারীর কাছে থাকা আমার ভাইয়ের মোবাইল ফোন দিয়ে ভাইয়ের সাথে কথা বলতে চাই। কিন্তু অপহরণকারীদের কথা বার্তায় আচার আচরণে সন্দেহ হলে টাকা না দিয়ে বাড়ি ফিরি। এক পর্যায়ে দেখি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি অফলাইনে চলে যায়। ওই দিন রাতেই জানতে পারি সাইপ্রাস পুলিশ শাহীন বাবু নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওখানকার একটি জঙ্গল থেকে পাতা দিয়ে ঢাকা আমার ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করে। তবে গ্রেপ্তার ওই তরুণ শাহীন বাবুর বাড়ি বাংলাদেশের কোন এলাকায়, তা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।

রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, সাইপ্রাসে এক শিক্ষার্থী অপহরণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। সে ঘটনায় এক বাংলাদেশীকে ওখানকার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে শুনেছি। তবে বিষয়টি সাইপ্রাসের দূতাবাস থেকে এ পর্যন্ত আমাদের অফিশিয়ালি জানানো হয়নি। নিহত তরুণের পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তারা যদি সহযোগিতা চায়, মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট