১১ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৩৬ পূর্বাহ্ণ, মে ২৬, ২০১৯
আমরা নৌকায় উঠতে চাইনি। ছোট ছোট নৌকা। ধারণ ক্ষমতা ৪০ থেকে ৪২ জন যাত্রী। দালালরা আমাদের ধরে-ধরে ছোট নৌকায় ঢিল ছুড়ে ফেলে দেয়। এরপর ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী তুলে নৌকা সাগরে ভাসিয়ে দেয়। ১০ মিনিটের মধ্যেই ডুবে যায় নৌকা। এরপরও আমরা হাতে হাত ধরে প্রায় ৮ ঘণ্টা সাগরে ভেসেছিলাম। এর মধ্যে একেকজন করে মারা যায়। এবং যারা মারা যায় তারা হাতে থাকা বহর থেকে ছুটে যায়। তলিয়ে যায় সাগরের জলে।’- ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি থেকে বেঁচে ফেরা সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের বিলাল আহমদ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন। পুরো ঘটনার বর্ণনা জানাতে গিয়ে কখনো-কখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন- ‘প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরবো, স্বপ্নেও ভাবিনি। শেষ মুহূর্ত লড়াই করে বেঁচে গেছি।’
সাগর ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারিয়েছে বিলাল আহমদের তিন স্বজন। এর মধ্যে রয়েছেন, ভাজিতা লিটন শিকদার ও আজিজ আহমদ এবং ভাগিনা আহমদ হোসেন। এই তিনজন ছিলেন বিলালের সঙ্গে। সাগরে সাঁতার কাটতে কাটতে এক সময় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। হাত ধরা থাকা অবস্থায়ই ক্লান্ত ও সাগরের ঠাণ্ডা জলে তাদের দেহ নিথর হয়ে পড়ে।
এরপর তারা তলিয়ে যায় সাগরের গভীর জলে। একই পরিবারের চারজন এক সঙ্গে ইতালি যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলেও গতকাল দুপুরের দিকে কেবল মাত্র চাচা বিলাল আহমদ বাড়িতে এসে পৌঁছেন। আর অন্যরা সাগর জলে নিখোঁজ হয়ে যায়। ফেঞ্চুগঞ্জের মুহিদপুর গ্রামে বিলালের বাড়ি। গতকাল সকালে তিনি বাড়ি পৌঁছার পর কান্নার রোল পড়ে। স্বজনরা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন বিলাল আহমদও। জানালেন- ওদের বাঁচাতে পারলাম না। চোখের সামনেই সাগরের জলে হারিয়ে গেল তিনজন। বাড়ি ফিরে একটু স্বস্তি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিলাল আহমদ। জানালেন লোমহর্ষক সেই সাগরের কাহিনী। প্রথমেই জানান- সাগর পথে তাদের ইতালি যাওয়ার কথা ছিল না। আদম ব্যবসায়ীরা তাদের আকাশ পথে ফ্লাইটে ইতালি যাওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু ভারত যাওয়ার পর পরই তারা পরাধীন হয়ে যান। দালালরা যা বলেছে তাই তাদের পালন করতে হয়েছে। সিলেটের রাজা ম্যানশনের ইয়াহিয়া ওভারসিজ থেকে তারা ইতালি যাওয়ার কন্ট্রাক্ট করেন। ডিসেম্বরে তাদের সিলেট থেকে ভারতের কলকাতা নিয়ে যায় দালালরা। সেখানে তাদের একটি হোটেলে রাখে। সেখান থেকে দিল্লি, মুম্বই নিয়ে যায়।
এরপর নিয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। ওখানে নিয়ে যাওয়ার পর তারা দালালদের হেফাজতে বন্দি রাখে। বাড়ির সঙ্গেও ভালো ভাবে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। শ্রীলঙ্কা থেকে তাদের ফ্লাইট দেয় তিউনিশিয়া। সেখান থেকে নিয়ে আসেন লিবিয়া। তিউনিশিয়া থেকে লিবিয়া যাওয়ার সময় তারা দালালদের বলেছিলেন- ‘তারা লিবিয়া যাবেন না। ইতালি নিয়ে যাও।’ কিন্তু দালালরা কথা শুনেনি। দালালরা বলেছিল- লিবিয়া থেকে তাদের ফ্লাইটে করে ইতালি পাঠাবে। বহরে অনেক বাংলাদেশি ছিল। লিবিয়া নেয়ার পর তাদের ওপর চলে নির্যাতনের স্টিম রোলার। দালালরা তাদের একটি ঘরে বন্দি করে রাখে। সেখানে তারা ৮২ জনকে মাত্র ১২ কেজি চাল দিতো খাওয়ার জন্য। তাও সপ্তাহে চার দিন তারা এক মুঠো করে ভাত খেতে পারতেন। আর বাকি দুইদিন তারা উপোষ থেকেছেন। এভাবে তাদের প্রায় ৪ মাস লিবিয়ার একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়। ওখানে থাকার সময় তাদের মারধর করা হতো। দালালদের কোনো কিছুর প্রতিবাদ করলেই ধরে নিয়ে মারধর করতো। ফ্লাইটে ইতালি পাঠানোর জন্য দালালরা তাদের বাড়ি থেকে আরো টাকা নেয়ায়। কিন্তু তারা ফ্লাইট দেয়নি। চলতি মাসের ৭ তারিখ ৮ জন লিবিয়ান দালাল আসে। তাদের হাতে ছিল লাঠি।
ওই ঘর থেকে সবাইকে নিয়ে একটি মরু এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানেও দুইদিন তাদের না খাইয়ে রাখে। রমজানের মধ্যে তারা না খেয়েই রোজা রাখেন। চাইলে মাঝে মধ্যে পানি দিতো। দুই দিন মরুভূমিতে রাখার পর দালালরা রাতে এসে সবাইকে এক সঙ্গে রাখে। এবং বলে তাদের সঙ্গে দৌড়াতে হবে। না দৌড়ালে তারা হাতের লাঠি ও চাবুক দিয়ে মারধর করে। যে ৮ জন দালাল ছিল তারা সবাই লিবিয়ান। কারো কথা শুনতো না তারা। দৌড়াতে গিয়ে কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়লে তারা তাকে মারধর করতো। ওই সময় দালালরা জানান- তাদের শিপে করে ইতালি পাঠাবে। সেই অনুপাতে রাতে লিবিয়া উপকূলে একটি নৌকায় তাদের তুলে। এভাবে তিনটি নৌকায় মোট ১৫০ জন যাত্রী তুলে। এবং নৌকা সাগর পথে রওয়ানা শুরু করে। বিলাল জানান- সম্ভব আবারো তিউনিশিয়া উপকূলে নিয়ে তাদের একটি বড় ট্রলারে তুলে। ওই ট্রলারে আরো কয়েক ঘণ্টা চলার পর দুটি নৌকা আনে তারা। একেকটি নৌকার ধারণ ক্ষমতা ৪০-৪২ জন যাত্রীর। কিন্তু একেকটি নৌকায় তোলা হয় ৮২ জন করে। নৌকা দেখেই আমরা ভড়কে যাই। অথৈ সাগরে ওই নৌকায় কেউ উঠতে চাচ্ছিল না।
কিন্তু দালালরা নাছোড়বান্দা। নৌকায় উঠতে হবে। এ সময় তারা কয়েকজনকে ধাক্কা দিয়ে বড় ট্রলার থেকে নৌকায় ফেলে দেয়। আর কয়েকজনকে হাত দিয়ে ধরে ঢিল ছুড়ে ওই নৌকায় ফেলে দেয়। এরপর দালালরা অপর একটি ছোট নৌকা নিয়ে চলে আসে। আর বড় ট্রলারটিও দালালদের পথ অনুসরণ করে চলে যায়। নৌকায় ধারণ ক্ষমতার বেশি সংখ্যক যাত্রী উঠে যাওয়ায় কানায় কানায় পানি এসে যায়। ঢেউয়ের তালে তালে নৌকায়ও পানি ঢুকে। এই অবস্থায় সবাই ভয় পেয়ে যায়। দালালরা চলে যাওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মাথায় সাগরের বুকে ডুবে যায় নৌকা। এ সময় ‘বাঁচাও-বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। সাগরের পানি ছিলো বরফের মতো। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এরপরও বাঁচার তাগিদে সবাই সাঁতার কাটে। বিলাল জানান- আমরা বাঙালি সবাই একে অপরের হাত ধরে সাঁতার কাটি। সাগরের বুকে সাঁতার কাটছি। কোথাও কোনো কূল কিনারা নেই। এই অবস্থায় সবাই প্রায় বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছি। প্রায় ৮ ঘণ্টা সাঁতার কাটার সময় ৮২ জনের মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ জন বেঁচে আছি। আর সবাই মারা যায়। সাঁতার কাটতে কাটতে ক্লান্ত হয়ে তারা সাগরের জলেই হারিয়ে যায়। চোখের সামনে স্বজনরা মারা যাওয়ার দৃশ্য দেখেছি। তারা মারা যায়। হারিয়ে যায়। কিছুই করার ছিল না। নিজেও বেঁচে থাকবো সেটি কল্পনা করতে পারেনি।
এদিকে- প্রায় ৯ ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর তিউনিশিয়ার একটি জেলের নৌকা দেখতে পায় তারা। ‘হেল্প-হেল্প’ বলে চিৎকার করার পর ওই নৌকা তাদের কাছে আসে। এসে তাদের দেখে আবার বিপরীত দিকে চলা শুরু করে। তাদের দেখেও না দেখার ভান করে জেলেরা। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা আবার ফিরে আসে। এসে তিউনেশিয়ার জেলেরা তাদের মোট ১৭ জনকে নৌকায় তুলে। এর মধ্যে ১৪ জনই হচ্ছে বাংলাদেশের। বাকিরা ছিল মরক্কো ও অপর আরেকটি দেশের। নৌকার ওঠার পর তাদের আরো একজনের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে রেড ক্রিসেন্ট তাদের ১৬ জনকে উদ্ধার করে। বিলাল জানান- ইতালি যাওয়ার জন্য তাদের এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হবে সেটি দালালরা আগে বলেনি। বলেছিল- ফ্লাইটে ইতালি পাঠাবে। আর নেয়ার পর ‘গেইম’ বলে তাদের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। এটা মর্মান্তিক, অমানবিক ও হৃদয়বিদারক বলে দাবি করেন বিলাল আহমদ। এজন্য তিনি দায়ী ট্রাভেলস মালিক ও দালালদের শাস্তি দাবি করেন।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D