কাশ্মীরের গাজা : লাখো সেনা নিয়েও ভারত যেখানে ধরাশায়ী

প্রকাশিত: ৮:৫৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০১৯

কাশ্মীরের গাজা : লাখো সেনা নিয়েও ভারত যেখানে ধরাশায়ী

‘আমাদের মৃতদেহের ওপর থেকেই কেবল তারা সৌরায় প্রবেশ করতে পারবে’

এক পাশে পাথরের স্তূপ, অন্যপাশে জ্বলন্ত আগুন, এর মাঝেই কাশ্মীরের এক যুবক তার এলাকার প্রবেশদ্বারকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যাতে করে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর কোন সদস্য সেখানে প্রবেশ করেতে না পারে। অবরুদ্ধ ‘কাশ্মীরের গাজা’র মসজিদের মাইকে স্বাধীনতার স্লোগান দেয় বাসিন্দারা।

ভারত অধিষ্ঠিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে এবং অঞ্চলটিকে পুরোপুরি ভারতে সংহত করার নয়াদিল্লির বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে শ্রীনগরের উপকণ্ঠে সৌরা এলাকাটিকে সুরক্ষা বাহিনীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই ছিটমহলটিতে ভারতের সুরক্ষা বাহিনীর প্রবেশ করেতে দেয়া হয়নি।

আগস্টের শুরু থেকেই এখানকার বাসিন্দারা ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। ভারতীয় সৈন্যদের হাত থেকে এলাকাটি রক্ষার্থে টিন, কাঠের গুঁড়ি, তেলের ট্যাঙ্ক এবং কংক্রিটের স্তম্ভ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করেছে এবং বিভিন্ন গুহা বানিয়ে সেখানে রুটিন করে তারা পাহাড়া দিচ্ছে।

সৌরার রাত্রিকালীন পাহাড়াদার স্বেচ্ছাসেবকদের একজন মুফেদ, তিনি ফরাসী বার্তা সংস্থা এএফপি’কে বলেন, ‘শুধুমাত্র আমাদের মৃতদেহের ওপর থেকেই তারা সৌরায় প্রবেশ করতে পারবে। আমরা ভারতকে এক ইঞ্চিও জমি দেব না। গাজা যেমন ইসরায়েলকে প্রতিহত করছে, তেমনি আমরাও আমাদের মাতৃভূমির জন্যে সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করব।’

ভারতের এমন পদক্ষেপের আগেই, দীর্ঘ প্রায় ৩ দশক ধরে কাশ্মীরিরা ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে আসছে। যে সংঘর্ষে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক। যেসব কারণে বিশ্বের সবচেয়ে রক্তাক্ত স্থানের স্বীকৃতি পায় এই ভূ-স্বর্গ।

কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের ঘোষণার আগে থেকেই ভারত সরকার কয়েক হাজার অতিরিক্ত সৈন্য সহিংস অঞ্চলটিতে মোতায়েন করে। ইতোমধ্যে সেখানে থাকা ৫ লাখ সেনার সঙ্গে যোগ দিয়েছে আরও প্রায় লাখখানেক। অস্থিরতার আশঙ্কায় ভারী সশস্ত্র এই অঞ্চলকে আরও সামরিকীকরন করে জনসাধারণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মোদী সরকার।

তবে, এসব কিছুতে আটকে রাখা যায়নি কাশ্মীরিদের, প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে, নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির সৌরার নাগরিকেরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। ৯ আগস্ট কমপক্ষে ১৫ হাজার মানুষ সৌরায় সমাবেশ করে- অধিকৃত কাশ্মীরের যা এখন পর্যন্ত বৃহত্তম বিক্ষোভ।

জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গোলাবারুদ, টিয়ার গ্যাস ও পেল্লেট বন্দুকের গুলি ছুঁড়ছে। যাতে, এখন পর্যন্ত প্রায় দুই ডজনেরও বেশি লোক আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

হ্রদের পাশের প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বাড়ির সৌরার তিনদিকই সুরক্ষা বাহিনী দ্বারা বেষ্টিত। সেখানকার বিখ্যাত মসজিদ জেনব সায়েব বর্তমানে আশেপাশের হাজার হাজার বিক্ষোভকারীদের একটি সংসদ পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।

প্রতি রাতেই, এখানকার বাসিন্দারা ‘কাশ্মীরের স্বাধীনতা’ এবং ‘গো ইন্ডিয়া, গো ব্যাক’ শব্দগুলো লিখতে টর্চ এবং গ্রাফিতি নিয়ে সরু গলি পেরিয়ে যাত্রা করেন। সৌরার মূল হাইওয়ে পেরিয়ে কোনও পুলিশ সদস্যকে চলাচল করতে দেখলেই  স্থানীয়রা একে অপরের মাধ্যমে বার্তা চালান করে।

ড্রোন এবং হেলিকপ্টার মোতায়েন করে কমপক্ষে তিনবার সৌরাতে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী, কিন্তু পাথর নিক্ষেপকারী কাশ্মীরি যুবকদের প্রতিবাদে তারা পিছে হটতে বাধ্য হয়। তাদের কেউ কেউ কুড়াল এবং বর্শায় সজ্জিতও ছিল।

পুলিশের ভীড় ভাঙ্গার কৌশলগুলোর এরা বেশ পরিচিত, তাই এই বিক্ষোভকারীরা মরিচ এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গেই তারা মুখ ধোবার জন্য লবণ পানি ব্যবহার করে। এমনকি নিজেকে রক্ষা করতে ও শ্বাস নিতে তারা হেলমেট এবং চশমা পরে বিক্ষোভ চালায়।

এলাকা থেকে বের হবার পরে এ পর্যন্ত তিন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নাহিদা নামের এক স্থানীয় এএফপিকে বলেন, ‘তারা (ভারত) আমাদের সহনশীলতার পরীক্ষা করছে এবং তারা অবশ্যই ব্যর্থ হবে। আমরা গতবার তাদের পরাজিত করেছি এবং এই পরিস্থিতি যদি বছরের পর বছর ধরেও চলতে থাকে, তবুও আমরা ছাড় দেব না।’

সৌরার এমন বিক্ষোভ সত্ত্বেও, কর্তৃপক্ষ দখল করা কাশ্মীর লকডাউন শিথিল করেবেশিরভাগ ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ রয়েছে বলে দাবি করে।

১৯৪৭ সালে স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হতে রাজি হয়েছিল কাশ্মীর। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার শর্তে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে সম্মত হওয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ-এর জন্ম এই সৌরাতেই।

আরও স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করা তার জাতীয় সম্মেলন দলটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীর শাসন করেছে। প্রথমে তার পুত্র ফারুক আবদুল্লাহ এবং পরে তার নাতি ওমর আবদুল্লাহ অধিকৃত কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। লকডাউনের অংশ হিসাবে ফারুক ও ওমর আবদুল্লাহকে আটক করেছে নয়াদিল্লি।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আরও ভারতবিরোধী হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। কয়েক দশক ধরেই ভারত বিরোধী মনোভাব কাশ্মীরিদের মধ্যে বেড়েছে, যা স্থানটিকে আরও বেশি সহিংস ও উত্তপ্ত করেছে। ২০১৬ সালে যখন জনপ্রিয় কাশ্মীরি যোদ্ধার মৃত্যু ঘটে, তখন রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারী বাহিনীর সঙ্গে সৌরার কয়েক ডজন সংঘর্ষের ইতিহাস ছিল।

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট