কোম্পানীগঞ্জে বন্ধ হচ্ছে না ধলাই সেতুর নীচ থেকে বালু উত্তোলন

প্রকাশিত: ১১:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২৫

কোম্পানীগঞ্জে বন্ধ হচ্ছে না ধলাই সেতুর নীচ থেকে বালু উত্তোলন

সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জে বিএনপি, জামায়াতসহ স্থানীয় মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধলাই সেতু রক্ষার আন্দোলন করলেও ধলাই সেতুর আশপাশ থেকে বালু লুট বন্ধ হচ্ছে না। বালু লুটের নেতৃত্বে রয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলফু মিয়া। আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা দাবি করেছেন, এই আওয়ামী লীগ নেতার পেছনে ‘বালু দরবেশ’ এর হাত রয়েছে। এলাকাবাসি একটি ব্যানারে ‘বালু দরবেশ’ এর নাম লিখে তাকে থামানোর জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

ধলাই সেতু রক্ষা আন্দোলনের সদস্য-সচিব নিজাম উদ্দিন মাস্টার জানান, গত ১৩ জুলাই থেকে এলাকাবাসী ধলাই সেতু রক্ষায় ব্রীজের নিচ থেকে বেআইনি বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করেন।

তিনি জানান, ১৬ জুলাই প্রথম প্রতিবাদ সভা থেকে ধলাই সেতু রক্ষার জন্য আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হয়। ওইদিন আলমগীর আলম চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক ও নিজাম উদ্দিন মাস্টারকে সদস্য-সচিব করে ধলাই সেতু রক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। ১৭ জুলাই কমিটি নিয়ে এলাকাবাসী ব্রীজের নিচ ও আশপাশে ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন প্রতিরোধে নদীতে নামেন। স্থানীয়দের প্রতিরোধে ড্রেজার মেশিন নিয়ে আলফু মিয়ার লোকজন ব্রীজের গোড়া থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ওইদিন প্রথমবার পর্দার পেছন থেকে সামনে আসেন সিলেট যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ। তিনি ২০টির বেশি মোটরসাইকেল নিয়ে সিলেট নগরী থেকে মোটরসাইকেল মহড়া করে মোট ৪০ জন যুবদল কর্মী নিয়ে ধলাই সেতুর পাশে যান।

সেখানে গিয়ে আন্দোলনকারী নেতাদের একে একে বুঝিয়ে, পরে লোভ দেখিয়ে, সর্বশেষ হুমকি দিয়ে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে আনার চেষ্টা চালান। এসময় মকসুদ আহমদ আলফু মিয়ার ভায়রাভাই ধলাই সেতু দক্ষিণ বালু মহলের ইজারাদার আবদুল্লাহ আল মামুনকে তার খালাতো ভাই পরিচয় দিয়ে তার কাজ কর্মে কেউ যেন বাধা না দেয়- এ আহবান জানান।

ব্রীজ রক্ষায় গঠিত আন্দোলন কমিটি আন্দোলন চালিয়ে গেলে বিষয়টি দেশের প্রায় সবগুলো সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়। এতে বিভিন্ন বিশিষ্ট সংগঠনও যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়। তবুও বালু লুট বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

অবস্থান আরো তীব্র হলে রোববার (১০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ‘বালু দরবেশ’ মকসুদ আহমদের বাহিনী সিলেট নগরীতে ধলাই রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য-সচিব নিজাম উদ্দিন মাস্টারের বাসায় ৯-১০টি মোটরসাইকেল নিয়ে হামলা চালায়। তখন নিজাম উদ্দিন মাস্টার বাসায় ছিলেন না। তারা তালাবদ্ধ বাসার গেটে ও গ্রিলে আঘাত করে তাকে খোঁজে না পেয়ে গালিগালাজ করে চলে যায় বলে নিজাম উদ্দিন মাস্টার সাংবাদিকদের জানান।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের এই ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ শাহাব উদ্দিন জানান, মকসুদ আহমদ জেলাপ্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইউএনও ও কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশকে ঐক্যবদ্ধ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলফু মিয়ার নেতৃত্বে বালুখেকো চক্রের সাথে যৌথমুনাফায় কোম্পানীগঞ্জের সম্পদ ও এম সাইফুর রহমান স্মৃতি বিজড়িত ধলাই সেতুকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন।

তিনি বলেন, ব্রীজটির ৫০০ মিটার বা ১৬০০ ফুট দূরে ধলাই সেতু দক্ষিণ বালু মহাল অবস্থিত। সেখানে দীর্ঘদিন বালু উত্তোলন করায় বালুশূন্য হয়ে পড়েছে। তাই আলফু মিয়া চক্র যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ড্রেজার দিয়ে সেতুর নীচ ও আশপাশ থেকে দিনে-রাতে বেআইনি বালু উত্তোলন করছেন। তাদের বালু লুটের ফলে স্থানীয় কবরস্থানও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে। তিনি জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদকে ‘বালু দরবেশ’ বলে অবিহিত করেছেন।

এ সেতু রক্ষায় অসহায় এলাকাবাসী শেষ পর্যন্ত ব্যানারে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের নাম উল্লেখ করে তাকে প্রতিরোধে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহযোগিতা কামনা করে মানববন্ধন করেছেন। আজ ১১ আগস্ট সোমবার ধলাই নদীর পাড়ে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ জানান, আলফু চেয়ারম্যানের ভায়রাভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন তার দুঃসম্পর্কের তালতোভাই। এজন্য স্থানীয় বিএনপি মনে করছে, এই বালু উত্তোলনের সাথে তিনি জড়িত। আসলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি এই বালুমহাল থেকে আগেও টাকা নিয়েছেন। নতুন করে টাকার পরিমাণ বাড়াতে এখন এই বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আসলেই নিজে এ বালুমহালের সাথে সরাসরি জড়িত নয় বলে দাবি করেন তিনি।

কোম্পানীগঞ্জের মানুষ একযোগে প্রতিবাদ করার পরও একদিনের জন্যও সেতুর গোড়া থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। এই ব্যাপক ক্ষমতার উৎস হিসেবে ‘বালু দরবেশ’ মকসুদ আহমদ বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। বেআইনি বালু উত্তোলনের ফলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধলাই সেতু মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সেতুর পিলার ঘেঁষে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে এই হুমকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

ধলাই সেতু সিলেট বিভাগের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু। ভারতের মেঘালয়ের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ এবং জনপ্রিয় উৎমাছড়া পর্যটন স্পটে যাওয়ার একমাত্র পথ এটি। পাশাপাশি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ভারত সীমান্তঘেঁষা তিনটি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের সড়ক যোগাযোগের মূল ভরসাও এই সেতু।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, শীতকালেও সেতুর পিলার ঘেঁষে বড়কি নৌকা দিয়ে বালি উত্তোলন করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা ম্যানেজ করে অবৈধ খনন চালাচ্ছে। ফলে সেতুর স্থায়িত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

২০০৩ সালে ধলাই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ৪৩৪.৩৫ মিটার দীর্ঘ ও ৯.৫ মিটার প্রস্থের এই সেতু নির্মাণের পর পূর্ব ইসলামপুর ও উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ সরাসরি সড়ক যোগাযোগে আসেন। একইসঙ্গে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে পাথর পরিবহনও সহজ হয়েছে।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট