১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৫৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৫
সিলেটে বড় থেকে ছোট- সব হাসপাতালেই কমেছে স্বাভাবিক প্রসব, বেড়েছে সিজার। একইসঙ্গে প্রতি বছর বাড়ছে মাতৃগর্ভে শিশু মৃত্যুর হার। প্রসব পরবর্তী নানা জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে গেলেও মায়েদের শেষ রক্ষা হচ্ছে না। পুষ্টির অভাবে এবং জন্মকালীন সতর্কতা না মেনে চলার কারণে দিনদিন মাতৃগর্ভে শিশু মৃত্যু বাড়ছে। কেবল তাই নয়; মৃত সন্তান প্রসবের কারণে অসহায় মায়েদের পড়তে হচ্ছে পারিবারিক-সামাজিক বিড়ম্বনায়।
এরকম ঘটনা বিশেষ করে লক্ষ্য করা যায় গ্রামীণ এলাকায়। দেখা যাচ্ছে, গ্রামে এখনো অনেক সুযোগ সুবিধা পৌঁছাতে পারেনি। দুর্বল রাস্তাঘাট, শিক্ষার অভাব এর জন্য দায়ী। এছাড়া এখনও গ্রামের লোকেরা বেশ কিছু কুসংস্কার বা পুরোনো প্রথা মেনে চলে প্রসবের ক্ষেত্রে, যে কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সিলেটে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সিলেটে গত তিন বছরে দুই হাজারেরও বেশি শিশুর মৃত্যু মাতৃগর্ভেই হয়েছে। এরমধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সিলেটে মাতৃগর্ভে ৭৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৩ সালে ৭৪০ জন ও ২০২২ সালে ৫৭০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সিভিল সার্জন অফিসের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২২ সালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৬৪ জন ও বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে ২০৬ জন শিশুর মাতৃগর্ভে মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালে ওসমানী হাসপাতালে ৫৮৩ জন, খাদিমপাড়া হাসপাতালে ৭ জন ও বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে ১৫০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাতৃগর্ভে ৭৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ওসমানী হাসপাতালে ৫৮৩ জন, খাদিমপাড়া হাসপাতালে ১৫ জন ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরও ১৫০ জন। এর বাইরে সিলেটের বেসরকারি হাসপাতালেও মাতৃগর্ভে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এসব শিশুর মৃত্যুর কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল ছাড়াও বাসা-বাড়িতে অনেক মৃত শিশুর জন্ম হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, মাতৃগর্ভে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ এখনও অজানা। মৃত শিশুর রিপোর্ট তৈরি বা অনুসন্ধান করলেও মৃত্যুর সঠিক কারণ পাওয়া যায় না। আর যেসব কারণ শনাক্ত করা যায় তার বেশিরভাগ অংশই মায়ের সমস্যাজনিত। মায়েদের সমস্যার মধ্যে অসচেতনতা-অপুষ্টি ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণ। এর বাইরে রয়েছে অজ্ঞতা-অশিক্ষা ও কুসংস্কার। এ অবস্থায় মাতৃগর্ভে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতার পাশাপাশি ‘প্রি-কনসেপশন’ ও ‘ডিউরিং প্রেগনেন্সি’ এই দুই বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলছেন চিকিৎসকরা।
সিলেটের গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক রাশিদা আখতার বলেন, ‘মাতৃগর্ভে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশেরই কোনো কারণ শনাক্ত করা যায় না। মৃত শিশুর জন্মের পর রিপোর্ট তৈরি করলে বা ইনভেস্টিগেশন করলে কোনো কারণ পাওয়া যায় না। তবে মায়ের পরীক্ষা নিরীক্ষা করলে অনেকগুলো কারণ পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ‘গর্ভে শিশুর মৃত্যুর জন্য মায়ের যে কারণগুলো পাওয়া যায় তারমধ্যে অন্যতম হলো- মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, গর্ভে ইনফেকশন, অতিরিক্ত জ্বর এবং রক্ত-প্রস্রাবের ইনফেকশন।’
তাছাড়া ডেলিভারির জন্য অপেক্ষা, অনিয়মিত ওষুধ সেবন, ভুল ওষুধ সেবন ও ‘আরলিপ্রেগন্যান্সি’ এসবের কারণেও গর্ভে সন্তান মারা যেতে পারে বলে জানান এই চিকিৎসক।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। মাতৃগর্ভে শিশুর নড়াচড়া না পেয়ে হাসপাতালে অসংখ্য রোগী আসেন। চিকিৎসকরা মাতৃগর্ভে বাচ্চাকে স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু তারপরও অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে যায়। প্রতি মাসেই মাতৃগর্ভে অনেক শিশু মারা যায়।’
এদিকে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যুগেও আশঙ্কাজনক হারে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় বাড়ছে মাতৃগর্ভে শিশু মৃত্যু। সামাজিক কুসংস্কার, অপুষ্টি, অসচেতনতা, অবৈধ শারীরিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন কারণে মায়ের গর্ভেই মারা যাচ্ছে অসংখ্য শিশু। এই উপজেলায় গত তিন বছরে মাতৃগর্ভে ১৫০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জেলার মধ্যে মাতৃগর্ভে শিশু মৃত্যুর হার অনুযায়ী সবার ওপরে রয়েছে বিয়ানীবাজার উপজেলা। আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কানাইঘাট। হাসপাতাল ছাড়াও বাসা-বাড়িতেও এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। উন্নত অবকাঠামো ব্যবস্থা থাকার পরও বিয়ানীবাজার উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে শিশু মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৮৬ জন, ২০২৩ সালে ৩৭ জন এবং ২০২৪ সালে ২৭ জন শিশুর মাতৃগর্ভে মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও বাসা-বাড়িতে গর্ভে সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এসব মৃত্যুর তথ্য সরকারের হিসাবের বাইরে রয়েছে।
সূত্র জানায়, গত তিন বছরে বিয়ানীবাজার উপজেলায় ১৫০ জন শিশুর মাতৃগর্ভে মৃত্যু হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজতর হওয়া সত্ত্বেও বিয়ানীবাজারে এতো মৃত্যুর কারণ জানা নেই কারো।
সংশ্লিষ্টরা মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুললে চিকিৎসকরা বলেন, অন্যান্য উপজেলার মতো বিয়ানীবাজারেও মৃত্যু কমছে। কিন্তু মায়ের অসচেতনতা-পুষ্টিহীনতা ও চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবুল মনসুর আসজাদ বলেন, মায়েদের পুষ্টিহীনতা ও অসচেতনতার কারণে অনেক সময় গর্ভে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এসব শিশু মৃত্যু রোধে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা হয়। কিন্তু মায়েদের মধ্যে সচেতনতা তুলনামূলক ভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না। এখনও অনেক কুসংস্কার সমাজে রয়েছে। যেসব কারণে মাতৃগর্ভে শিশু মৃত্যু হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু মায়েদের অসচেতনতা বা পুষ্টিহীনতা নয়, চিকিৎসকের অভাবেও অনেক মৃত্যু ঘটছে। আমরা চেষ্টা করছি জনবলের সংকট কমাতে। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় মাঠ পর্যায়ে অনেকে সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। এর বাইরে অজানা কারণে অন্তত ২০-৩০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D