স্বাগতম বঙ্গাব্দ ১৪২৯ শুভেচ্ছা, দুই বছর পেরিয়ে চেনা রূপে ফিরেছে বর্ষবরণ

প্রকাশিত: ৪:০০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২২

স্বাগতম বঙ্গাব্দ ১৪২৯ শুভেচ্ছা, দুই বছর পেরিয়ে চেনা রূপে ফিরেছে বর্ষবরণ

 || মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার ||


‘নব আনন্দে জাগো আজি রবিকিরণে
শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে।
নব আনন্দে জাগো ….’

করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছর রমনার বটমূলে বাংলা নতুন বছরকে বরণ অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল। এবার তাই ছায়ানট তাদের অনুষ্ঠানে নতুন উদ্দ্যমে জাগ্রত হওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ১৪২৯ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখের ভোরের আঁধার কেটে গিয়ে সূর্য উঠে এলে রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে তুলেন সুরের অনুরণন।

ভোরের সূর্য উঠতেই রং বেরঙয়ের পোশাক আর কাঁচা ফুলে সেজে রমনার বটমূলে হাজির হন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। তাদের পোশাকে যেমন ছিল বাঙালিয়ানার ছাপ, তেমনি চোখে মুখে ছিলো নব প্রত্যাশা আর স্বপ্ন।

দুই বছরের করোনাকালের সেই দুঃসময় পেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় এবার ছায়ানটের গানের অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছিল। ছায়ানটের ভাষায় নব আনন্দে জাগ্রত হওয়ার এই আয়োজনের শিরোনাম ছিল, ‘নব আনন্দে জাগো’।

আবহমান বাংলার চিরায়ত নানা আচার-উপাচারে গতকাল বুধবার চৈত্রের শেষ দিন, অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন করেছে বাঙালি। এরপর পুরনো বছরের সূর্যকে বিদায় জানানোর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল নতুন আরেকটি বাংলা বছরের জন্য ক্ষণগণনা। অবশেষে আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে বাঙালি জীবনে নতুনের প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৯। পহেলা বৈশাখের এই দিনটি এমনিতেই ধর্ম-মত নির্বিশেষে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব হয়ে উঠেছে। এই দিনে নববর্ষকে বরণ করতে সারাবছর মুখিয়ে থাকে জাতি। তবে গত দুই বছর করোনা মহামারীর কারণে এই বর্ষবরণ রঙ হারিয়েছিল। কিন্তু এবার করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকায় বর্ষবরণের জৌলুস আবার ফিরেছে। আবহমানকালের বাঙালি ঐতিহ্যের বরণডালা সাজিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে নানা আয়োজন হচ্ছে দেশজুড়ে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে জাতিকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে পহেলা বৈশাখকে বাঙালির জাতীয় জীবনে পরম আনন্দের দিন বলে উল্লেখ করেন। আনন্দঘন এ দিনে তিনি দেশে ও বিদেশে বসবাসরত সব বাংলাদেশিকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘এ দিনে চির নতুনের বার্তা নিয়ে আমাদের জীবনে বেজে ওঠে বৈশাখের আগমনী গান। দুঃখ, জরা, ব্যর্থতা ও মলিনতাকে ভুলে সবাই জেগে ওঠে মহানন্দে। বাঙালি জাতির শাশ্বত ঐতিহ্যের প্রধান অঙ্গ পয়লা বৈশাখ। ফসলি সন হিসেবে মুঘল আমলে যে বর্ষ গণনার সূচনা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ সমগ্র বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক স্মারক উৎসবে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখের মাঝে বাঙালি খুঁজে পায় নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনার স্বরূপ।’

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির সম্প্রীতির দিন, বাঙালির মহামিলনের দিন। এদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র জাতি জেগে ওঠে নবপ্রাণে, নব-অঙ্গীকারে। সারাবছরের দুঃখ-জরা, মলিনতা ও ব্যর্থতাকে ভুলে সবাইকে আজ নব-আনন্দে জেগে ওঠার উদাত্ত আহ্বান জানাই।’

নিঃসন্দেহে আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াই-এ পয়লা বৈশাখ বরণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু সেই ইতিহাস আমাদের অনেকের কাছেই অজানা। এর শুরুটা এমন এক সময়ে হয়েছিল যখন নিজেদের বাঙালি হিসেবে দাবি করাটাই সাহসের কাজ ছিল। ১৯৬১ সালে একদিকে পাকিস্তান আমলের দমবন্ধ পরিবেশ, আর অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলনের মধ্যেই এসেছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ। স্বৈরাচারি ও গণবিরোধী পাকিস্তান সরকার অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই উদযাপনের ওপর। এর প্রতিবাদে গণমুখী আঙ্গিকে সুর ও সঙ্গীতকে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক, মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই), আহমেদুর রহমান (‘ভিমরুল’) সহ আরো অনেকেই সম্মিলিত উদ্যোগ নেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। মূলত ছায়ানট সংগঠকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক, হাইকোর্টের বিচারপতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক গুণীজনেরা ঐক্যবদ্ধভাবে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে এগিয়ে আসেন। ‘আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই’ বলে সেদিন জোর সংকল্প প্রকাশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। একই সঙ্গে তিনি নজরুলকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপনেরও বিরুদ্ধে ছিলেন। আর সেকারণেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রবোধ মিলে মিশে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পোক্ত করা সম্ভব হয়েছিল পাকিস্তানী সেই আঁধার যুগেও। তবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার ধারা বিবরণীটি ঠিক সেভাবে আমাদের সন্তানদের বলে উঠতে পারিনি আমরা। তাই বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন নির্মাণের রাজনৈতিক যুদ্ধের ভিত গড়তে, সংস্কৃতি কর্মীরা, বিশেষ করে ‘ছায়ানট’ সংগঠক ও কর্মীদের অবিস্মরণীয় ভূমিকা আজকের তরুণ প্রজন্মকে জানানোর প্রয়োজন রয়েছে। সুর দিয়ে মানুষের মনের গভীরতর স্বপ্নকে প্রভাবিত করার এই প্রচেষ্টাকে আরো সক্রিয় করার অভিপ্রায়েই ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেন ছায়ানট সংগঠকগণ। প্রয়াত ড. নওয়াজেশ আহমদ ছিলেন প্রকৃতি প্রেমিক একজন বিজ্ঞানী। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক স্মারক বক্তৃতায় (২০০৭) তিনি বলেছিলেন, কিভাবে রমনা বটমূলের পয়লা বৈশাখের সূত্রপাত হয়। সন্জীদা আপার মুখেও এ কথা বহুবার শুনেছি। তারপর ড. নওয়াজেশ সেদিন বলেন, “১৯৬৭ সনে ওয়াহিদুল এবং সন্জীদা আমাকে বলল, “এবার আমরা বাংলা নববর্ষ বাইরে করব। তুমি একটা গাছ দ্যাখো”। আমার উপর ভার দিল ওয়াহিদুল। আমি ওয়াহিদুলকে রমনা বটমূলের কথা বললাম।”

স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। রমনা বটমূলের এই নববর্ষ উদ্যাপন এখন সারা দেশ এবং বাঙালি অধ্যুসিত বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ বাঙালি বাংলা নববর্ষে পথে নেমে পড়ে। নুতন জামা কাপড় পড়ে এক উজ্জ্বল সকালে তাদের আনন্দঘন উপস্থিতি বাঙালির অস্তিত্বের জানান দেয়। পাশাপাশি চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের এক অসাধরণ অগ্রযাত্রার প্রতীক বাঙালির এসব সাংস্কৃতিক আয়োজন। তাই করোনা-পরবর্তীকালে বাংলা নববর্ষের পুরোদমে উদযাপন নিশ্চয়ই আবারও আমাদের সাহস জোগাবে আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে এগোনোর জন্য। সেই প্রত্যাশা কামনা করে বন্ধু বান্ধব , শুভাকাঙ্ক্ষী , পাঠক দর্শক শ্রোতা ও দেশবাসীসহ সবাইকে জানাচ্ছি শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন । আমাদের সবার এই নতুন বছরটি যেন শান্তি সমৃদ্ধি হোক সেই কামনা করছি । আল্লাহ হাফেজ । সবাই ভাল থাকুক


লেখক:-: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশক বাংলা পোস্ট |√| বিশেষ প্রতিবেদক দৈনিক নয়াদেশ |√| ও প্রকাশক বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা |√|


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট