ঐতিহ্যের সাধুগ্রাম : মেধা, মনন ও মানবতার এক অনন্য উপাখ্যান

প্রকাশিত: ৬:১৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

ঐতিহ্যের সাধুগ্রাম : মেধা, মনন ও মানবতার এক অনন্য উপাখ্যান

মোঃ শামছুল আলম


“ল্যাম্পপোস্টের সাদা আলো আর রাতের এই শান্ত প্রকৃতি—কিছু দৃশ্য সত্যিই আত্মাকে ছুঁয়ে যায়।” রাতের মায়াবী আলোয় ঘেরা সিলেটের বিশ্বনাথের এক আদর্শ, শান্ত ও সুন্দর গ্রাম ‘সাধুগ্রাম’। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, বরং আমার নয়ন ও মননে মিশে থাকা এক পরম ভালোবাসার নাম। এই মাটিতেই আমার জন্ম এবং এই মাটির কোলেই যেন জীবনের শেষ শায়িত রূপটি খুঁজে পাই—এটাই আমার পরম আকুতি। প্রকৃতি, মানবতা আর কৃতি সন্তানদের গৌরবে সাধুগ্রাম আজ এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত!

ভোরের সাধুগ্রাম ও প্রাণবন্ত সকাল:

রাত পেরিয়ে সকাল হলে প্রিয় সাধুগ্রামবাসীর ঘুম ভাঙে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসা “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম”—ফজরের সেই সুরেলা আজানের ধ্বনিতে এবং পাখ-পাখালির কিচিরমিচির সুরের অপূর্ব ঐক্যতানে! এক আত্মিক প্রশান্তি দিয়ে শুরু হয় সাধুগ্রামের প্রতিটি দিন। ফজরের নামাজ আদায় করেই যে যার কর্মব্যস্ততায় মগ্ন হয়ে পড়েন। কৃষক ভাইরা ছুটে যান সবুজ ক্ষেত-খামারে, ব্যবসায়ীরা খোলেন দোকানের পাট, আর পেশাজীবীরা পা বাড়ান আপন কর্মস্থলে। একই সাথে ছোট ছোট সোনামণিরা কায়দা-কোরআন বুকে নিয়ে যায় মক্তবে, আর স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারা সারিবদ্ধভাবে হেঁটে চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পানে! এই চিরচেনা ও কর্মমুখর সকাল যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস!

রাতের সাধুগ্রাম ও মায়াবী প্রকৃতি:

দিনের কোলাহল শেষে যখন রাত নামে, তখন সাধুগ্রাম এক অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়! রাতের সোডিয়াম আলোয় যখন পুরো গ্রামটি আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন চারপাশে এক অপার্থিব ও মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়! ল্যাম্পপোস্টের সেই সাদা আলো আর রাতের নিস্তব্ধ প্রকৃতি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়! এই শান্ত স্নিগ্ধ দৃশ্য যেকোনো মানুষের আত্মাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়, যা গ্রামীণ জীবনের এক পরমMinকতা!

মেধা, মনন ও আলোকিত মানুষের পুণ্যভূমি:

সাধুগ্রাম কেবল প্রাকৃতিক রূপেই অনন্য নয়, বরং এটি শিক্ষা, দীক্ষা ও মেধার এক পবিত্র কেন্দ্র। এই পুণ্যভূমিতে জন্ম নিয়েছেন অনেক ক্ষণজন্মা ও আলোকিত মানুষ, যাঁরা আজ মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা মরহুম মো ইব্রাহিম আলী মাস্টার, যিনি ধর্মদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক হিসেবে আলো ছড়িয়েছেন এবং জাতি গড়ার সুমহান কারিগর ছিলেন।

এছাড়াও এই গ্রামের কৃতি সন্তানদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত ও সুনামধন্য চিকিৎসক ডাক্তার আফরোজ আলী, সমাজকে আলোকিত করা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মরহুম ইঞ্জিনিয়ার মোঃ তফাজ্জল আলী এবং আইনের জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র অ্যাডভোকেট তজমুল আলী। একই সাথে গ্রামের সামাজিক ও প্রশাসনিক উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব এবং কয়েকবারের নির্বাচিত সফল মেম্বার জনাব আব্দুল জলিল হিরণ।

অতীতের এই নক্ষত্রদের গৌরবোজ্জ্বল পথ ধরে বর্তমান প্রজন্মেও প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন মেসবাহ আহমেদ এবং বিশেষ করে, নারীদের অগ্রযাত্রায় ও নারী শিক্ষার প্রসারে অনন্য ভূমিকা রাখছেন আমাদের পরিবারের সুসন্তান ও আমার পরম শ্রদ্ধেয় ভাবী সাহেরা ডলি; যিনি ধর্মদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে সমাজ বিনির্মাণে ও আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

তাঁদের মতো অসংখ্য আলেম-হাফিজ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং শিক্ষকের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে আমাদের এই পবিত্র মাটি।

বিশ্বমঞ্চে সাধুগ্রামের কৃতি সন্তান:

সাধুগ্রামের মেধার সুবাস আজ শুধু নিজ গ্রাম বা দেশের সীমানায় আবদ্ধ নেই। এই গ্রামের কৃতি ও মেধাবী সন্তানরা আজ দেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। সুদূর প্রবাসে থেকেও তাঁরা তাঁদের মেধা, সততা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে নিজ গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ লড়ছেন আইন ও ন্যায়ের পক্ষে ব্যারিস্টার হিসেবে, কেউ নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করছেন শিক্ষকতায়, আবার কেউ সফল ব্যবসায়ী হিসেবে অর্থনীতিতে রাখছেন অসামান্য অবদান। বিশ্বের যেখানেই তাঁরা থাকুন না কেন, নাড়ির টান আর সাধুগ্রামের স্মৃতি তাঁদের অন্তরে সদা জাগ্রত।

মানবতার সেবায় সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও প্রবাসী সমাজ:

একটি আদর্শ গ্রামের মূল শক্তি হলো তার ঐক্য ও মানবিকতা। সাধুগ্রামকে একটি সুন্দর ও স্বনির্ভর গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলতে দুটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে—”সাধুগ্রাম ওয়েলফেয়ার ফান্ড” (প্রবাসীদের অর্থায়নে গঠিত) এবং “সাধুগ্রাম সমাজ কল্যাণ যুব সংঘ”।

এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমে প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে ফুড প্যাক বিতরণ করা হয়। এছাড়া, বছরজুড়েই আর্তমানবতার সেবায় দরিদ্রদের আর্থিক সাহায্য, চিকিৎসা সহায়তা এবং অভাবী পরিবারের ছেলে-মেয়েদের বিবাহে বিশেষ সহযোগিতা প্রদান করা হয়ে থাকে।

সেবার ব্রতে উৎসর্গীকৃত প্রাণ:

আমাদের গ্রামের ছেলেরা খুব কর্মঠ, সৎ, সাহসী এবং একে অপরের প্রতি ভীষণ অমায়িক। বিশেষ করে গরিব, দুঃখী, অনাথ এবং অসহায় মানুষের পাশে যারা সবসময় নিঃস্বার্থভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তাঁদের অবদান সাধুগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

প্রবাসে অবস্থানরত রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও সমাজসেবকদের মধ্যে অন্যতম হলেন শফিকুর রহমান সাজু, আবদুল মোমিন নোমান, জুনেদ আহমেদ, মো খালেদ হাসান, এস এম ইয়াহইয়া রিলাল, আয়নুল হক খেলু, রুবেল, আবুল কালাম, মোঃ শফিউল আলম মামুন, এবং মোহাম্মদ আলী।

ঠিক তেমনিভাবে নিজ দেশে থেকে মাঠ পর্যায়ে মানব সেবায় নিয়োজিত আছেন মো আতাউর রহমান, মো রফিকুল আলাম ইকবাল, লয়লুছ মিয়া, মো সায়ফুল আলম নজরুল, সেবুল মিয়া, সেলিম মিয়া, আখলুছ মিয়া, আবুল হাসান, আব্দুস সামাদ, সিরাজুল আলম, ইমন আহমেদ, আবদুল গফুর, সাহেদ, আব্দুল মুহিত, খোকন আহমেদ, ফয়জুল ইসলাম, হাফেজ কামরুল ইসলাম, মৌলভী নাজমুল হাসান সায়েম এবং অন্যান্য অনেক।

প্রবাসীদের অর্থ আর দেশের যুবকদের অক্লান্ত পরিশ্রমই সাধুগ্রামকে এক অনন্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে।

সবিশেষে:

বিশ্বনাথের বুকে যেন এক টুকরো শান্ত ছবি,
যার রূপ দেখে মুগ্ধ হয় রাতের চাঁদের কবি।
আদর্শ এক গাঁয়ের নাম যে আমার সাধুগ্রাম,
সেথায় কাটে শৈশব মোর, সেথায় জুড়ায় প্রাণ।

রাতের বেলা সোডিয়ামের ওই হালকা আলো,
গ্রামের শান্ত প্রকৃতিকে বাসতে শেখায় ভালো।
ল্যাম্পপোস্টের সেই আলো আর মায়াবী এক রাত,
আত্মা ছুঁয়ে যায় নিমেষে, জুড়ায় যে চিলতে হাত।

নয়নে মোর সেই সে ছবি, মননে তার বাস,
এই গাঁয়েতেই কেটে যাক বারোটি মাস।
এই মাটিতে জন্ম আমার, এখানেই পাই প্রীতি,
শেষ শয্যাও হোক যেন এই সাধুগ্রামেরই মাটি।

ভোরের আজানের পবিত্রতা, রাতের সোডিয়াম আলোর মায়াবী সৌন্দর্য, পূর্বসূরিদের গৌরবময় অতীত এবং বর্তমান প্রজন্মের নিঃস্বার্থ মানবিকতা—সব মিলিয়ে সাধুগ্রাম এক অনুকরণীয় ও আদর্শ গ্রাম। এই পবিত্র মাটিতে জন্ম নিতে পেরে আমি ধন্য ও গর্বিত। জীবনের সব আলো-আঁধারি পেরিয়ে, পরম করুণাময়ের কাছে আমার একটাই শেষ প্রার্থনা—এই প্রিয় সাধুগ্রামের মাটির বুকেই যেন আমি চিরদিনের জন্য শায়িত হতে পারি।

মোঃ শামছুল আলম
লেখক ও প্রাবন্ধিক



এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট