ছাতকে নীতিমালা লঙ্ঘন করে পাগনা বড়বিলে মাছ আহরণের প্রস্তুতি!

প্রকাশিত: ১২:৪৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২৬

ছাতকে নীতিমালা লঙ্ঘন করে পাগনা বড়বিলে মাছ আহরণের প্রস্তুতি!

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার পাগনা বড়বিল (বন্ধ) জলমহাল নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ইজারার শর্ত এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ইজারার প্রথম বছরেই মাছ আহরণের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইজারাদার সোনারতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় স্থানীয় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। যেকোনো সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কাও করছেন এলাকাবাসী।

জলমহালের মাছ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিধান থাকা সত্ত্বেও জাল, দড়ি ও মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে বিলে মাছ আহরণের প্রস্তুতি চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নেতারা।

তাঁদের দাবি, এভাবে মাছ আহরণ করা হলে জলমহালের মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।

এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে গত ২৯ অক্টোবর সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন।

অভিযোগের অনুলিপি ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এবং ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছেও পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পাগনা বড়বিল জলমহালটি ১৪৩৩ থেকে ১৪৩৫ বাংলা সন পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ইজারা পায় সোনারতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। তবে এ ইজারার বৈধতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলে হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন। যার নম্বর ১১৫৬৩/২০২৬।

অভিযোগকারীর দাবি, রিটের শুনানি শেষে গত ১৫ সেপ্টেম্বর আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করেছেন। ফলে জলমহালটির ইজারা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইনি বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯ এবং ইজারার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মৎস্যসম্পদের বংশবৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ রেখে মাছ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে বলে দাবি করছেন অভিযোগকারীরা। অথচ ইজারার প্রথম বছরেই বিলে মাছ ধরার জন্য জাল, দড়ি ও লোকজন একত্রিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারি নীতিমালা ও ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

প্রকৃত মৎস্যজীবীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, তাঁদের সমিতির সদস্যরা দরিদ্র ও পেশাদার মৎস্যজীবী। তাঁরা বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু জলমহাল ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের স্বার্থ উপেক্ষা করে প্রভাবশালী একটি মহল সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, “ইজারার প্রথম বছরেই যদি অবৈধভাবে মাছ আহরণ করা হয়, তাহলে মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হবে। জলমহালের মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। আমরা চাই, প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করুক এবং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।”

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ‘জাল যার, জলা তার’—প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে নীতি রয়েছে, বাস্তবে পাগনা বড়বিলের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটছে না। রাজনৈতিক প্রভাব ও সমবায় সমিতির সদস্য পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ জলমহালটির ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে আরও নানা অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে।

অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে মিরাশ, লুৎফুর আলীআসকসহ কয়েকজনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে জলমহাল ইজারা ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের এলাকাবাসী একা‌ধিক ব‌্যক্তি সত‌্যতা নি‌শ্চিত ক‌রে‌ছেন।

তারা হ‌লেন দ‌ক্ষিন সাদারাই গ্রা‌মের আব্দুর রউফ, আব্দুল কাইয়ুম, সা‌লিক মিয়া, আছকির আলী, পাগনার পাড় গ্রা‌মের নাছির উদ্দিন, নুরুল আমিন, আলীম খা,ছাতারপই আনছার আলী, ছা‌মির আলী জা‌লিয়া গ্রা‌মের, মিনার মিয়াসহ অর্ধশতা‌ধিক লোকজন।

তারা জানান, নামে তা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি হলেও এর সদস্যদের কেউই মৎস্যজীবী নন। প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন পেশার। সভাপতি দিনমজুর, কৃষক। বাকি সদস্যরা দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিক, আওয়ামলীলী‌গের সি‌লেট মহানগ‌রের নেতা লুৎফুর রহমান,আলী আসকর সহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। মৃত এক ব্যক্তিও সমিতির সদস্য। উপজেলা সমবায় দপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে এই তথ্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাগনা বড়বিলের ইজারা ও মালিকানা-সংশ্লিষ্ট বিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও আইনি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টি সুনামগঞ্জের আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফলে জলমহালটির নিয়ন্ত্রণ, ইজারার বৈধতা এবং মাছ আহরণের অধিকার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই বাড়ছে।

এ বিষয়ে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন পিপিএম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মৎস্য আইন ও নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক বিলের মাছ আহরণের কোনো সুযোগ নেই। আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহি উদ্দিন বলেন, পাগনা বড়বিল নিয়ে বিরোধের বিষয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে তাঁর কার্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। মৎস্য আইন, সরকারি নীতিমালা ও ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, “যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইন লঙ্ঘন করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

এদিকে পাগনা বড়বিল নিয়ে বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে ইজারার বৈধতা, সমবায় সমিতির প্রকৃত সদস্যদের পরিচয়, আদালতের নির্দেশনা এবং মাছ আহরণের প্রস্তুতির বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। সরকারি জলমহাল রক্ষা, মৎস্যসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় পাগনা বড়বিলের বিরোধ আরও জটিল হয়ে বড় ধরনের সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট