ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত পারিবারিক বন্ধন

প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৬

Manual3 Ad Code

মাসুদুর রহমান : বাংলাদেশের কোথাও, কোনো ক্ষেত্রেই যেন আর আগের মতো স্বদেশকে খুঁজে পাওয়া যায় না। মা-মাটি ও মানুষের কৃষ্টি-কালচারে সমৃদ্ধ জাতি হয়েও ক্রমান্বয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির ঐতিহ্য। জারী-সারী-মুর্শিদী-ভাটিয়ালী, হাছন-লালন-নজরুল-আলিম-আব্বাস-শিল্পাচার্য জয়নুলের দেশে এখন বিজাতীয় সংস্কৃতির রমরমা প্রসার। আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে হিন্দি সংস্কৃতি। মার্কেট, হোটেল, বাস, ট্রেনে এমনকি রিকশাওয়ালাদের কন্ঠেও আজকাল হিন্দি ছাড়া বাংলা গান শোনা যায় না। ভালোভাবে কথা শেখার আগেই শিশুর কন্ঠে শোনা যাচ্ছে হিন্দি গান, সিনেমা ও সিরিয়ালের ডায়লগ। নিজেদের পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও চলছে ভিনদেশিদের গান। নিজ ঘরে টিভি পর্দায় চলছে অন্য চ্যানেল। ভারতীয় চ্যানেলের প্রবল প্রভাবের ফলে নাটক ও চলচ্চিত্র প্রায় লাটে উঠেছে। এসবের সঙ্গেই ভারতীয় টিভির বাধাহীন আগ্রাসনের মাধ্যমে এখন চলছে ষোলকলা পূর্ণ করার আয়োজন, যাতে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়। যাতে মানুষ একথা পর্যন্ত ভুলে যায় যে, বাংলা ভাষার জন্য এদেশেই এক সময় আন্দোলন হয়েছিল। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের বিষয়টি সমতার ভিত্তিতে না হয়ে চলছে একচেটিয়াভাবে। হিন্দুয়ানী সাংস্কৃতির রমরমা রাজত্ব চলছে এই দেশে। এর প্রভাবে নিজস্ব সংস্কৃতি তো বটেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্ব^র পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর বড়দাপ গ্রামে ‘কিরণমালা’ সিরিয়াল দেখার সময় রান্নাঘরের চুলার আগুন ছড়িয়ে ১৬টি পরিবারের বসতবাড়ি পুড়ে যায়। একই বছরের ২৭ আগস্ট কিরণমালা দেখা নিয়ে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বোড়াবাড়ি এলাকায় চিত্তরঞ্জন সাহার দুই মেয়ের মধ্যে ঝগড়া হয়। পরে বড় বোন সঞ্জিতা সাহা গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। গত ২০ আগস্ট সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাদুড়িয়া গ্রামে মাসহ পরিবারের সবাই যখন টিভির কিরণমালায় মজে ছিলেন, তখন পুকুরপাড়ে খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগের দিন কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার চকহরিপুর গ্রামের এক গৃহবধূ তার দুই শিশুকন্যাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে কয়েকজন দল বেঁধে অনতিদূরের দোকানের টিভিতে ভারতীয় সিরিয়াল কিরণমালা দেখতে যায়। এরই মাঝে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরে পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ১০ বছরের সায়মা জানালা দিয়ে বেরুতে পারলেও আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয় ছোট মেয়ে ৭ বছরের ঋতু। গত ১৮ আগস্ট হবিগঞ্জ জেলার ধলগ্রামে এক দোকানে ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ‘কিরণমালা’ দেখাকে কেন্দ্র করে দু পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় অর্ধশতাধিক আহত হয়। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় কিরণমালা দেখতে গিয়ে বড় বোনের তাড়া খেয়ে মৃত্যু হয় এক কিশোরীর। এর আগে বিগত কয়েকটি ঈদে কিরণমালা সিরিয়ালের পাখি চরিত্রের আদলে তৈরি পোশাক ‘পাখি ড্রেস’কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কয়েক স্থানে ঘটে লঙ্কাকান্ড। এ ড্রেসকে কেন্দ্র করে শুরু হয় পারিবারিক কলহ। আমাদের ঈদের বাজারে পাখি ড্রেস বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। টিভি সিরিয়ালে উদ্বুদ্ধ হওয়া তরুণীরা বাবা-মায়ের কাছে পাখি ড্রেস চায়। অর্থাভাবে বাবা-মা মেয়ের পছন্দের পাখি ড্রেস কিনে দিতে না পারায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। শুধু তাই নয় পাখি, মাসাক্কালি ড্রেস নিয়ে স্বামীর হাতে স্ত্রী এবং স্ত্রীর হাতে স্বামী হত্যার মতো ঘটনা ঘটে। ভারতীয় ওইসব টিভি সিরিয়ালে শিক্ষার কিছু নেই। থাকে পরকীয়া, কূটিলতা, নানামুখী দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বন্ধন ভেঙে ফেলার ছলাকলা, চাতুরি শেখানোর কলাকৌশল। এসব আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। বরং এগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে। : এসব নিয়ে জনপ্রিয় নাট্যকার বৃন্দাবন দাস বলেন, ‘আমাদের মধ্যে বিদেশি প্রীতি মনোভাবটা একটু বেশি। নিজেদের চেয়ে ভিনদেশি সবকিছুর অনেক কদর করতে জানি। দোকানে গেলে বিদেশি পণ্য চাই, টিভি দেখলে দেশীয় চ্যানেল বাদ দিয়ে অন্যদেরটা দেখি, নিজেদের চেয়ে বিদেশি লোকদের কথার গুরুত্ব দেই। এটা আমাদের জাতিগত সমস্যা বলা যেতে পারে। যার জন্য খুব সহজেই ভিনদেশি প্রভাবটা বেশি কাজ করে। ভারতীয় চ্যানেলে যেসব নাটক-সিরিয়াল প্রচার হয় তা আমাদের নাটকের চেয়ে ভালো নয়। বরং তাদের চেয়ে আমাদের নাটকের মান অনেক ভালো। সেখানেও আমাদের নাটকের অনেক দর্শক আছে তারা আমাদের নাটক দেখতে চায় কিন্তু পারে না। আমাদের দেশে ভারতীয় অনেকগুলো চ্যানেল প্রচার হলেও সেখানে আমাদের চ্যানেলগুলো নিষিদ্ধ। সেখানে আমাদের নাটকগুলোর সিডি কিনে দর্শকরা আমাদের নাটকের প্রশংসা করে থাকেন। এদেশে যদি ভারতীয় চ্যানেলের অবাধ প্রচার হয় তবে ভারতেও আমাদের চ্যানেলের প্রচার হওয়া উচিত। কিন্তু হচ্ছে না কেন? তা আমার জানা নেই। হয়তো একশ্রেণির স্বার্থবাদী লোক এর পেছনে কাজ করছে। ভারতে আমাদের চ্যানেল প্রচারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগী হওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে কিছু ভালো অনুষ্ঠানও প্রচার হয়। তবে কিছু এডাকশনও আছে। যার জন্য কিছু কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার খবর শোনা যায়। শুধু চ্যানেল প্রভাব নয়, সার্বিকভাবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। ক্রমেই আমরা অধঃপতনের দিকে যাচ্ছি।’ : নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের বলেন, ‘ভারতীয় টিভি সিরিয়াল নিয়ে নানা উন্মাদনার খবর শুনেছি। আসলে ভিনদেশি নাটকের প্রভাবের জন্য দায়ী আমাদের নির্মাতারা। এই উন্মাদনা রুখতে সমস্যার মূলে যেতে হবে। দর্শক নিরবচ্ছিন্ন বিনোদন চায়। আর আমরা তাদের তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে এই নেতিবাচক অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে দর্শকদের নিরবচ্ছিন্ন বিনোদন দিতে হবে। সমস্যার মূল খুঁজতে হবে প্রথমে।’ : দিলারা জামান জানান, ‘সরকার যদি কিছু নিয়মনীতি নির্ধারিত করে দেন তাহলে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান হবে বলে আমার মনে হয়। যেমন বাইরের চ্যানেল দেখতে হলে নির্দিষ্ট একটা ফি দিতে হবে, এরকম। আমি এটা অনেক আগে থেকেই এ বিষয়ে বলে আসছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার কেন কোনো স্বার্থ ছাড়া ভারতীয় চ্যানেল প্রচার করার অনুমতি দিয়েছেন। তাদের জন্য তো আমাদের ভালো ভালো নাটক দর্শক দেখতে পারছে না। পিক আওয়ারে আমাদের নাটক রেখে দর্শক ভারতীয় চ্যানেল দেখছে। এতে কিন্তু সবারই ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের নাটক তো ওখানে দেখে না। এক সময় আমরা ছিলাম পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় শিল্পী। আমরা আমাদের জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের নাটকের মান তাদের থেকে অনেক উপরে এবং সেটা এখনও। প্রায় ১৫ বছর পর আমি যখন কলকাতায় যাই তারা কষ্ট নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করে, আপনাদের নাটক আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু আমরা দেখতে চাই! সেই কবে এইসব দিন রাত্রি করেছি তারা এখনও তা মনে রেখেছে। আমি বলব বাইরের খারাপ নাটক নিয়ে চিন্তা না করে এখন আমাদের নাটক নিয়ে চিন্তা করতে হবে। খারাপের প্রতি আকর্ষণ মানুষের বরাবরই বেশি, সেটা থাকবে। গেল গেল বলে চিৎকার করলে হবে না। কাজ করতে হবে।

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code