গাছ থেকে আম না পাড়ায় কিশোরকে হত্যার পর অপমৃত্যুর নাটক

প্রকাশিত: ৪:০৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২৫

গাছ থেকে আম না পাড়ায় কিশোরকে হত্যার পর অপমৃত্যুর নাটক

আম না পাড়ায় রিংকন বিশ্বাস নামে ১২ বছর বয়সী কিশোরকে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যার পর নাটক সাজানো হয় অপমৃত্যুর। ঘটনার পর ইউপি সদস্য আওয়ামী লীগ নেতার চাপে মুখাগ্নি করেই রিংকনের সমাধি করেন তার বাবা-মা।

নিহত রিংকন বিশ্বাস (১২) সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউরা গ্রামের শ্রিকান্ত বিশ্বাস ও বাসন্তি রানী দম্পতির ছেলে। ঘটনাটি ঘটেছে গত বছরের ২২ জুন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউরা গ্রামে।

ঘটনার এক বছর পর আসল রহস্য উদঘাটন করলো পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) হত্যায় জড়িত সন্দেহে দুই আসামিকে সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার কদমতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পিবিআই।

গ্রেফতারকৃতরা হলো-পাবেল ওরফে তাবেল (২১) এবং এজাহারনামীয় আসামী জহিরুল ইসলামকে (২৩)। তাদেরকে পুলিশ রিমান্ডে আনা হয়। পরবর্তীতে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।

তাদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গাছ থেকে আম না পাড়ায় কিশোর রিংকন বিশ্বাসকে হত্যা করে মাছের খামারের দুই কর্মচারী পাবেল ও জহিরুল। ২০২৪ সালের ২২ জুন লুলু মেম্বারের মাছের খামারে এই ঘটনা ঘটে। পরে প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ সমর্থিত সাবেক মেম্বার লুলু মিয়া গংদের চাপে নিহতের বাবা শ্রিকান্ত বিশ্বাস সেদিনই ছেলেকে মুখাগ্নি শেষে সমাধিস্থ করেন। নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকা স্বত্ত্বেও সাবেক মেম্বার ও তার পক্ষের লোকজনের প্রভাবে ভিকটিমের পরিবার মৃত দেহের ছবি উত্তোলন করতে এবং থানায় যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন।

ঘটনার ২দিন পর গত বছরের ২৪ জুন নিহতের বাবা শ্রিকান্ত বিশ্বাসের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জগন্নাথপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু হয়। এরপর ২৭ জুন থানা পুলিশ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর হতে নিহতের লাশ উত্তোলন সহ সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ছেলে হত্যার ঘটনায় গত বছরের ১৬ জুলাই নিহতের মা বাসন্তি রানী বাদী হয়ে লুলু মেম্বারসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা (সিআর নং-১৪২/২৪) দায়ের করেন। আদালত জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিহতের মায়ের মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

গত বছরের ১৫ অক্টোবর ময়না তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর থানা পুলিশ অপমৃত্যু দেখায়। তদন্ত দেখানো হয় ভিকটিম রিংকন বিশ্বাস গাছে উঠে আম পাড়তে গিয়ে পা ফসকে গাছের নিচে পুকুরে থাকা গোবরের মধ্যে মাথা নিচের দিকে পড়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছে। পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করে এবং সিআর মামলা নং-১৪২/২৪ মামলাটি তদন্ত শেষে চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

দাখিলকৃত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজির আবেদন দাখিল করেন নিহতের মা বাসন্তি রানী। গত বছরের ৫ নভেম্বর আদালতের নির্দেশে জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গত বছরের ৯ নভেম্বর হত্যার অভিযোগে মায়ের দায়ের করা মামলাটি এক মাসের মধ্যেই তদন্ত শেষ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

এতে পুনরায় বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৩ মার্চ আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে পিবিআই সিলেট জেলা মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে এবং এসআই মো. তারিকুল ইসলামের ওপর তদন্ত বর্তায়। তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে তথ্য প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৭ জুলাই ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে আসামী পাবেল প্রকাশ তাবেল (২১) এবং এজাহারনামীয় আসামী জহিরুল ইসলাম (২৩) দ্বয়কে সিলেট নগররি দক্ষিণ সুরমার কদমতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে গ্রেফতার করে আদালত থেকে রিমান্ডে নেন।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামীদ্বয় জানায়, ঘটনার দিন দুপুর অনুমান ১২ টা ৩৫ মিনিটের দিকে লুলু মেম্বারের খামারের গোয়াল ঘরের পাশের আম গাছ থেকে কর্মচারী রিংকন বিশ্বাসকে আম পাড়তে বলে। কিন্তু গাছে বিদ্যুতের তার থাকায় রিংকন গাছে উঠতে রাজি হয়নি। একাধিকবার বলার পরও রিংকন রাজি না হওয়ায় আসামীরা ক্ষুব্ধ হয়ে রিংকনকে এলোপাথাড়ি মারপিট করে। এক পর্যায়ে খামারের গোয়ালের পাশে গোবরের ঢিবিতে রিংকন বিশ্বাসের মুখ ও মাথা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। হত্যার ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে হত্যাকে গাছ থেকে পড়ে গোবরের পানিতে ডুবে দূর্ঘটনাজনিত মৃত্যু মর্মে প্রচার করে।

রোববার (২০ জুলাই) রাতে পিবিআই সিলেটের পরিদর্শক মো. মোরছালিন এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানান, মামলার তদন্ত কার্যক্রম এবং অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট