|
প্রকাশিত: ১১:১৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৮, ২০২২
মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার : মো. শাহজাহান ওমর। মুক্তিযুদ্ধকালে ৯ নম্বর সেক্টরের টাকি সাব সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। রণাঙ্গনে অসামান্য ত্যাগ ও বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় আইন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মেজর (অব.) ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর এখন রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদে।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় এবং বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে শাহজাহান ওমর কথা বলেছেন নয়াদেশ এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিবেদক মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার ।
নয়াদেশঃ কোন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন?
মো. শাহজাহান ওমর: জাতি পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি লাভ করুক, এই চেতনা-উপলব্ধি থেকে যুদ্ধে যোগ দিয়েছি। আমি তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলাম, পাকিস্তানের খারিয়া সেনানিবাসের ক্যাপ্টেন। লম্বা কাহিনি। ওই সময় দেখলাম পাকিস্তানি অফিসাররা বাংলাদেশে যারা আসতো তারা ফেরার সময় ব্রিফকেসভর্তি টাকা নিয়ে যেতো। এক সময় দেখলাম তৎকালীন পূর্ব পকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা মেয়ে-ছেলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে যে চিঠি পেতাম, তাতে ভাবতে থাকলাম পাকিস্তান আর্মিতে আর চাকরি করা যায় না। দুজন বন্ধুসহ ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে বর্ডার ক্রস করে জম্মুতে (কাশ্মীর) আসি। ওখান থেকে দিল্লি হয়ে কলকাতা থিয়েটার রোডে (এম এ জি) ওসমানী সাহেবের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে ৯ নম্বর সেক্টরে পোস্টিং করেন। আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল সাহেব। তিনি আমাকে বৃহত্তর বরিশালের সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে বরগুনা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন।
নয়াদেশঃ যে চেতনা নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, তার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি কতটুকু?
মো. শাহজাহান ওমর: জাতির প্রত্যাশা তো একদিনে পূরণ হয় না। একটা গণতান্ত্রিক দেশে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের জন্য অনেক সময় লাগে। যারা আজ পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র বলে দাবি করে তারাও শতভাগ পূর্ণাঙ্গ নয়। তবে সময়ের সঙ্গে তারা অনেক উন্নতি লাভ করছে। আমাদের দেশেও হবে। আমাদের দেশের গণতন্ত্র হলো উন্নত দেশের সিস্টেম, ধনী দেশের সিস্টেম, শিক্ষিত দেশের সিস্টেম। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষিত কয়জন? ধনী কয়জন? জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ কয়জন? সমমনাদের জন্য গণতন্ত্র বলা হয়ে থাকে, আমরা তো সমমনা নই। কেউ মোটেও লেখাপড়া জানে না, কেউ অতি শিক্ষিত, কেউ কিছুটা শিক্ষিত, কেউ কিছুটা ধনী, কেউ অতি দরিদ্র। ওই স্ট্যান্ডার্ড গণতন্ত্রের জন্য আমরা এখনো নিজেদের তৈরি করতে পারিনি। সময় লাগবে, ভবিষ্যতে আমরা উন্নতি লাভ করতে পারি।
নয়াদেশঃ স্বাধীনতার ৫০ বছরেও যে কাঙ্ক্ষিত অর্জনগুলো হয়নি তার জন্য বড় বাধা কী?
মো. শাহজাহান ওমর: একটি জাতির ইতিহাসে ৫০বছর কোনো সময়ই নয়। আপনি আজ স্বাধীন করলেন, কাল বাংলাদেশে সোনার পাথর হয়ে যাবে সব, এটা কীভাবে প্রত্যাশা করেন?
আস্তে আস্তে উন্নতি লাভ করছে না? আপনার বয়স কত এখন, কত বছর আগে ঢাকা এসেছেন? আপনি কি দেখেছেন? বাংলামোটর-মগবাজারে কাঁচারাস্তা ছিল। এখন বড় বড় সড়ক। গাড়ির যানজট এগুলো কি হাওয়া থেকে এসেছে? রাস্তাগুলো এমনি হয়েছে? এগুলো স্বাধীনতার সুফল। এদেশে সুপ্রিম কোর্ট হয়েছে। আগে ছিল এটা ইস্ট পাকিস্তান হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট হয়েছে। এগুলো এমনি হয়েছে? আমাদের রক্ত এবং ঘামের পরিশ্রমে এগুলো হয়েছে।
এই যে বিচার ব্যবস্থা, এমনি হয়েছে? আগে পাকিস্তানের লাহোর যাওয়া লাগতো। আমাদের ক্লায়েন্টরা লাহোরে সুপ্রিম কোর্টে যেতেন। আইনজীবীদের লাহোরে যেতে হতো। এখন কি লাহোর যাওয়া লাগে? এই টাকা-পয়সা সময় কে বাঁচিয়ে দিলো? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বাঁচিয়ে দিলাম। উন্নতি হয়নি? আর কী চান? এতো পত্রিকা বের হয়েছে। আগে পত্রিকা ছিল আজাদ, সংবাদ, মর্নিং নিউজ। এখন হাজার হাজার পত্রিকা, এগুলো তো একদিনে হয়নি। হাজার হাজার বহুতল ভবন, এগুলো কি এমনিতে হয়েছে? এগুলো স্বাধীনতার সুফল। একদিনে তাজমহল চান নাকি? ওটাও হবে, স্লোলি অ্যান্ড গ্র্যাজুয়ালি (ধীরে এবং ক্রমান্বয়ে)।
নয়াদেশ: স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে দলগুলো যে রাজনীতি করছে, তা স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি কি না?
মো. শাহজাহান ওমর: আ রে ভাই, স্বাধীনতার বিরোধিতা করছে, ওরা শত্রু। রাজনীতি তো আলাদা জিনিস। রাজনীতি হলো মেজরিটি রুলস (সংখ্যারিষ্ঠের শাসন)। মেজরিটি সবার ওপরে প্রাধান্য পায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব তো বাদ যায়নি। নাগরিকত্ব থাকলে তার ভোটের অধিকার আছে। তার নির্বাচন করার অধিকার আছে। আপনারা যারা ভোটার, তারা বিবেচনা করবেন এই লোকটা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল, ওকে আমরা ভোট দেবো না। আপনারা তাকে ভোট দেন কেন? আপনিই তো ভোট দিয়ে তাকে (নির্বাচিত) বানান। (জামায়াত নেতা মতিউর রহমান) নিজামীকে আমি বানিয়েছি? এলাকার লোকেরা ভোট দিয়ে বানিয়েছে। আমরা যারা রাজনীতি করি, কী বিএনপি বলেন, কী আওয়ামী লীগ বলেন, জামায়াতে ইসলাম, ন্যাপ বলেন, বা আপনারা—কেন বলতে পারেননি, এই লোক ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করেছে? আপনারা বলেননি কেন? এই লোকটা স্বাধীনতাবিরোধী, তাকে ভোট দেবেন না! আপনারা কি এগুলো কখনো বলতে পেরেছেন? তার নাগরিত্ব আছে, ট্যাক্স দেয়, তার ঘরবাড়ি আছে। ঠিকানা আছে। ভোট পেয়েছে, এমপি হয়ে পার্লামেন্টে বসেছে। সেখানে আপনি-আমি সবাই ফেইলর (ব্যর্থ)। আমরা চেতনা সৃষ্টি করতে পারিনি ওই এলাকায় তার পক্ষে ভোট না দেওয়ার জন্য। এর জন্য আমরা সবাই দায়ী। শেখ হাসিনাও দায়ী, খালেদা জিয়াও দায়ী, আমি দায়ী, আপনি দায়ী, সবাই দায়ী।
নয়াদেশঃ এই স্বাধীনতাবিরোধীদের বিপক্ষে চেতনা সৃষ্টি করা যায়নি, এ জন্য ব্যক্তিগতভাবে আপনার ব্যর্থতার জায়গা আছে কি?
মো. শাহজাহান ওমর: মুক্তিযোদ্ধার কাজ কী? যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা, শত্রুমুক্ত করা। আমরা করেছি। গণতন্ত্র রক্ষা করা মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ নয়।
নয়াদেশঃ মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের জন্য কি আপনাদের আর কোনো দায়িত্ব নেই?
মো. শাহজাহান ওমর: আ রে, মুক্তিযুদ্ধের পর নির্বাচিত সরকারের অধীনে যে যার পেশায় চলে গেছে। আমি আর্মিতে ছিলাম, যুদ্ধ শেষে সেনাবাহিনীতে চলে গেছি। আমাদের কাজ শেষ। মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ দেশ স্বাধীন করা। দেশ স্বাধীন হয়েছে। সিভিল প্রশাসন হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে।
নয়াদেশঃ এখনো মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত, এর কারণ কী?
মো. শাহজাহান ওমর: এটা সরকারের ব্যর্থতা। যারাই সরকারের দায়িত্বে ছিলেন বা আছেন, সেখানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করতে পারেননি অথবা দলীয়করণ হয়েছে। দলবাজি করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়াটা হলো সংকীর্ণমনা। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলা করা ঠিক নয়। যারা জীবনে যুদ্ধ করেনি, পালিয়ে বেড়িয়েছে, তারা হচ্ছে এখন বীর উত্তম। আর আমরা যারা বীর উত্তম ছিলাম, তারা এখন বীর অধম হয়ে গেছি।
নয়াদেশঃ : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দলীয়করণের যে কথা বলছেন, তা রোধে আপনাদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না?
মো. শাহজাহান ওমর: কেন ভাই? আমরা অস্ত্র চালাতে জানি। পলিটিকস পলিটিকস দিয়ে কাউন্টার হবে (রাজনীতির বিরোধিতা রাজনীতি দিয়ে হবে)। সেখানে আমার কোনো ইনভল্বমেন্ট নেই। ধরেন, এখন বার্মা আক্রমণ করলো, ভারত আক্রমণ করলো, চীন আক্রমণ করলো। এই বুড়ো বয়সে আমাদের যদি তখন কোনো সার্ভিস দরকার হয়, অথবা যদি মনে করি কিছু পারি, তাহলে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
নয়াদেশঃ স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে…
মো. শাহজাহান ওমর: কোনো বিতর্ক নেই। এটা আওয়ামী লীগ টুইস্ট করছে। সত্য সত্যই। আপনার আব্বাকে জিজ্ঞাসা করেন কে ঘোষণা দিয়েছিল। আপনার দাদা-চাচাকে জিজ্ঞেস করেন। টুইস্ট করলে তো হবে না। বিজয়ী লোক বিজিতদের বিরুদ্ধে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এখন আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে, বিএনপির বিরুদ্ধে বলছে। আবার বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসবে তখন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বলবে।
নয়াদেশঃ জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণা যেটা হয়েছে, সেখানে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বলা আছে…
মো. শাহজাহান ওমর: জিয়াউর রহমানের ঘোষণা দুইটি। প্রথম ঘোষণা দেওয়ার পর আওয়ামী লীগের লোকেরা জিয়াউর রহমানকে ধরলেন স্যার এটা কী করলেন? আমরা আন্দোলন করছি…জিয়াউর রহমান ভাবলেন জনগণও দরকার। প্রথমে সৈন্য নিয়ে, পরে বৃহত্তর ক্ষেত্রের জন্য করেছেন। জনগণ বঙ্গবন্ধুর সমর্থক, তাদের নিয়ে করেছেন। সমস্যা কী?
নয়াদেশঃ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা যেটা দিয়েছেন, সেখানে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বিষয়টা স্বীকার করতে বিএনপির নীরবতা লক্ষ্য করা যায় কেন?
মো. শাহজাহান ওমর: লক্ষ্য করবেন কী? এটা তো রেকর্ড। এটা ইতিহাস। আমি আপনি একটা কথা বললে হবে? কামরুল ইসলাম বলেন, জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইএর এজেন্ট। তিনি বললে কিছু আসে-যায়? তিনি কোন সেক্টরে ছিলেন?
বঙ্গবন্ধুর মতো লোক, জিয়াউর রহমানের মতো লোক নিয়ে সমালোচনা করা আমাদের মতো লোকদের খাটে না। যারা এ ধরনের সমালোচনা করে থাকেন তারা অপরাধী। এগুলো ঠিক নয়।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D