সিলেটে ২য় দিনে পণ্য পরিবহন ধর্মঘট চলছে

প্রকাশিত: ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১, ২০২২

সিলেটে ২য় দিনে পণ্য পরিবহন ধর্মঘট চলছে

সিলেটের সকল পাথর কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবিতে সিলেট জেলায় ৪৮ ঘণ্টার পণ্যবাহী পরিবহন ধর্মঘট চলছে। সিলেট বিভাগীয় ট্রাক, পিকআপ কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকে জেলার সকল পাথর কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবিতে দুই দিনের এই ধর্মঘট সোমবার (৩১ অক্টোবর) ভোর থেকে শুরু হয়। এই ধর্মঘট বুধবার সকাল ৬টায় শেষ হওয়ার কথা।

মঙ্গলবার (১ নভেম্বর) পণ্যবাহী পরিবহন ধর্মঘটের ২য় দিনে সকাল থেকে জেলার কোনও স্থান থেকে ট্রাক, ট্যাংক লরি, কাভার্ডভ্যান, পিকআপসহ পণ্যবাহী যানবাহন ছেড়ে যায়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ধর্মঘটের ফলে ট্রাক টার্মিনালসহ জেলার বিভিন্নস্থানে আটকা পড়েছে পণ্যবাহী হাজার হাজার ট্রাক।

মঙ্গলবার সকালে নগরীর ট্রাক টার্মিনাল এলাকাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে মিছিল করেছেন শ্রমিকরা। সেসময় তারা তাদের দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।

এতেও কাজ না হলে পুরো বিভাগে অনির্দিষ্টকালের পণ্য পরিবহন ধর্মঘট শুরু হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। ধর্মঘট পালনে সকাল থেকেই মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট এবং রাস্তায় অবস্থান নেন পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।

বিশেষ করে ভোলাগঞ্জ, জাফলং, লোভাছড়া ও বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারি এলাকার পাথর সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিকরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে অবস্থান নেন। এছাড়া ধর্মঘট চলাকালে মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট ও রাস্তায় আলাদা মিছিল-সমাবেশ করেছেন মালিক-শ্রমিক নেতারা।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, পাথর কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় সবকিছু হারিয়ে আজ সিলেটের দশ লক্ষাধিক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা লক্ষাধিক মানুষের কথা বিবেচনা করে পাথর কোয়ারিগুলো খুলে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করেছে।

বিভাগীয় ট্রাক, পিকআপ কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, এতেও কাজ না হলে পুরো বিভাগে অনির্দিষ্টকালের পণ্য পরিবহন ধর্মঘট শুরু হবে।

উল্লেখ্য, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভাগীয় ট্রাক, পিকআপ কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গত ৩০ অক্টোবর রোববার বিকাল ৪টায় বৈঠকে বসেন সিলেট জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান। জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে পরিবহন শ্রমিক নেতাদের প্রতি ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হলেও নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তারা।

এদিকে, পণ্যপরিবহন ধর্মঘটের কারণে সিলেটের পাইকারি ও খুচরা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নগরীর সোবহানীঘাটস্থ সবজির পাইকারি বাজার থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে সবজি যায় খুচরা বাজারে। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে পাইকারি বাজারে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সবজি নিয়ে আসতে পারেনি ট্রাক, পিকআপ প্রভৃতি। পিকেটিং না থাকায় গভীর রাতে হাতেগোনা কয়েকটি ট্রাক এসেছে বাজারে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়ে গেছে।

আলমাছ আলী নামের এক পাইকারি ব্যবসায়ী বলেন, ‘ট্রাক আসতে দিচ্ছে না, বাজারে সরবরাহ কম। দাম তাই বেড়ে গেছে।’

অপরদিকে, সিলেটের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার কালিঘাটেও অন্য দিনের তুলনায় নিরবতা বিরাজ করছে। পণ্য নিয়ে ট্রাক-পিকআপের আনাগোনা নেই, ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততাও কম। ক্রেতার উপস্থিতিও কম দেখা গেছে।

পণ্যপরিবহন ধর্মঘট নিয়ে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা বলছেন, কথায় কথায় ধর্মঘট ডাকা সিলেটে একটি ‘ফ্যাশন’ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা।

নগরীর লালবাজারে আসা কামরুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘সিলেটের পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বেপরোয়া হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কথায় কথায় তারা ধর্মঘট ডাকে। এদের জন্য কী আইন নেই? আইন কী শুধুই সাধারণ মানুষের জন্য?’

পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানান, সিলেটের পাথর দিয়ে সারা দেশে নির্মাণ কাজ চলে। সিলেটের ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি, জাফলং ও লোভাছড়া কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলনে প্রায় ১৫ লাখ ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা জড়িত। কিন্তু গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকরা সংকটে আছেন। অধিকাংশ ট্রাকমালিক ঋণ নিয়ে বা কিস্তি দিয়ে ট্রাক কিনেছেন। কিন্তু পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় ট্রাক মালিকরা পর্যাপ্ত ট্রিপ পাচ্ছেন না, ফলে তারা দেনায় জর্জরিত।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম চলায় সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, পাথর তোলার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর কমিটির সদস্যরা সিলেটের কোয়ারিগুলো পরিদর্শনে আসবেন। তাঁরা সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখবেন পাথর তোলার যৌক্তিকতা আছে কি না। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

জেলা প্রশাসক বলছেন, পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের নেই। বিষয়টি তিনি পরিবহন নেতাদের জানিয়েছেন।

বিভাগীয় ট্রাক পিকআপ কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শাব্বীর আহমদ ফয়েজ বলেন, ‘পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবিতে আমাদের ধর্মঘট চলছে। তবে বুধবার সকাল ৬টার পরিবর্তে আজ দিনগত রাত ১২টায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের সাথে আমাদের আলোচনা হয়েছে। ৩ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের যে প্রতিনিধি দল আসছেন, তাদের সাথে আমাদের দেখা করার সুযোগ করে দেবেন বলে জানিয়েছে প্রশাসন। সেখানে আমরা আমাদের দাবি জানাবো। এ ছাড়া ওই দিন শহিদমিনারে গণঅনশন কর্মসূচিও রাখা হতে পারে।


সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট