শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-অবরোধে অচল রাজধানী

প্রকাশিত: ৫:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০১৮

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-অবরোধে অচল রাজধানী

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে তিন বাসের পাল্লাপাল্লিতে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় চতুর্থ দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। তারা স্লোগান দিচ্ছে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’ (আমরা ন্যায়বিচার চাই)। ব্যস্ততম শহরে সড়ক বন্ধ করায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তারা পায়ে হেঁটে যে যার গন্তব্যের দিকে রওনা হয়েছেন।

বুধবার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা রাজপথে অবস্থান নেওয়ায় বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে অফিসগামী মানুষকে। স্কুল ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসের চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, রাজধানীর ফার্মগেট, বাংলামোটর, সায়েন্স ল্যাব মোড়, উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকা, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছে। তবে কোথায়ও কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।

ট্রাফিক উত্তর বিভাগের ডিসি প্রবীর কুমার রায় জানান, শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ায় বিমানবন্দর সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১০টার দিকে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা ফার্মগেট এলাকায় এসে অবস্থান নেয়। এতে সড়কের একপাশে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে তারা মিছিল নিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর হয়ে শাহবাগের দিকে চলে যায়। শাহবাগে তারা বিভিন্ন বাসের চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করে দেখে। লাইসেন্স দেখার পর গাড়িগুলো ছেড়ে দিচ্ছে।

তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

তেজগাঁও জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘মঙ্গলবারও তারা রাস্তায় বসেছিল। আমরা দ্রুত তাদের সরিয়ে দিয়েছিলাম। আজও তারা পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাস্তায় এসেছে। আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি, দ্রুত তারা রাস্তা ছেড়ে দিবে।’

যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় এসে অবস্থান নিয়েছে আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে ডা. মাহাবুবুর রহমান মোল্লা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শহীদ জিয়া গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধনিয়া কলেজ ইত্যাদি। তারা সেখানে বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দিচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে জাবালে নূরের ‘ঘাতক’ চালককে গ্রেপ্তার এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবি। একপর্যায়ে তারা ব্যস্ত সড়কে বসে পড়েন।

কদমতলী থানার ওসি আবদুল জলিল জানান, কদমতলী-কুতুবখালী হানিফ ফ্লাইওভারের মুখে ধনিয়া কলেজের ছাত্ররাসহ আরও কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান করছে। পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে বাস ভাঙচুরের প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।

এছাড়া সকাল ৯টা থেকে বিআরটিএর একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে অভিযান শুরু করে। এ রাস্তা দিয়ে আসা পরিবহন, বাস, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি মোটরসাইকেল আটকিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। বিআরটিএ জানিয়েছে, একজন নির্বাহী হাকিমের নেতৃত্বে এখানে অভিযান চালানো হচ্ছে। মূলত দুটি বিষয় দেখা হচ্ছে—এক, গণপরিবহনের ফিটনেস আছে কি না আর চালকদের লাইসেন্স সঠিক কি না। নির্বাহী হাকিম আবদুর রহিম সুজন সকাল সোয়া ১০টা পর্যন্ত প্রায় ৩০টি মামলা করেছেন এবং ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। সেখানে বিআরটিএ চেয়ারম্যানও রয়েছেন।

এরই মধ্যে সেখানে লাইসেন্স না থাকায় তিনজন চালককে এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ অভিযান চলবে বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীর ফার্মগেট, বাংলামোটর, উত্তরার হাউস বিল্ডিং, কদমতলীর হানিফ ফ্লাইওভারের কাছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

ফার্মগেট এলাকায় দেখা গেছে, মতিঝিল-মিরপুর রুটের চিড়িয়াখানা নামক একটি বাসের ড্রাইভার আমিনুর রহমানের কাছে তার নিজস্ব লাইসেন্স না থাকায় যাত্রীদের নামিয়ে বাসটির চাবি কেড়ে নেয় শিক্ষার্থীরা। সে সময় সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থী রবিউল চৌধুরী এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘সরকারের দায়িত্ব ড্রাইভারদের লাইসেন্স নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকার তো করছে না। দায়িত্বটা আমরাই হাতে তুলে নিলাম। বাসটির মালিক না এলে আমরা চাবি দিচ্ছি না।’

পরে আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমার লাইসেন্স আছে, কিন্তু কাছে নেই!’

ফার্মগেটের মোড় থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত লাইসেন্স চেক করে শিক্ষার্থীরা। চেক করতে করতে হাবিবুল ইসলাম বলেন, ফার্মগেট থেকে কমপক্ষে ৫০টি গাড়ির ড্রাইভারদের লাইসেন্স চেক করেছি। কয়েকজনের লাইসেন্স পাইনি। তাঁদের প্রথমে চাবি কেড়ে নিয়েছি। পরে খুব রিকোয়েস্ট করে বলেছে লাইসেন্স করে নেবে। তখন আমরা চাবি দিয়েছি।’

এদিকে ফার্মগেট মোড়ে জুবায়ের হোসেন নামক একজন সিএনজি ড্রাইভারের কাছে লাইসেন্স দেখতে চাইলে তিনি রেগে ওঠেন। সে সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ওই সিএনজির সামনের কাচ ভেঙে দেয়। পরে ড্রাইভার ক্ষমা চেয়ে চলে যান। ওই সময় রাজীব নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা ভালোভাবেই তাঁর কাছে জানতে চেয়েছি, লাইসেন্স আছে কি না। জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ড্রাইভার রেগে ওঠেন। তার কাছে লাইসেন্স নেই বলে এমন আচরণ করেছেন। এর পরে আমরা তার সামনের কাচ ভেঙে দিয়েছি।’

এর আগে সোনারগাঁওয়ের সামনে একটি মন্ত্রীর গাড়ি আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। এসময় নিরাপত্তাকর্মীরা বের হয়ে মন্ত্রীর গাড়ি বললে ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।

মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে যাওয়ার সময় নয়ন নামের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা সোজা মিছিল করতে করতে শাহবাগ যাব। সেখান থেকে সায়েন্স ল্যাব। তার পরে ঢাকা কলেজ যাব। এর পরে ঢাকা কলেজের স্টুডেন্টদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কোথায় যাব।’

খাজাবাবা নামক একটি বাসের ড্রাইভার এনাম হোসেন বলেন, ‘যে কাজ করবে পুলিশ, সেই কাজ করছে পোলাপান। দেইখা মন ভরে গেছে।’

ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশ ইউসুফ আলী বলেন, ‘এরা ছোট ছোট বাচ্চা। কিছু বলারও নেই। তবে সাধারণ যাত্রীদের খুব ভোগান্তি হচ্ছে। তবে ছাত্রদের এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক বলার উপায় নেই। সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হওয়া সময়ের দাবি।’

এদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে চার দিন ধরে স্কুল-কলেজের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে এবার একাত্মতা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা।

শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী মাইকে বলতে থাকেন, ছোট ভাইরা আমাদের মাঝে দাঁড়াও। আমরা তোমাদের চারপাশে দাঁড়াবো। তোমাদের গায়ে গায়ে আঘাত আসার আগে আমাদের গায়ে লাগবে।

ঢাবির শিক্ষার্থীরা মাইকে আরো বলতে থাকেন, আমাদের বিশ্বাস আছে পুলিশের ওপর। তারা আমাদের তাদের সন্তানের মতো আগলে রাখবে।

এসময় লাইসেন্সবিহীন একটি গাড়ি ভাঙচুর করে শিক্ষার্থীরা।

তখন ঢাবির শিক্ষার্থীরা মাইকে ঘোষণা দেন, তোমরা বাস ভাঙচুর করো না- একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এসে আমরা আরেকটা অন্যায় করতে পারি না।

গত রবিবার দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাস প্রতিযোগিতা করে মিরপুর থেকে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে আসছিল। এ সময় ফ্লাইওভারের শেষ দিকে, রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল একদল শিক্ষার্থী। এর মধ্যে একটি বাস ফ্লাইওভার থেকে নেমেই দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া আহত হয় বেশ কয়েকজন।

নিহতরা হলো শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম।

ওই ঘটনার পর থেকেই বিমানবন্দর সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। গতকাল মঙ্গলবার এই বিক্ষোভের জেরে রাজধানীর ঢাকা প্রায় অচল হয়ে যায়।

এর মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিআরটিএ ও বিআরটিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি সভা হয়। সেখান থেকে ঢাকায় গণপরিবহনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।