১৩ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৩০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২৬
মোঃ মাহমুদুল ইসলাম : বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজার ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, প্রাকৃতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থান রয়েছে। এর মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত সংরক্ষিত পুরাকীর্তির সংখ্যা ৫১৭টি। সবুজের নৈসর্গিক মায়া, পাহাড়–টিলা আর স্বচ্ছ নদীর ছন্দময় প্রবাহে মোড়া সিলেট বহুদিন ধরেই ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য তীর্থস্থান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিক আবেশ ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল যেন শহুরে ক্লান্তি থেকে মুক্তির এক শান্ত আশ্রয়। চা–বাগানের সারি, ঝরনার কলতান, পাথর-বিছানো নদীর পাড় আর ঐতিহ্যবাহী মাজার–মসজিদ সিলেটকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এই জনপদ তাই শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়, বরং বারবার ফিরে আসার আকর্ষণে ভরা এক অনুভূতির নাম। বিভিন্ন রুচির পর্যটকদের জন্য সিলেট জেলার পর্যটন স্পটের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ লেখনীতে।
সিলেট শহরের সার্কিট হাউস থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার অবস্থিত। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই ইমারতটি ফৌজদার ফরহাদ খান ১৬৬৭ সালে নির্মাণ করেন। হজরত শাহজালাল (র.) ছিলেন ১৪ শতকে উপমহাদেশের একজন ইতিহাসখ্যাত সুফি ও পীর। তাঁর পুরো নাম শায়খ জালালুদ্দীন।
জানা যায়, সিলেটের প্রথম মুসলমান শেখ বোরহান উদ্দিন-এর ওপর রাজা গৌড় গোবিন্দের অত্যাচারের ঘটনায় হজরত শাহজালাল (র.) তাঁর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়াসহ জায়নামাজে চড়ে সুরমা নদী পার হয়ে সিলেট আগমন করেন। অত্যাচারী রাজা গৌড় গোবিন্দকে যুদ্ধে পরাজিত করে এই প্রখ্যাত সুফি দরবেশ সিলেটে ইসলাম প্রচার এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মৃত্যুর পর তিনি এখানেই সমাহিত হন। মাজারের প্রধান ফটকের পরেই রয়েছে একটি মসজিদ। সিলেটের আরেকজন প্রখ্যাত সুফি ছিলেন হজরত শাহ পরান (র.)। তিনি হজরত শাহজালাল (র.)-এর ভাগ্নে এবং তাঁর জন্ম ইয়েমেনে। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৭ কিমি দূরে খাদিম নগরে খানকা স্থাপন করে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। তাঁর মাজারটি উঁচু টিলার উপরে দেয়াল দিয়ে ঘেরা। মাজারের পাশে ‘আশা গাছ’ নামে একটি প্রাচীন গাছ ও একটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে।
সিলেটের প্রবেশদ্বারে সুরমা নদীর ওপর ক্বীন ব্রিজের অবস্থান। আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল ক্বীন-এর সিলেট সফরের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে এবং আসামের সাথে ট্রেন চলাচলের জন্য ১৯৩৬ সালে লোহা দিয়ে এই সেতুটি নির্মিত হয়। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৩৫০ মিটার ও প্রস্থ ৫ দশমিক ৫০ মিটার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেতুর একাংশ বিধ্বস্ত হয় এবং পরবর্তীতে তা মেরামত করা হয়। সিলেটের কৃতীপুরুষ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানীর স্মৃতিরক্ষার্থে সিলেটের কোতোয়ালি থানায় অবস্থিত তাঁর বাসভবনে গড়ে তোলা হয়েছে ওসমানী স্মৃতি জাদুঘর। ১৯৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে এটি হস্তান্তর করা হয়। জাদুঘরের তিনটি গ্যালারিতে জেনারেল ওসমানীর ব্যবহৃত কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র, পেইন্টিং, আলোকচিত্র ও বইপত্রসহ সকল স্মৃতিচিহ্ন যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। সিলেটের প্রখ্যাত মরমি কবি হাসন রাজা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র সংরক্ষণের লক্ষ্যে সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে একটি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়। এখানে দেওয়ান হাসন রাজা ও দেওয়ান একলিমুর রাজা চৌধুরীর গানের পাণ্ডুলিপি রয়েছে। শ্বেত পাথর ও রুপার তৈজসপত্র ছাড়াও জাদুঘরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ২ দশমিক ৫৪ সেমি × ১ দশমিক ৯০ সেমি আকারের পবিত্র কোরান শরিফের ক্ষুদ্র সংস্করণ।
সিলেট শহর থেকে ৬২ কিমি উত্তর-পূর্ব দিকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলং-এর অবস্থান। সৌন্দর্যের কারণে জাফলং সারাদেশে প্রকৃতির কন্যা হিসেবে পরিচিত। সীমান্তের ওপারে ডাউকি পাহাড় থেকে নেমে আসা পিয়াইন নদীর প্রবাহে সৃষ্ট ঝর্ণাধারা জাফলংকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ এক লীলাভূমিতে পরিণত করেছে। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। একই সাথে ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উঁচু পাহাড়, গহিন অরণ্য ও পিনপতন নীরবতার কারণে এলাকাটি দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।
জাফলং-এর শীত ও বর্ষা মৌসুমের রূপ ভিন্ন। খাসিয়া পাহাড়ের সবুজাভ চূড়ায় তুলার মতো মেঘরাজির বিচরণ এবং যখন-তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি জাফলংকে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করে। সিলেটের জাফলং পর্যটন কেন্দ্রের ১২ কিলোমিটার পরই পান্তুমাই ঝর্ণার অবস্থান। সীমান্ত জনপদ গোয়াইনঘাট উপজেলা সদর থেকে ৯ কিমি দূরে মাতুরতলা বাজার থেকে পূর্ব দিকে পিয়াইন নদীর তীর ঘেঁষা ওই পান্তুমাই গ্রাম। এই পাহাড়ি ঝর্ণা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১ হাজার ২৬৯ নম্বর পিলারের পূর্বদিকে অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এই ঝর্ণা ‘ফাটা ছড়া’ নামে পরিচিত। ভারতের অভ্যন্তরে এই পাহাড়ের অবস্থান হলেও এর সম্মুখভাগের সৌন্দর্য পড়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে পর্যটকরা পান্তুমাই ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করে। সিলেটের সুন্দরবন হিসেবে পরিচিত রাতারগুল দেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাভূমির বন। নদী ও হাওরবেষ্টিত প্রায় ৫০৫ একর আয়তনের এলাকাটির অবস্থান গোয়াইনঘাট থানার ফতেহপুর ইউনিয়নের রাতারগুল গ্রামে। এই বনে তিন ধরনের গাছই বেশি- হিজল, করচ, বরণ আর পাটি বেত। এ সকল গাছের পাশাপাশি ইকরা, খাগড়া, মুর্তা, বেত ও শন বন রাতারগুলকে অনন্য জলার বনে পরিণত করেছে। ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সাথে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি ও ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে এই বনে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় বাংলাদেশ সীমানা সংলগ্ন বিছানাকান্দি একটি সৌন্দর্যমণ্ডিত প্রাকৃতিক পর্যটন স্থান। সীমান্তের ওপারে উৎপন্ন পাহাড়ি ঝর্ণার পানি ও গোয়াইন নদীর সঙ্গমস্থলটি বিছানাকান্দি নামে পরিচিত। এখানকার স্বচ্ছ পানিতে ছড়ানো বিভিন্ন বর্ণের নুড়ি-পাথরের উপস্থিতি যে কাউকে মুগ্ধ করবে। এ স্থানের জলপ্রবাহ ও দিগন্ত-বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ি সৌন্দর্য সহজেই একজন পর্যটকের যাত্রার ক্লান্তিকে দূর করতে পারে। পর্যটকদের জন্য এখানে নৌভ্রমণের সুযোগ রয়েছে।
সিলেট শহর থেকে ৪১ কিমি দূরে জৈন্তাপুরের সন্নিকটে লালাখালের অবস্থান। স্থানটি ছোট-বড় বিভিন্ন আকৃতির পাহাড় ও টিলা দ্বারা বেষ্টিত। এখানে চমৎকার স্বচ্ছ নীল পানির একটি খাল রয়েছে। লালাখাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থান। ভারতের জৈন্তা পর্বত থেকে প্রবাহিত লালাখালে নৌভ্রমণ ছাড়াও এখানকার খাসিয়া গ্রাম পরিদর্শন ও চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে। সিলেট সদর থেকে ২৯ কিমি দূরত্বে কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ভোলাগঞ্জ । ভারতের চেরাপুঞ্জি ও শিলং রাজ্যের পাহাড়ের পাদদেশে এ পাথর কোয়ারির অবস্থান যা ‘সাদা পাথর’ নামে সর্বাধিক পরিচিত। কাচের মতো স্বচ্ছ জলরাশি, জলের বুকে সবুজ পাহাড়ের ছায়া, ছোট-বড় পাথরের স্তূপ- সব মিলিয়ে ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য অতুলনীয়। এখানে নদীর বুকে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর পাথর উত্তোলনের কর্মকাণ্ড অবলোকন করা যায়।
সিলেট শহর থেকে ১৭ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৬০ মিটার উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শ্রী চৈতন্যদেবের আদি বাসস্থান স্থানীয়দের নিকট ‘ঠাকুরবাড়ি’ নামে পরিচিত। ১৮ শতকের মধ্যভাগে সিলেটের তৎকালীন দেওয়ান গোলাব রায়ের উদ্যোগে মন্দিরটি নির্মিত হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণকারী শ্রী চৈতন্য বাংলার অন্যতম একজন সংস্কারক ছিলেন। তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ ও ভক্তিবাদের প্রবর্তক। শ্রী চৈতন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বশ্রেণির লোকের প্রতি ভ্রাতৃসম আচরণে বিশ্বাসী ছিলেন। তেরো ধাপ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলে মন্দির প্রাঙ্গণ। সিংহদ্বারের বামদিকে পাঁচটি ছোট মন্দির রয়েছে। এখানে দোল মন্দিরই মূল মন্দির। এখানে প্রতিবছর বারুণী ও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমায় তাঁর জন্মদিবস উপলক্ষ্যে মেলা বসে।
সিলেটের সকল পর্যটন স্থানকে একটি লেখায় তুলে আনা কষ্টসাধ্য কাজ। ভ্রমণপিপাসুদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় স্পটগুলো বাছাই করে সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সিলেট কেবল একটি পর্যটন এলাকা নয়, এটি ভ্রমণপিপাসুদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার এক অনির্বচনীয় ঠিকানা। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, আতিথেয়তায় ভরপুর মানুষ আর সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা-সবকিছু মিলিয়ে সিলেট প্রতিটি পর্যটকের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। পরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাময় অঞ্চলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব। তাতে করে যেমন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিও নতুন গতি পাবে । তাই প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এই স্বর্গরাজ্য সিলেট নিঃসন্দেহে ভ্রমণপিপাসুদের তীর্থস্থান হিসেবেই আগামীতেও তার অবস্থান ধরে রাখবে। (পিআইডি ফিচার)
লেখক : তথ্য সহকারী, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, তথ্য অধিদফতর, সিলেট।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D