|
প্রকাশিত: ৮:২৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২৬
অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইতালি ও গ্রীসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতে গিয়ে গত এক বছরে হবিগঞ্জের ৩৮ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার নিশ্চিত করেছে। আবার অনেকেই লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের জিম্মিশালায় বন্দি হয়ে বাড়ি-ভিটা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঋণগ্রস্ত হওয়া অনেক যুবকের পরিবারকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপনে থাকতেও হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত যুবকদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে তারা দালালদের সঙ্গে লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইতালিতে যাওয়ার জন্য ১৯ থেকে ২২ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন। আর যারা গ্রীসে যেতে চান, তারা ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকায় দালালদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম ধাপে দালালরা ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা যুবকদের পরিবারের কাছ থেকে নিয়ে নেন। পরবর্তীতে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে ইতালি বা গ্রীসে পাঠানোর কথা বলে বাকি টাকাও বুঝে নেন। এরপর ‘গেম দিচ্ছি’ বলে যুবকদের মাসের পর মাস গেম হাউস নামের বন্দিশালায় আটক রাখা হয়।
এর মধ্যে অনেক যুবককে গেম দেওয়ার কথা বলে সমুদ্রে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেন দালালরা। মাফিয়াদের হাতে আটক হওয়ার পর প্রত্যেক যুবকের কাছ থেকে আরও ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দাবি করা টাকা না দিলে তাদের বেধড়ক মারপিট করা হয়। এমনকি মারধরের করুন দৃশ্য ভিডিও করে বন্দি যুবকদের পরিবারের কাছে পাঠানো হয়।
এসব যুবকের পরিবারের সদস্যরা ভিডিও দেখে নিজেদের সন্তানদের বাঁচাতে জমি-জমা ও ঘর-বাড়ি বিক্রি করে মাফিয়াদের টাকা দিচ্ছেন। যারা টাকা দিচ্ছেন, মাফিয়ারা তাদের ছেড়ে দিচ্ছেন। আর যারা টাকা দিতে পারছেন না, তাদের দিনের পর দিন নির্যাতন করা হচ্ছে। অনেক যুবক দুই থেকে তিনবার মাফিয়াদের কাছে বন্দিও হচ্ছেন।
এ অবস্থায় অনেক যুবক ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ করে গ্রীস বা ইতালিতে পৌঁছাতে পারছেন। আবার অনেকে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাড়িতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। সমুদ্রপথে ট্রলার বা বোট ডুবে অনেকের অকাল মৃত্যুও হচ্ছে। মৃতদের লাশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার কারণে তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
কয়েক মাস আগে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের চানপাড়ার কৃষক তোফাজ্জল মিয়ার ছেলে মোফাজ্জল মিয়া লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকায় দালালের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ধাপে অর্ধেক টাকা দিয়ে তাকে সৌদি আরব পাঠায় দালাল। সৌদি আরবে কয়েকদিন রাখার পর তাকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে নেওয়ার পর কবজায় নিয়ে ধাপে ধাপে ২৩ লাখ টাকা আদায় করে দালাল চক্র।
১২ দিন আগে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইতালির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পর নিখোঁজ আছেন মোফাজ্জল। তার সঙ্গে ছিলেন আরও ৭২ বাংলাদেশি। এদের মধ্যে ১০ জন হবিগঞ্জের বাসিন্দা। তাদের সর্বশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মোফাজ্জলকে প্রথমে ১০ লাখ টাকায় লিবিয়ায় নিয়ে যায় দালাল। সেখানে তাকে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ইতালি নেওয়ার নামে দফায় দফায় নির্যাতন করে ওই চক্র আরও ১৩ লাখ টাকা আদায় করে। এভাবে ৮ মাসে সব মিলিয়ে তার কাছ থেকে ২৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। গত ৬ অক্টোবর ওই যুবকসহ ৭২ বাংলাদেশিকে একটি রাবারের নৌকায় তোলা হয়। গন্তব্য ছিল ইতালি। ওই সময়েই বাড়ির সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল।
মোফাজ্জলের মা ফাতেমা বেগম জানান, ছেলেকে ইউরোপ পাঠানোর জন্য কোনো টাকা ছিল না। তাই সংসারে স্বচ্ছলতা আনার আশায় শেষ সম্বল বাড়ি ও বসত জমি বিক্রি করা হয়েছে। এতেও না হওয়ায় উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। এর সঙ্গে আরও পাঁচ ছেলে-মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটছে তাদের।
ভুক্তভোগীর বাবা তোফাজ্জল মিয়া বলেন, ‘দালাল চক্র প্রথম দুদিন বলেছে, আমার ছেলে সাগরে নৌবাহিনীর জাহাজে আটকা পড়েছে। এখন আর ফোন ধরে না। এত টাকা দিয়েও ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। এখন আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব, কে আমাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করবে?’
ইতালির উদ্দেশে নৌকায় ওঠার আগে মানব পাচারকারী চক্রের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে মামা ও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল মোফাজ্জলের। তিনি জানিয়েছিলেন, একটি নৌযানে দুই গ্রুপে ৭৩ বাংলাদেশি উঠেছেন। কোনো বিপদ না হলে দুই দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে বাড়িতে যোগাযোগ করবেন। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা।
হবিগঞ্জের অন্তত ১০ জনসহ ৭৩ বাংলাদেশি নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পাঁচ দিন পর থেকে ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ শুরু করেন আবুল কাশেম। গত বছর একই পথে ইতালি গিয়েছিলেন তিনি। দূতাবাস থেকে তাকে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি ৭৩ জনের কোনো দল ইতালিতে পৌঁছায়নি। অভিবাসন প্রত্যাশীদের ক্যাম্পেও মোফাজ্জলের খোঁজ পাননি কাশেম।
এর আগে গত এক বছরে হবিগঞ্জের আরও ২৮ জন যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের পরিবার এখনো কোনো সন্ধান পাচ্ছে না। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান ও লাখাই উপজেলার সিংহ গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া লিবিয়া থেকে গ্রীসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাদের সঙ্গে আরও ২০ জন মারা যান। এদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশী ছিলেন।
লুৎফুর রহমান ও জুনাইদ মিয়ার পরিবারের সদস্যরা জানান, সদর উপজেলার রিচি গ্রামের দালাল আব্দুস সালামের মাধ্যমে জনপ্রতি ২২ লাখ টাকা চুক্তিতে গত ডিসেম্বরে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে তারা লিবিয়ায় যান। প্রায় সাড়ে তিন মাস সেখানে থাকার পর গত ২১ মার্চ পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, সেদিনই তারা নৌকায় করে গ্রীসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. রাশেদুল হক চৌধুরী জানান, অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার উদ্দেশে লিবিয়া গিয়ে যেসব যুবক নিখোঁজ হচ্ছেন, তাদের পরিবারের কেউ পুলিশের কাছে অভিযোগ দিচ্ছেন না। যারা অভিযোগ দিচ্ছেন, পুলিশ তাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D