১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২৪
মোঃ শামছুল আলম
অফুরন্ত বরকত ও তাৎপর্যমণ্ডিত মহররম মাসে বহু নবী-রাসুলগন ইমানের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে মুক্তি ও নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন। কারবালাসহ অসংখ্য তথ্যবহুল ঐতিহাসিক ঘটনা এ মাসে সংঘটিত হয়েছিল।
৬১ হিজরীর ১০ মুহররম ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে রাহমাতুল্লিল আলামীনের প্রাণপ্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা জাহরা (রাঃ) এর নয়নমণি ৪র্থ খলীফা হযরত আলী (রাঃ)-এর পুত্র ইমাম হোসাইন দামেস্ক অধিপতি কুখ্যাত ইয়াজিদের অসভ্য সেনাবাহিনীর হাতে সপরিবারে শাহাদাতবরণ করলে ও এদিন ঐতিহাসিক কারবালা দিবস হিসেবেও মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে নব উদ্দীপনায় উদযাপিত হয়ে আসছে।
নীতি, আদর্শ, সত্য, মানবতা ও মুক্তির জন্য নিঃসংকোচচিত্তে এ রকম প্রাণ দানের ঘটনা বিরল। কপটচারী ও অস্ত্রে-শস্ত্রে সুসজ্জিত ফৌজের মুকাবিলায় ঈমানী জজবা ও অকুতোভয় মনে হযরত হোসাইন (রাঃ) যে প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন তা কালজয়ী ইতিহাস হয়ে যুগ যুগ ধরে এটি মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে রয়েছে।
কবি বলেছেন ‘‘ইসলাম জিন্দা হোতা হায় কারবালা কে বাদ’’ অর্থাৎ কারবালা যুদ্ধের পর ইসলাম সত্যিকার অর্থে পূনর্জীবিত হল।
হযরত হোসাইন (রাঃ) ছিলেন অসাধারণ ঈমানী চরিত্রের অধিকারী। তিনি বেশী বেশী দান খয়রাত করতেন। দৃঢ়চেতা ও আপোষহীন মনোভাব পোষণ করতেন। খেলাফতে রাশেদার পুনর্জীবনের গভীর আবেগে তিনি অটুট সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে ভেদ রেখা টানা তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তিনি বলতেন-
‘‘জিল্লতি বরদাশত করার চেয়ে মৃত্যুই উত্তম।’’
তাই তিনি অন্যায়, অসাম্য, কলুষতা ও ভোগবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সে কথার বাস্তব প্রমাণ দিয়ে গেলেন। তিনি অসভ্য শাসক ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলে কারবালা অধ্যায়ের সৃষ্টি হতো না এবং তাকে নবীজীর দৌহিত্র হিসেবে ধর্মীয় উচ্চাসনে বসানো হতো। কিন্তু তিনি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ইসলামের সামষ্টিকরূপকে মসজিদের ভেতরে আটকে রেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি বরং নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে ইসলামী আদর্শের মান মর্যাদাকে সবার উপরে স্থান দিয়ে গেছেন।
আজ মুসলিম উম্মাহ সেই গৌরবজনক অধ্যায় ভুলে গেছে। ত্যাগ, নিষ্ঠা ও কুরবানীর শিক্ষা হারিয়ে নানা রকম শরীয়ত গর্হিত রসম-রেওয়াজে জড়িয়ে পড়েছে।
আমরা আজ কারবালার দিবসে হায় হোসাইন! হায় হোসাইন! বলে চিৎকার মাতামাতি মাতম ও শোক রেলি বের করি। আর এগুলো পালনের মধ্য দিয়ে ভাবি কারবালার শিক্ষা হোসাইনের আত্মদান হাসিল হয়ে গেছে!
অথচ কারবালার শিক্ষা এটা ছিল না। কারবালার শিক্ষা ছিল হোসাইনি চেতনায় জেগে উঠা। হোসাইনী চেতনার ভিত্তিতে ঈমান ও আমলের পশরা সজানানো। ফিরনী শিরনী আর শোক রেলি করে দায়িত্ব থেকে মুক্তি হবে না।
অথচ মুসলিম জাতির রাজনীতি নামে যে নীতি ছিল তা ছিল বিশ্বকে অবাক করার মতো সুন্দর। যে মুসলিম জাতির অর্থনীতিতে কখনো ধ্বস নামার কথা ছিল না, যে অর্থ ব্যবস্থা জগতকে চমকিয়ে দিয়ে ছিল অল্পকদিনে। বিশ্বের বড় বড় বন্দরে মুসলমানদের বাণিজ্য জাহাজ নোঙ্গর করত, সেই মুসলিম জাতি আজ অন্যের পণ্যের ক্রেতা!
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজনীতি ছিল মুসলিম জাতির। কোথায় সে তার আত্মমর্যাদা হারিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তবতার নিরিখে প্রশ্নগুলো অবলীলায় হৃদয়ে ভিড় জমায়। কবি ইকবাল, মুসলমানদের ওই দৈন্যদশা দেখে বড় আক্ষপের সুরে বলেছিলেন-
‘মুসলিম জাতি আজো ঘুমন্ত অবস্থায় আছে’
অথচ ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে জাগ্রত করার জন্য ৬১ হিজরিতে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) নিজের পবিত্র রক্ত কারবালার জমিনে ঢেলে দিয়ে গেছেন।
আল্লামা ইকবাল মরহুম হোসাইনি চেতনার মেসেজ দিয়েছেন এভাবে- ওই দিন ইমাম হোসাইন (রা.) নিজের তাজা রক্তকে কালি বানিয়ে কারবালার উত্তপ্ত বালুকণাকের খাতায় বানিয়ে আগামীর অনাগত পৃথিবীকে একথা জানিয়ে দিলেন যে দেখ, ওহে মুসলিম সমাজ, সমাজপতি ও ক্ষমতাধরেরা বুঝে নাও; রক্ত লাগলে রক্ত দিতে প্রস্তুত থাকবে, জীবন লাগলে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকবে, তবুও অন্যায় অত্যাচার জুলুম নির্যাতনের কাছে মাথা নত করা যাবে না। হায়!আজ সেই হোসাইনী চেতনার বড়ো অভাব আমাদের মাঝে।
আজ বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহার এই নাজুক পরিস্থিতি হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) সেই অনুসৃত নীতি কেই আঙুল দিয়ে দিখিয়ে দেয়। দেশে দেশে কেন আজ মুসলিমরা নিপীড়িত নিগৃহীত লাঞ্ছিত? কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, বার্মা- আরাকান, আফগান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও চীন রক্তাক্ত জনপদের নাম? কেন মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি আয় উন্নতি সর্বক্ষেত্রে পশ্চিমাগোষ্ঠীর মোড়লিপনা?
আমাদের মাঝে আশুরা আসে যায়। আশুরার আনুষ্ঠানিকতাও পালন হয়। তবে হয় না শুধু কারবলার শিক্ষা নেয়া। ৬১ হিজরি ১০ই মহাররম থেকে ১৪৪৩ হিজরির ১০ মহাররম পর্যন্ত সময়গ্রন্থি আওয়াজ দিচ্ছে- হে মুসলমান জাতি তোমরা কবে জাগ্রত হবে? আর কতো হোসাইনির রক্ত লাগবে?
আশুরার দিনে মহানবীর সা. এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র আত্মত্যাগের উজ্জ্বল নিদর্শন হযরত হোসাইন রা. এর মর্মান্তিক শাহাদাত এবং ইসলামের জন্য তাঁর পরিবারবর্গের বিসর্জন আমাদেরকে এ বার্তাই দিয়ে যায় যে, এই দিনে আমাদেরকে শুধু শোকে কাতর হলে চলবে না বরং ন্যায়ের পথে অবিচলতার দীপ্ত শপথ নিতে হবে। অসত্য-অন্যায়ের কাছে মাথা নত নয় বরং আমাদের হতে হবে আত্মত্যাগের বলে বলিয়ান, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং হকের পথে পাহাড়ের ন্যায় অটল-অবিচল।
হযরত হোসাইন রা. যেমনিভাবে অযোগ্য, অত্যাচারী ও জালিম শাসক এজিদের কুশাসন, অনাচার ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কুফা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং কারবালার প্রান্তরে এজিদ বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে সত্যের জয়গান গেয়ে হাসিমুখে অকাতরে জীবন দিয়েছেন তবুও এজিদের কুশাসন মেনে নেননি, তদ্রুপ সময় এসেছে সকল দুর্বৃত্তায়ন, অনৈতিকতা, সন্ত্রাস, জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। প্রয়োজনে আত্মবিসর্জন দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
মর্সিয়া ক্রন্দন কিংবা শোক মাতম-মিছিল করে মুহাররমের তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে না। বরং মুহাররমের শিক্ষা হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আদর্শের সংগ্রামের শিক্ষা এবং জালিমের বিপক্ষে মাজলুমের লড়াইয়ের শিক্ষা। আল্লাহ পাক আমাদেরকে বুঝার তাওফিক দান করুন। -আমিন
লেখক ও প্রাবন্ধিক

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D