সুনামগঞ্জে হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের আহাজারি বেড়েই চলেছে

প্রকাশিত: ২:০৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০১৭

সুনামগঞ্জে হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের আহাজারি বেড়েই চলেছে

সুনামগঞ্জ : কেউ যেন শুনতে পাচ্ছে না হাওরপাড়ের অর্ধকোটি মানুষের কান্না। সরকারের নীতি নির্ধারকরা কিংবা বেসরকারী কোনো সংস্থা। ভারতের পানিতে ফসল হারানো ৭ জেলার হাওরের মানুষের দুর্দশার চিত্র মিডিয়ায়ও ঠিকমতো আসছে না।

পানিতে ফসল হারিয়ে দিশেহারা হাজার হাজার কৃষক। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে হাওরে বসবাসরত আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা তাদের আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠেছে সেখানের আকাশ বাতাস। তাদের পাশে কেউ নেই।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বালিজুরি গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম (আমির মেম্বার) ছলোছলো চোখেই বললেন, ‘বানের পানিতে গরু-ছাগল গেলোগি, আশা করছিলা ছয় মাস মাছ ধরি সংসার চলাইতাম, কিন্তু সে আশায়ও গেলোগি।

ভারতের উন্মুক্ত ইউরেনিয়াম খনি থেকে বানের পানিতে ভেসে আসায় তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়েই হাওরের মাছ-ব্যাঙসহ সব কীট-পতঙ্গ মারা যাচ্ছে।’ শুধু আমির মেম্বর নয়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলার হাওর উন্নয়ন বোর্ডের অধীনস্থ ৪৮টি উপজেলার (মোট উপজেলা ৭০) মানুষের মধ্যেই এই হাহাকার-আর্তি।

সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কোথাও পানি নেমে যাওয়ায় পচে যাওয়া ধান গাছের গুমোট গন্ধ। মাঝে মাঝে পানিতে মাছ, হাঁস মরে পড়ে থাকার দৃশ্য। উঁচু এলাকায় দু’চারটি ধানী জমিতে ধান দেখা পাওয়া গেলেও কারো মুখে হাসি নেই। ফসল হারানোর যন্ত্রণায় সবাই যেন দিশেহারা। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা এখন আল্লাহর উপর ভরসা ছাড়া কিছুই করতে পারছেন না। যে বিস্তীর্ণ এলাকা পানি থই থই করতো, মাছ ধরার কলরব উঠতো, সেই এলাকায় সুনশান নীরবতা। চিরচেনা হাওর এখন যেন অচেনা এক বিরাণভূমি।

দেশের উত্তর-পর্বাঞ্চলের ৭ জেলার প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬১ হেক্টর জমি হাওর এলাকায়। হাওর বোর্ডের হিসাব মতে, মোট হাওরের সংখ্যা ৩৭৩টি। সুনামগঞ্জে ৮৫, হবিগঞ্জে ১৪, নেত্রকোনায় ৫২, কিশোরগঞ্জে ৯৭, সিলেটে ১০৫, মৌলভীবাজারে ৩ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৭টি হাওর রয়েছে। এই এলাকায় ৩৭৩টি হাওরের মাঝে ৪৭টি বড় হাওর রয়েছে। হঠাৎ ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে সুনামগঞ্জের ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫৩১ হেক্টর, হবিগঞ্জের ১ লাখ ৯ হাজার ৫১৪ হেক্টর, নেত্রকোণার ৭৯ হাজার ৩৪৫ হেক্টর, কিশোরগঞ্জের ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৩ হেক্টর, মৌলভীবাজারের ৪৭ হাজার ৬০২ হেক্টর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৯ হাজার ৬১৬ হেক্টর হাওরের জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অশ্বখুরাকৃতি-বাটির মতো নিম্নাঞ্চল।

হাওর অঞ্চল ঘুরে মনে হলো সর্বত্রই দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। জরুরীভিত্তিতে প্রয়োজনী ব্যবস্থা না নিলে হাওর জনপদের অধিবাসীরা দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ এলাকার প্রায় ৩ কোটি মানুষ এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ফসল হারিয়ে ভাটি অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের দিন কাটছে এখন অর্ধাহারে অনাহারে। নিরুপায় হয়ে অনেকেই জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা. তাহিরপুর, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, দিরাই শাল্লার মানুষেরা কাজের সন্ধানে ঢাকা চট্টগ্রাম মহানগরীর পথে। ধর্মপাশা উপজেলার বেশির ভাগ অসহায় মানুষ ঢাকার কেরানীগঞ্জ, আবদুল্লাহপুর, কামরাঙ্গীরচর, গাজিপুরে বিভিন্ন কাজের সন্ধানে আশ্রয় নিয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। অনেকেই গরু-ছাগল বিক্রী করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে তারা জানান, জীবন বাঁচাতেই গরু-ছাগল বিক্রী করছেন। তাছাড়া ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গরুকে খাওয়ানোর জন্য খড়ও পাওয়া যাচ্ছে না। সে জন্যই অর্ধেক দামে গবাদি পশু বিক্রী করতে বাধ্য হচ্ছেন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. জহির বিন আলম বলেন, ‘সাধারণত আগাম বন্যা আসে এপ্রিলে। এবছর মার্চে চলে এসেছে, এ সময়টাতে ফসলে কীটনাশক ছিটানো হয়। আগাম বন্যা আসায় সেই কীটনাশক পানিতে মিশে গেছে। যে কারণে অ্যামুনিয়া গ্যাসের প্রভাবে পানিতে অক্সিজেন কমে বিষক্রিয়ায় মাছ মরছে। মাছ খেয়ে হাঁস ও পাখি মরছে। এখন অধিক বৃষ্টি হলে পানি বাড়বে, গ্যাসের প্রভাব কমবে। নতুবা পানিতে প্রচুর পরিমানে বিচিং দিয়ে বাতাস মেলাতে হবে। অন্যথায় হাওরাঞ্চলে আমাদের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষের মাঝেও এর প্রভাব পড়বে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট