সিলেটে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে শিডিউল বিপর্যয়, দূর্ভোগে গ্রাহকরা

প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২২

সিলেটে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে শিডিউল বিপর্যয়, দূর্ভোগে গ্রাহকরা

সিলেটে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সূচি নির্ধারণ করা হলেও বিদ্যুৎ থাকছে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সিলেটে শুরুতেই লোডশেডিংয়ের সিডিউলের এমন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে। আবার অনেক এলাকায় দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুতের দেখা মিলছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার (২০ জুলাই) নগরের বিভিন্ন এলাকায় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত চারবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। নগরের বাইরে লোডশেডিং সূচি বলে কিছু ছিল না। যখন খুশি তখন বিদ্যুৎ গেছে। একাধিকবার লোডশেডিংয়ের কারণে কয়েক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ছিল না। লন্ডভন্ড হয়ে গেছে শিডিউল। ব্যাহত হচ্ছে চা-বাগানসহ কলকারখানায় উৎপাদন ব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা গরমে ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারেনি। করোনার টিকা সংরক্ষণেও বিপত্তি দেখা দিয়েছে।

শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের দিনের অধিকাংশ সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় অর্ধেক সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিংয়ের শিডিউলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সরবরাহ বাড়ানো না হলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টাই লোডশেডিং হতে পারে সিলেটে।

এদিকে সরকারি নির্দেশনার পর সিলেটে বিদ্যুৎ বিভাগে ৩/৪ ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি প্রকাশ করলেও গত দুদিন থেকে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। এ অবস্থা শুধু নগরেই নয়, পুরো সিলেট জেলা জুড়ে। বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেদের তৈরি এই সিডিউল প্রথমদিন থেকেই মানতে পারছে না।

অপরদিকে শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। সিলেট জেলার বিভিন্ন এলাকায় পিক আওয়ারে বিশেষত রাতে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও করছেন গ্রাহকরা। গত সোমবার রাতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে ওসমানীনগর এলাকার পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের চার জেলায় পিডিবির অধীন গ্রাহক আছেন ৪ লাখ ৮৫ হাজার। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক আছেন প্রায় ১৯ লাখ। পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুৎ মিলিয়ে বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা আছে প্রায় সাড়ে ৫০০ মেগাওয়াট।

শিডিউল মানা না হওয়ার কথা স্বীকার করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির বলেন, চাহিদার ৭০ শতাংশ সরবরাহ ধরে সিডিউল করতে বলা হয়েছিলো। সে অনুযায়ী গত মঙ্গলবার এলাকাভেদে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা লোডশেডিং রেখে শিডিউল করা হয়। কিন্তু এখন অর্ধেক সরবরাহ পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই শিডিউল ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ কর্মকর্তা আরো বলেন, বুধবার দুপুরে সিলেট জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিলো মোট ১৩৫ মেগাওয়াট, কিন্তু পাওয়া গেছে ৭৮ মেগাওয়াট। আর সিলেট বিভাগে মোট ২৩০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৩৫ মেগাওয়াট পাওয়া গেছে। এর ফলে ৫০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। একারণে শিডিউলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

নগরীর বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শুধু রাতেই তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না।

নগরের উপশহরের বাসিন্দা সাদি খান বলেন, শহরের চেয়ে গ্রামে আরো বেশি সমস্যা। গ্রামে কারেন্ট গেলেই মনে হয় আর আসার খবর নাই। এতো গরম হচ্ছে তার মধ্যে দিন ও রাতের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং হচ্ছে।

বিয়ানীবাজার পৌরসভার ফতেহপুর এলাকার গ্রাহক আব্দুল হালিম হেলাল বলেন, বিদ্যুতের দুর্ভোগ অসহনীয় পর্যায়ে পৌছে গেছে। দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। কোন সিডিউলই মানা হচ্ছে না।

একই এলাকার গৃহিনী তাসনিমা জান্নাত জানিয়েছেন, আমাদের এখন তিন ধরণের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানি, গরম আর বিদ্যুৎ। গরম তো সবসময় আছেই। আর দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে ঘরে টেকাও দায়।

এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে সিলেটের বিসিক শিল্প নগরীসহ ছোট-বড় কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন কারখানাগুলোতে কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের। শিল্প মালিকরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের দিনের অধিকাংশ সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে ক্রমেই লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রপ্তানি অর্ডার বাতিলের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিয়ানীবাজার পৌরশহরের হাসিনা রাইস মিলের মালিক বলেন, বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ পাচ্ছি না আমরা। আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এমন সমস্যা চলছে। এমনটা চলতে থাকলে বড় ধরনের লোকশানের মুখে পড়তে হবে আমাদের। তাই দ্রুত বিদ্যুৎ লোডশেডিং বন্ধ করতে বিদ্যুৎ বিভাগের দৃষ্টি কামনা করছি।

এ অবস্থায় সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী জালালাবাদকে বলেন, বুধবার দুপুর ১২টায় আমাদের চাহিদা ছিলো ৭৭ মেগাওয়াট। সরবরাহ পেয়েছি ৫৪ মেগাওয়াটের মতো। ফলে অর্ধেকের মতো সরবরাহ পাচ্ছি। এমন হলে তো ১২ ঘন্টা লোডশেডিং করতেই হবে। তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম পাওয়ায় সিডিউলও হেরফের করতে হচ্ছে। সিডিউল মানা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দিনে ৮/৯ ঘন্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রকৌশলী দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী আরো বলেন, যদি লোড একটু বেশি হয়ে যায়, তাহলে গ্রিড লাইন থেকে ফোন করে বলে লোড কমাতে। তাদের কথামতো সাথে সাথে না কমালে আমাদের পুরো সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। ফলে আমরাও অসহায় আসলে। জনগনের দুর্ভোগ হচ্ছে বুঝতে পারছি কিন্তু কিছু করতে পারছি না।

কেবল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাধিন এলাকা নয়, এই চিত্র পুরো সিলেটের। প্রথম দিন থেকেই মানা হচ্ছে না এলাকা ভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সিডিউল। বরং শিডিউলে নির্ধারিত সময়ের চাইতে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন গ্রাহকরা।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট