সিলেটে সেই ছুরি উদ্ধার, যা দিয়ে ‘তিনজনকে খুন করেন’ বাবুল মিয়া

প্রকাশিত: ৩:৫৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২৬

সিলেটে সেই ছুরি উদ্ধার, যা দিয়ে ‘তিনজনকে খুন করেন’ বাবুল মিয়া

সিলেট নগরীর রায়নগর আবাসিক এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর বাসায় স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। আটক আসামি বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রায়নগরের একটি খালি জায়গা থেকে ছুরিটি উদ্ধার করা হয়। এখন ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে ওই রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের মিল খোঁজা হবে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে রায়নগরের ওই বাসার পাশের একটি ঝোপ থেকে এই ছোরা উদ্ধার করা হয়। ওই ছোরায় রক্ত লাগানো ছিল।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়েছেন।

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল মিয়া রায়নগরের একটি খালি জায়গায় ছুরিটি ফেলে দেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় সেখানে খোঁজাখুঁজি করেও ছুরিটি পাওয়া যায়নি।

বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে ওই এলাকায় আবার তল্লাশি চালানো হয়। একপর্যায়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠাব। ছুরিতে থাকা রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে কার রক্ত সেখানে রয়েছে, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণে ধারণা পাওয়া গেছে। বাসার বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছুরি ধাতব অংশেও শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। এছাড়া একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।

উপ পুলিশ কমিশনার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া যে ধরনের ছোরার কথা বলেছিলেন, উদ্ধার করা ছুরিটির সঙ্গে তার মিল রয়েছে। বাবুল মিয়া রংমিস্ত্রির পাশাপাশি কসাইয়ের কাজ করেন। কসাইয়ের কাজে ব্যবহৃত ছুরি সাধারণত শক্ত ও মজবুত হয় বলে জানান তিনি।

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সে আমাদের বলেছিল, ছুরিটি ছয়-সাত ইঞ্চি লম্বা হতে পারে এবং কাঠের হাতল থাকতে পারে। উদ্ধার করা ছোরাটির সঙ্গে তার দেওয়া বর্ণনার যথেষ্ট মিল রয়েছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষা ও অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমের সম্পর্ক নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, রং করার কাজ করতে গিয়ে নিহত গৃহকর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তাদের মধ্যে সম্পর্কটি প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

আটক বাবুল মিয়ার বরাত দিয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা জানান, গৃহকর্মীর কোনো আচরণে বাবুল মিয়া ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি ছুরি নিয়ে ওই বাসায় গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রথমে গৃহকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা করা হয়। তাকে রক্ষা করতে গৃহকর্ত্রী এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। পরে গৃহকর্তা এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর বাসায় প্রবেশের সময় দরজার নিচের ছোট ছিটকানি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। বাবুল মিয়া যে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন, সেখানকার রেলিংয়ে হাতের ছাপ ও পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। নিচেও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

তবে হত্যাকাণ্ডের সময় বাবুল মিয়া ছাড়া অন্য কেউ ওই বাসায় প্রবেশ করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

হত্যাকাণ্ডের পর বাসার কয়েকটি ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেলেও সেগুলো ভাঙা ছিল না বলে জানান মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। সেখান থেকে কোনো মূল্যবান জিনিস নেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজ পাওয়া গেছে। সেটি মূল দলিল নয়, সম্ভবত ফটোকপি বা অনুলিপি। এর সঙ্গে কোনো মামলা বা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, বাবুল মিয়া ওই বাসায় আগে রং করার কাজ করায় ঘরের ভেতরের পরিবেশ ও বিভিন্ন জিনিস সম্পর্কে তার ধারণা ছিল। তিনি দীর্ঘদিন বাসাভাড়া দিতে পারছিলেন না বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বাসাভাড়া পরিশোধ করেছেন কি না এবং ঘটনার পর কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, সেসব বিষয়ও তদন্ত করা হচ্ছে।

মামলার বিষয়ে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহত দম্পতির প্রবাসী সন্তানদের একজন বা একাধিকজন দেশে এসে আইনজীবী ও স্বজনদের মাধ্যমে এজাহার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজাহার পাওয়া গেলে তা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হবে এবং আটক বাবুল মিয়াকে আদালতে হাজির করা হবে।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার পাশাপাশি সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এরপরই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

জানা যায়, বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে মহানগীর রায়নগর এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান- বিয়ানীবাজার উপজেলার আখাখাজনা এলাকার মৃত আবরু মিয়ার ছেলে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।

পুলিশ জানায়, এই ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই ওই দিন বিকাল আনুমানিক ৪টার দিকে অভিযান দিয়ে অভিযুক্ত রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা এবং মৃত নূর মিয়ার (কবিরাজ) ছেলে বাবুল মিয়া (৪০) কে আটক করা হয়। আটকের পর পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা স্বীকার করেন তিনি। তার দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়ার দেখানো স্থান থেকেই এই ছোরা উদ্ধার করে পুলিশ।

বাবুল মিয়া গ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম গণমাধ্যমকে বলেন, গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পূর্ব পরিচিত হওয়ায় বুধবার বাবুল মিয়া ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে গৃহকর্মী তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে তাহমিনার সাথে শারিরীক সম্পর্ক করতে চান। কিন্তু তাহমিনা সেই সম্পর্কে অমত প্রকাশ করলে তার কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল মিয়া ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে। এ সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে তিনজনকে হত্যার পর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে সে রায়নগর এলাকায় নিজের বাসায় ফিরে আসে। পুলিশের গঠিত বিশেষ টিমের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে আটক করে। এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

প্রসঙ্গত, আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়াও মিতালী আবাসিক এলাকায় তাঁর পাশাপাশি তিনতলা দুটি বাসা রয়েছে। তার মধ্যে ১১১ নম্বরের ৩য় তলাবিশিষ্ট নিজস্ব বাসায় বসবাস করতেন। উপরের তলা ও নিচতলায় ভাড়াটিয়ারা থাকতেন এবং তিনি দ্বিতীয় তলায় থাকেন। মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারের সাথে বাসায় বসবাস করতেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা। দুই বিল্ডিংয়ের বাকি ফ্ল্যাটগুলোতে ভাড়াটিয়ারা থাকতেন। আব্দুস সাত্তারের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ও দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট