আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন : ক্ষুদে কারিগর বাবুই পাখি

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২৬

আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন : ক্ষুদে কারিগর বাবুই পাখি

মোঃ শামছুল আলম


নদী-নালা, খাল-বিল আর সবুজে ঘেরা আমাদের এই রূপসী বাংলা। এই প্রকৃতির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে মহান আল্লাহ পাকের অসীম কুদরত ও শৈল্পিক নিদর্শন। আল্লাহর সৃষ্টির তেমনই এক বিস্ময়কর ও অনন্য সৃষ্টি হলো ‘বাবুই পাখি’। গ্রামবাংলার মানুষের কাছে এটি ‘তাঁতি পাখি’ বা ‘কারিগর পাখি’ হিসেবেও পরিচিত। এদের বুদ্ধিমত্তা, নিখুঁত কারিগরি আর নান্দনিক বাসা তৈরির দক্ষতা দেখলে যেকোনো বিবেকবান মানুষ পরম শ্রদ্ধায় মহান স্রষ্টার উদ্দেশ্যে মাথা নত করতে বাধ্য হয়।

কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন জীবজন্তুর কথা উল্লেখ করে মানুষকে তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
“তারা কি লক্ষ্য করে না তাদের উপরস্থ পাখিদের প্রতি, যারা ডানা মেলে ও গুটিয়ে নেয়? পরম করুণাময়ই তাদেরকে স্থির রাখেন।” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৯]

বাবুই পাখি মানুষের মতো কোনো প্রকৌশল বা স্থাপত্য বিদ্যায় পড়াশোনা করেনি। তাদের কাছে নেই কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি। অথচ কেবল নিজের ঠোঁট আর পায়ের নখকে কাজে লাগিয়ে তারা যেভাবে বাতাসের প্রতিকূলে উল্টানো কলসির মতো ঝুলন্ত বাসা তৈরি করে, তা আধুনিক প্রকৌশলীদেরও ভাবিয়ে তোলে!

খড়, তালপাতা, কাশবনের পাতা আর লম্বা ঘাস সংগ্রহ করে তারা গিঁট দিয়ে দিয়ে এত মজবুত বাসা বানায় যে, কালবৈশাখী ঝড়েও সেই বাসা সহজে ভেঙে পড়ে না। বাসা যাতে ঝড়ে বেশি দুলতে না পারে, সেজন্য তারা ভেতরে ভেজা কাদা-মাটির প্রলেপ দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখে! রাতের অন্ধকার দূর করতে বাসায় জোনাকি পোকা ধরে এনে গুঁজে রাখে বলেও লোকমুখে প্রচলিত আছে।

পাখির মতো এই ক্ষুদ্র প্রাণীর মাথায় এত নিখুঁত কৌশল কে ঢুকিয়ে দিলেন? তিনি আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। এটি তাঁরই দেওয়া এক বিশেষ সহজাত জ্ঞান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “তিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর তাকে পথ প্রদর্শন করেছেন।” [সূরা ত্বা-হা: ৫০]

এক সময় ছিল যখন গ্রামবাংলার মেঠোপথে তাল গাছে বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা দুলতে দেখা যেত এবং আমার নিজের শৈশবের এক মধুর স্মৃতি আজও হৃদয়ে অমলিন। আমাদের সাধুগ্রামে ছোটবেলায় দেখতাম আয়নুল হক খেলু এবং রাজন চাচাদের পুকুর পাড়ে বড় বড় তালগাছগুলোতে শত শত বাবুই পাখি বাসা বেঁধেছে। স্কুল থেকে ফিরেই দৌড়ে যেতাম সেই পুকুর পাড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তাদের বাসা বানানোর নিখুঁত কারিগরি, কিচিরমিচির শব্দ আর দলবেঁধে উড়ে বেড়ানো দেখতাম। সেই দৃশ্য, সেই শব্দ আজও চোখে আর কানে লেগে আছে, ভুলতে পারিনি। মনে হতো যেন আল্লাহর এক জীবন্ত কারখানা বসেছে তাল গাছের মাথায়!

কবি রজনীকান্ত সেন তাঁর ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতায় বাবুইকে নিয়ে লিখেছিলেন—
“বাবুই পাখিরে ডাকি, কহিছে চড়াই—
কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই…।”

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সময়ের বিবর্তনে আজ সেই সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে তাল গাছ কেটে ফেলা, আধুনিক নগরায়ন ও ফসলের মাঠে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে তাদের আশ্রয় ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তারা আজ বিলুপ্তির পথে।

বাবুই পাখি কেবল একটি পাখি নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য এবং মহান আল্লাহর কুদরতের জীবন্ত দলিল। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” [সূরা আল-ইমরান: ১৯০]

তাই এই সুন্দর সৃষ্টিকে বাঁচাতে বেশি বেশি তাল গাছ রোপণ ও পাখিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব।

ইসলাম সমস্ত প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “পৃথিবীতে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।” [তিরমিজি : ১৯২৪]


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট