১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:০৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬
সিলেট ভ্রমণে গেলে জাফলংয়ের এ নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে ভুল করেন না পর্যটকেরা। সাধারণত বেশির ভাগ পর্যটকেরা জাফলং জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ঘুরে চলে আসেন। কিন্তু পিয়াইন নদ পেরোলেই এ যেন এক ভিন্ন জগৎ। খাসিয়া পুঞ্জিতে এখন হয়ে উঠছে নতুন আকর্ষণ হোমস্ট। উঁচু পাহাড়, ঝরনা আর স্বচ্ছ জলের পাথুরে পিয়াইন নদ মিলিয়ে প্রকৃতি যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি খাসিয়া জনপদের জীবনযাপনও দেয় ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আপনি চাইলে আপনার ছুটির দিনটি খাসিয়া জনপদে কাটাতে পারেন। এ ছাড়া খাসিয়াদের বাড়িতে রাত যাপন করে তাঁদের জীবন-জীবিকা, খাওয়াদাওয়া আর সংস্কৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা গ্রহণের সুযোগও চালু হয়েছে।
গত বছরের জুলাই থেকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে জাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হয়েছে ‘কমিউনিটি ট্যুরিজম’। এ উদ্যোগের আওতায় বর্তমানে তিনটি পুঞ্জি বা পাড়ায় চারটি হোমস্টে চালু হয়েছে, যেখানে অন্তত ১৫ জন পর্যটক খাসিয়াদের বাড়িতে রাত যাপন করতে পারবেন।
খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হওয়া কমিউনিটি ট্যুরিজমের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল মাস দুই আগে। জাফলং জিরো পয়েন্টের বল্লার ঘাটে পৌঁছাতেই চারজন গাইড আমাদের পর্যটক দলকে স্বাগত জানালেন। গাইড হিসেবে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা চারজনই খাসিয়া সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী। তাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করছেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে পিয়াইন নদ পার হলাম আমরা। ঘাটের ওপার থেকে গাইডরা আমাদের নিয়ে গেলেন খাসিয়া কমিউনিটি মিশনে। এটি মূলত স্থানীয় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়। এই চত্বরের পাশে দুটি কক্ষ নিয়ে একটি হোমস্টে চালু হয়েছে।
আরেকটু পথ এগোলেই একে একে নকশিয়াপুঞ্জি আর লামাপুঞ্জির দেখা মিলবে। খাসিয়া সম্প্রদায়ের একেকটি পাড়া বা মহল্লাকে পুঞ্জি বলা হয়। এক পুঞ্জি থেকে আরেক পুঞ্জিতে যেতে পথের দুই ধারে সুপারি আর পানের বরজের দৃশ্য চোখে পড়বে। পুঞ্জিগুলোয় খাসিয়াদের বাড়িগুলো যেন ছবির মতো সাজানো রয়েছে। মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে মাঁচার ওপর দাড়িয়ে আছে একেকটি বাড়ি। কোনোটি বাঁশের তৈরি আবার কোনোটি পাকা বাড়ি। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিটি বাড়ি ও উঠান একদম ঝকঝকে পরিষ্কার। আমাদের সঙ্গে থাকা গাইড সেভেনলী খংস্তিয়া জানান, খাসিয়ারা স্বভাবগতভাবেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করেন। আর প্রাচীনকালে জীবজন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে মাচার মতো উঁচু করে বাড়ি বানাতেন খাসিয়ারা। এখন জীবজন্তুর ভয় না থাকলেও উঁচু করে বাড়ি বানানোর প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তাঁরা।
নকশিয়াপুঞ্জিতে গিয়ে পুঞ্জির হেডম্যান বা প্রধান ওয়েলকাম লাম্বার সঙ্গে আলাপ হলো। তাঁরা দুই ভাই মিলে দুটি হোমস্টে চালু করেছেন। ওয়েলকাম লাম্বা বলেন, কমিউনিটি ট্যুরিজম নিয়ে তাঁদের কোনো ধারণা ছিল না। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কাছ থেকে যখন প্রথম প্রস্তাব পেয়েছিলেন, তখন তাঁরা কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। তবে এখন তাঁদের ধারণা বদলে গিয়েছে। পর্যটকদের কল্যাণে এখন তাঁদের বাড়তি আয়ের সুযোগ হচ্ছে। এ জন্য তাঁদের খুব বেশি বিনিয়োগেরও প্রয়োজন হয়নি। নিজেদের বাড়ির পড়ে থাকা দুটি কক্ষ তাঁরা ছিমছাম করে সাজিয়েছেন। সঙ্গে শৌচাগার–সুবিধা কিছুটা উন্নত করেছেন। সেখানেই এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এসে থাকছেন।
ওয়েলকাম লাম্বার সঙ্গে আলাপ করতে করতেই দুপুর গড়িয়ে এল। মধ্যাহ্নভোজ সারলাম রমলা রেস্টুরেন্ট নামের একটি কমিউনিটি রেস্টুরেন্টে। এখানে পর্যটকেরা দেশি খাবারের পাশাপাশি খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী খাবার, যেমন বিন্নি চালের পোলাও, ডকলে (চিকেন সালাদ), বাঁশকোঁড়ল, কাঁঠাল-শুঁটকির তরকারি, সরওয়া (স্যুপ), চিকেন ভুনা ইত্যাদির স্বাদও নিতে পারবেন। এখানে প্রতিবেলা খেতে খরচ পড়বে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দারাই এই রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করেন।
খাওয়াদাওয়া শেষে সিলেট অঞ্চলের বৃহত্তম সমতল ভূমির চা–বাগান হিসেবে খ্যাত জাফলং চা–বাগান ঘুরে দেখলাম। এরপর একে একে ঘুরলাম সাইকেল ট্র্যাকিং এরিয়া আর লামাপুঞ্জির সেলফি জোন। পড়ন্ত বিকেলে সূর্য যখন ডুবতে বসেছে, তখন লামাপুঞ্জি আলোকিত করে দিল একদল খাসিয়া শিশু। খাসিয়া ভাষার গানের তালে তালে তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে পর্যটকদের উদ্দেশে নৃত্য পরিবেশন করল শিশুরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর সন্ধ্যায় ঘুরে দেখলাম কমিউনিটি মিউজিয়াম। যেখানে খাসিয়াদের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, প্রাচীনকালের কৃষিকাজের ব্যবহৃত সামগ্রী, যুদ্ধের অস্ত্রের আদলে তৈরি মিনিয়েচার প্রদর্শন করা হয়।
পরদিন সকালে একজন খাসিয়া পানচাষির সঙ্গে সরাসরি দেখলাম পানপাতা সংগ্রহের প্রক্রিয়া। পানপাতা খাসিয়াদের কাছে পবিত্র একটি পাতা। তাই প্রতিদিন সকালে গোসল করে পবিত্র অবস্থায় পানচাষিরা এ কাজ করেন। পানবরজের ভেতরেই রয়েছে সুপারি আর দেশি কমলার গাছ। মূলত পান আর সুপারি খাসিয়াদের প্রধান আয়ের উৎস। তবে প্রথাগত এই কাজের পাশাপাশি পর্যটনের মাধ্যমেও দিনবদলের স্বপ্ন দেখছে জাফলংয়ের এই খাসিয়া জনপদ।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক (অর্থ ও নিরীক্ষা) কাবিল মিঞা বলেন, খাসিয়া জনপদে কমিউনিটি ট্যুরিজম চালু করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হয়েছে। আইএলওর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড একাধিকবার কমিউনিটির বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও কর্মশালা করে তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। খাসিয়াদের মধ্যে অনেকেই এখন নিজেদের বাড়িতে হোমস্টে সুবিধা চালুর ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। নতুন ধারার এ পর্যটন চালুর পর কক্ষভাড়ার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা যেমন আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন, একইভাবে স্থানীয় অটোরিকশাচালক, দোকানি, ট্যুর গাইড—সবাই পর্যটনের মাধ্যমে বাড়তি আয় করতে পারছেন। যদিও বর্তমানে রাতযাপনের ব্যবস্থাটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। এ ক্ষেত্রে ভ্রমণের আগে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে রাতযাপনের অনুমতি নিতে হবে। তবে খাসিয়াপুঞ্জিতে কমিউনিটি ট্যুরিজম আরও বিস্তৃত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।
সুত্র : প্রথম আলো

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D