“একটি অশ্লীল সঙ্গীত ও আমাদের সঙ্গীত ”

প্রকাশিত: ৩:১৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২২

“একটি অশ্লীল সঙ্গীত ও আমাদের সঙ্গীত ”

 || কামরুল হাসান দর্পন ||


একটি মুক্ত আলোচনা : দেশের স্বনামধন্য বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির সদস্য সচিব ও দক্ষ সংগঠক: কামরুল হাসান দর্পন এর এই মুক্ত আলোচনাটি সিলেট সংবাদ পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো ।

বিশেষ প্রতিবেদক : মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার


আমাদের সঙ্গীত এখন এক নিদারুণ করুণ দশায় উপনীত হইয়াছে বলিয়া মনে হইতাছে। নতুন, পুরাতন, অভিজ্ঞ, অনভিজ্ঞ, যশা, প্রথিতযশা শিল্পীদের অনেকেই যেন খেই হারাইয়া লাইনচ্যুত হইয়া নিজেকে অপভ্রংশ হিসেবে তুলিয়া ধরিবার আপ্রাণ চেষ্টার ত্রুটি না করিয়া এমনসব গান তৈয়ার এবং প্রদর্শন করিতেছেন, যাহাতে আমাদের গানের অপূর্ব কথামালা, সুরলহরী, হৃদয়সিঞ্চিত ও হরণকরা, আধো আলো আধো অন্ধকারে চোখ বন্ধ করিয়া কান খুলিয়া মন বসাইয়া-ভাসাইয়া শোনা, হৃদয় মোচড় দিয়া চোখের কোনে অশ্রুর চিকচিক আভার যে অপূর্ব, অনির্বচনীয় সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য, উহা যেন নাপাম বোমার মতো শ্বাসরোধ করিয়া হত্যা চেষ্টায় অবিরত রহিয়াছেন। আগামী ২৫ এপ্রিল ১২ বৈশাখ একখানি সঙ্গীত আমাদেরকে উপহার দেওয়া হইবে। দেশের এক শ্রোতাপ্রিয়, জাতীয় পুরস্কার পাইয়া ধন্য হইয়া উঠা এক গায়িকা এবং গায়কের কণ্ঠে গীত হইয়া প্রকাশিত হইবে। গায়িকাটি শ্রোতাপ্রিয়, উহাতে ভ্রম করিয়াও কেহ সন্দেহ পোষণ করিবে না। তিনি জনপ্রতিনিধিও বটে। খটকাটি এইখানেই লাগিয়া যায়। ভাবিয়া আকূল হইয়া উঠি, কেমন করিয়া তিনি জনগণকে নিজ কণ্ঠে এমন গীত শোনাইতে পারেন! এই তিনিই কিন্তু সঙ্গীত দিয়া সকলের মন কাড়িয়া জনপ্রতিনিধি হইয়া উঠিয়াছেন। শুধু জনপ্রতিনিধিই নন, আমাদের সংস্কৃতির বিশ্বায়নের প্রতিনিধিও বটে। উহা সম্ভব হইয়াছে, উহার সঙ্গীত শিকড় হইতে উত্থিত হইয়া জনমানসে ঠাঁই লইবার কারণে। বড়ই আফসোস জাগিয়া উঠিয়াছে। উহা কিভাবে, কেমন করিয়া এমন গান করিতে পারেন তাহা ভাবিয়া ‘বুক ফাটিয়া’ যাইবার উপক্রম হইয়াছে। এখন আসল কথায় আসি। তিনি যে সঙ্গীতটি গাহিয়াছেন তাহার কথামালা এইভাবে গাঁথা হইয়াছে, ‘আব্বে বাপের বড় পোলা/ তার চোখ দুইটা ঘোলা ঘোলা- গলির চিপায় খিস্তি ঝাড়ে/ জামার বোতাম রাখে খোলা…।’ এমন খিস্তিঝারা গানটি লইয়া তিনি ও তাহার সহশিল্পী হাজির হইবেন। তিনি বলিয়াছেন, তরুণ প্রজন্মের কথা মাথায় রাখিয়া পুরনো ঢাকার ভাষার আদলে রিদমিক মজার একটি গান তৈয়ার হইয়াছে। প্রশ্ন জাগিয়াছে, তরুণ প্রজন্মকে আমরা আর কি শিখাইব? গাল-মন্দ, অন্দরমহলের কথা হইতে শুরু করিয়া পথের ধারের গলির মোড়ের বদমায়েশ তরুণদের উগড়ে দেয়া ধর্ষণসদৃশ কথামালা তুলিয়া ধরিয়া নতুন প্রজন্মকে শিখাইবার আর কি বাকি রহিয়াছে? এইসব গান না গাইলে কি আমাদের সুরের, প্রাণের, মনের, ভাবের, প্রেমের, বিরহের মহাসঙ্গীত জগতের মস্ত ক্ষতি হইয়া যাইত? তিনি তো পারিতেন, একজন দায়িত্বশীল গাতক হইয়া এই জায়গাটি ধরিয়া রাখিতে। এই সঙ্গীতজীবনে তিনি তো এমন অনেক গীত গাইয়া সঙ্গীতঘাতক হইয়া উঠিয়াছিলেন। উহাতে জীবনে কমকিছু পান নাই। সেইসব পিছনে ফেলিয়া আজ যেই অবস্থানে আসীন হইয়াছেন, উহা বিবেচনা করিয়াও তো নিজেকে এইসব উচ্ছিষ্ট গীত হইতে বিরত থাকিতে ও নিজেকে ধরিয়া রাখিতে পারিতেন। কেমন করিয়া পারিলেন এমন গীত গাইতে! তাহার সহশিল্পী বলিয়াছেন, নতুন জেনারেশনের সহিত সংযুক্তি ঘটাইবার একটা চেষ্টা ছিল উহা। বলিতে ইচ্ছা করে, ওহে মূর্খ! নতুন জেনারেশনকে আমাদের সঙ্গীতের হাজার বছরের ইতিহাসের নির্যাসটুকু না দিয়া নবজাতককে হত্যা করিবার মতো মুখে মধুর পরিবর্তে নিমক দিতেছ! এই সঙ্গীতের মাধ্যমে ভবিষ্যত নাগরিকদের কিসের সহিত সংযুক্তি ঘটাইতে চাইছ? উহারা তোমাদের ক্ষমা করিবে না। তোমাদের মতো এইরূপ বিকৃত রুচির মানুষদের স্মরণ করাইয়া দিবার জন্য এক শ্রোতার একটি উক্তি তুলিয়া ধরিলে তোমাদের চেতন ও বিচলন হইবে কিনা জানি না। উহার পরও তুলিয়া ধরিতে চাই। ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ নামক একখানি চলচ্চিত্রে সালমান শাহ ও শাবনূর নামক নটরাজ ও নটরানির মুখে একখানি গান ছিল। গানখানি হইল, ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি কিছু থেকে থাকে…।’ ইউটিউবে গানখানি পাওয়া যায়। গানখানি শুনিয়া উহার নিচে এক দর্শক-শ্রোতা লিখিয়াছে, যেই ব্যক্তির মৃত্যু আমার জন্মেরও আগে…তাহাকে আমি এতটা ভালোবাসিয়া ফেলিব কখনো ভাবি নাই….!!! উহার এই মন্তব্য হইতে বুঝিতে অসুবিধা হয় না, নটরাজের সুকর্ম এতটাই ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল ও জ্বলজ্বল হইয়া রহিয়াছে যে, উহার মৃত্যুর বহু বছর গত হইবার পরও যে শিশুটি জন্মিয়াছে, উহাও তাহার ভক্ত হইয়া আকূল হইয়া উঠিয়াছে। উহার চাইতে এই জীবনে আর কি সার্থক হইতে পারে! যে গানখানির সহিত নটরাজ ও নটরানি অভিনয় করিয়াছেন, সেই গানখানির কারণেই উহারা এখনও দর্শক-শ্রোতাদের মনে গাঁথিয়া-বাঁচিয়া রহিয়াছেন। যে সঙ্গীতখানি লইয়া নাতিদীর্ঘ আলোচনার সূত্রপাত করিলাম উহার গায়িকাকে ভবিষ্যৎ নাগরিকরা কোথায় রাখিবে, কিসে খুঁজিবে, এ চিন্তাটুকু তিনি করেন কিনা জানি না। তবে নিশ্চিত করিয়া বলা যাইতে পারে, নতুন প্রজন্ম এইসব অচ্ছুৎ ও অবাঞ্চিত সঙ্গীত নামক খিস্তিখেউড় ছুড়িয়া ফেলিয়া ঠিকই আমাদের সঙ্গীতের শেকড় খুজিয়া বাহির করিয়া লইবে।

লেখক:-: সিনিয়র সহ সম্পাদক দৈনিক ইনকিলাব |√| সদস্য সচিব : বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি ( বাচসাস-)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট