কানাডায় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের লুটেরাদের ‘বেগমপাড়া’

প্রকাশিত: ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৫

কানাডায় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের লুটেরাদের ‘বেগমপাড়া’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সরকারের নজর মূলত যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে— অথচ পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে কানাডায়।

অবৈধ অর্থে কানাডায় বিলাসবহুল বাড়ি, কনডোমিনিয়াম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন শতাধিক বাংলাদেশি প্রভাবশালী। তাদের অনেকে এখন স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কানাডায় স্থায়ী বসবাসের (পিআর) সুযোগ পেয়েছেন, যার একটি বড় অংশ বিনিয়োগকারী কোটায় গেছেন— এবং সেই বিনিয়োগের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বেগমপুরা থেকে ‘বেগমপাড়া’

টরন্টোর পাশের শহর মিসিসাগা, লেক অন্টারিওর তীরে। এখানেই বছর দশেক আগে ভারতীয় পরিচালক রশ্মি লাম্বার ডকুমেন্টারি ‘বেগমপুরা: দ্য ওয়াইভস কলোনি’ আলোচনায় আসে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত স্বামীদের পাঠানো টাকায় স্ত্রীদের জীবনযাপন নিয়ে নির্মিত সেই চলচ্চিত্র থেকেই “বেগমপাড়া” শব্দটির জনপ্রিয়তা।

কিন্তু বাংলাদেশের ‘বেগমপাড়া’ তার সম্পূর্ণ উল্টো অর্থে ব্যবহৃত— যেখানে দুর্নীতি, অর্থ লুট আর অবৈধ সম্পদ পাচার করে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও আমলারা কানাডায় স্থায়ী নিবাস গড়েছেন।

লুটের টাকায় বিলাসবহুল জীবন;

বাংলাদেশ থেকে কানাডায় অর্থ পাঠানোর সবচেয়ে প্রচলিত রুট হচ্ছে তৃতীয় দেশ হয়ে ‘বৈধ পথে’ অর্থ স্থানান্তর।
ব্যাংক লুট, ঘুষ ও কমিশনের টাকাগুলো আগে যায় সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ে, সেখান থেকে বৈধ বিনিয়োগের মোড়কে কানাডায়।

প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের নামও রয়েছে আলোচনায়। যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব নেওয়ার পর সেই তথ্য গোপন রেখে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তিনি। অভিযোগ, দুর্নীতির অর্থ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় স্থানান্তর করে সম্পদ গড়েছেন।

রাজনীতিক–আমলা–ব্যবসায়ীদের দ্বিতীয় নিবাস;

২০০৭–০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সময় থেকেই প্রভাবশালীদের কানাডায় পাড়ি জমানোর প্রবণতা বাড়ে। তখনই শুরু হয় টরন্টোর বেলভিউ, রিচমন্ড হিল, মিসিসাগা ও মার্কহাম এলাকায় বিলাসবহুল আবাসন কেনা।

রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের দাবি, বৃহত্তর টরন্টো এলাকায় অন্তত ২০০ জন বাংলাদেশি অতি বিত্তশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের সম্পদের উৎস জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, “অনেকে ১–২ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বাড়ি কিনেছেন, কিন্তু এখানে তাদের কোনো আয়ের উৎস দেখা যায় না।”

বিনিয়োগের আড়ালে পাচার;

কানাডা সরকার ২০১৪ সালে বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসন স্কিম বন্ধ করে দেয়। কারণ, এই ক্যাটাগরিতে আসা অভিবাসীদের কর পরিশোধ ছিল ন্যূনতম, অথচ তাদের জীবনযাপন ছিল অতি বিলাসবহুল।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিযোগ, “কানাডার করদাতারা তাদের কষ্টার্জিত টাকায় রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, আর দুর্নীতিবাজরা বাংলাদেশ থেকে লুটের অর্থ এনে এখানে ভোগবিলাসে মেতে আছেন।”

সরকারের উদ্যোগ;

অর্থ পাচার ঠেকাতে ও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে সরকার এখন কূটনৈতিকভাবে তৎপর। তবে বিশেষজ্ঞদের মত, কেবল যুক্তরাজ্য বা দুবাই নয়— কানাডাকেও প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কারণ সেখানেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি—
“বেগমপাড়া”।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট