১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০১৮
আকরাম হোসেন : আমরা জেনে, না জেনে অনেক ধরনের অপরাধ করে থাকি। পৃথিবীর কেউ না দেখলেও আল্লাহ আমাদের ভালো-মন্দ কাজের সব কিছুই অবগত। দুই দিনের এই দুনিয়াতে আমরা দুনিয়ার লালসায় মহা ব্যস্ত হয়ে আছি। নিজের আধিপত্য বিস্তারে সব ধরনের খারাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছি। কিন্তু পরকালের জন্য কি নিয়ে যাব এই চিন্তা আমাদের মাঝে নেই বললেই চলে।
নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবার প্রতি আমাদের ভালোবাসা অফুরন্ত। কিন্তু ঘরের গৃহকর্মীর প্রতি ভালোবাসা আমাদের ভিতর থেকে আসে না। বর্তমানে এটা যেন এক প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখা যায়, সামাজিক ও নাগরিক জীবনে বাড়ির কাজের লোক যারা শিশু, নারী-পুরুষ আর্থিক অসহায়ত্বের জন্য আমাদের বাসা-বাড়িতে কাজ করেন তাদের প্রতি আমাদের উত্তম আচরণের অভাব রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা তাদের অধিকার বঞ্চিত করি।
বর্তমান এই এক বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার যুগে গৃহকর্মী নারী-শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ করা গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর ক্ষেত্রে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া, শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন, কর্কশ ব্যবহারও করা হয় তাদের সঙ্গে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক কাজের মেয়েদের যৌন হয়রানি করার মর্মান্তিক ঘটনা প্রায়ই পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার হয়ে থাকে।
ইসলাম সব শ্রমিকের সঙ্গে সদাচরণের শিক্ষা দেয়। এ পর্যায়ে গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় ইসলামী আইনের মূলনীতিসমূহ তুলে ধরা হলো: গৃহকর্মীর উপর সাধ্যাতীত কাজের বোঝা চাপিয়ে দিতে ইসলাম নিষেধ করেছে। মানবতার মুক্তিদূত ও বিশ্ববাসীর জন্য রহমত নবী মুহাম্মদ (স.) এ ব্যাপারে বারবার সর্তক করে দিয়েছেন।
ইসলাম বলছে, তোমরা নিজে যা খাবে তাই তাদের খাওয়াবে। যা পরিধান করবে তাই তাদের পরিধান হিসেবে দেবে। তাদের কখনো নীচু বা খাটো করে দেখবে না।
এ ব্যাপারে রসুল (সা.) বলেছেন, তুমি তোমার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, আর যা নিজের জন্য অপছন্দ কর তা অপর ভাইয়ের জন্য অপছন্দ করবে।
আরেক হাদিসে আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণিত নবীজী এরশাদ করেন, তোমাদের গৃহকর্র্মী বা খাদেমরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং কারো অধীনে কারো ভাই থাকলে সে যা খায় তাকে যেন তা খাওয়ায়, সে যা পরিধান করে তাকে যেন তা পরতে দেয় এবং তাদের উপর তোমরা সাধ্যাতীত কাজ চাপিয়ে দিবে না। যদি তোমরা তাদেরকে কোন কাজ দাও তবে তাদেরকে সাহায্য করো।
গৃহকর্মীদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করতেও নিষধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে হজরত আনাস (রা.) বলেন, আমি ১০ বছর পর্যন্ত প্রিয় নবীজি (সা.)-এর গৃহাভ্যন্তরে কাজ করেছি। রসুল (সা.) তার খাদেম হিসেবে আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। যে কোনো পারিবারিক কাজ ছাড়াও যে কোনো গৃহস্থালি কাজকর্মে আমি নিয়োজিত ছিলাম। কিন্তু আশ্চর্য যে, এই দীর্ঘ সময়ে কাজ করতে গিয়ে আমার অনেক ভুল হয়েছে। অনেক নির্দেশ সঠিকভাবে পালন করতে পারিনি। অনেক বিষয় কখনো জটিলও হয়ে গেছে, কিন্তু প্রিয় নবী (সা.) কোনো দিন আমাকে ধমক দেবেন তো দূরের কথা, কখনো বলেননি তুমি কেন এ কাজটি করলে না?
হজরত আনাসের প্রতি রসুল (সা.)-এর এই যে আচরণ তা গৃহকর্মী ও অধীনস্থদের প্রতি ইসলামের নির্দেশনা কী— তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে আমরা নিজেদের অধীনস্থদের প্রতি কত নির্মম আচরণ করছি তা ভাবার বিষয়।
একবার হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) স্বীয় অধীনস্থ গোলামের প্রতি খুবই রাগান্বিত হয়ে গেলেন। বড় ধরনের কোনো অন্যায়ের কারণেই নিশ্চয় তিনি ক্ষুব্ধ হন। ফলে হজরত আবু বকর (রা.) ভৃত্যকে কিছু ভর্ত্সনা করেছিলেন। হঠাৎ পেছন দিক থেকে রসুল (সা.) আসেন এবং হজরত আবু বকর (রা.)-এর কথাগুলো শুনে ফেলেন এবং অসন্তুষ্ট হন। রসুল (সা.) হজরত আবু বকর (রা.)-কে উদ্দেশ করে বললেন, কাবার কসম : তুমি সিদ্দিক হবে অথচ তোমার গোলাম, ভৃত্যকে অভিসম্পাত করবে তা হয় না।
ইসলাম সমাজের সকল স্তরে সম্ভাব্য সকল উপায়ে স্বাধীনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। সেজন্য খাদ্য ও পোশাকের মতো বিষয়ে ও গৃহকর্মীদের কি অধিকার রয়েছে সে প্রসংগে ইসলাম সোচ্চার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ স. বিভিন্ন হাদিসে এ ব্যাপারে উম্মাহকে নির্দেশনা দিয়েছেন। স্ত্রী, সন্তান, গৃহকর্মী ও নিজের খাবারের জন্য ব্যয় করাকে রাসূলুল্লাহ স. সাদাকাহ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যেমন মিকদাম বিন মা দীকারিব রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেন, তুমি যা খাও তা তোমার জন্য সাদাকাহ, তোমার সন্তানকে যা খাওয়াও তা তোমার জন্য সাদাকাহ, যা তোমার স্ত্রীকে খাওয়াও তাও তোমার জন্য সাদাকাহ এবং তোমার গৃহকর্মীকে যা খাওয়াও তাও তোমার জন্য সাদাকাহ।
মানুষ ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। তাকে বা তাদের ক্ষমা করা মহত্বের কাজ। গৃহকর্মীদের ব্যপারে কঠিন হতে ইসলমা না করেছেন। গৃহকর্মী ভুল করলে বা অন্যায় করলে তাদের ক্ষমার ব্যাপারেও বলা হয়েছে।
গৃহকর্মীদের ক্ষমার ব্যাপারে এক হাদিসে বর্ণিত, এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ স. কে জিজ্ঞেস করলেন- ইয়া রাসূলুল্লাহ স. আমরা গৃহকর্মীকে কতবার ক্ষমা করব? রাসূলুল্লাহ স. চুপ থাকলেন। প্রশ্নকারী আবার জিজ্ঞেস করলেন, এবারও আল্লাহর রাসূল স. চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমা করবে।
গৃহকর্মী যারা, তাদেরকে কাজের বেটা-কাজের বেটি, চাকর-চাকরানি, আয়া, বুয়া, ঝি ইত্যাদি যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, তাদের অবস্থা বড়ই সঙ্গিন আমাদের সমাজে। বিত্তবানদের দৈনন্দিন জীবনে বিলাসিতার যাবতীয় বিষয়ের আঞ্জাম দিতে হয় তাদেরই। বাজার করা, খাবার তৈরি, খাবার পরিবেশন, এঁটো থালা-বাসন মাজা, ঘরদোর পরিষ্কার করা, কাপড় কাচা-হেন কাজ নেই যা তাদের করতে হয় না। অথচ তিন বেলা সম্মানজনকভাবে চারটি খাবার তাদের কপালে জোটে না। বেতন বা পারিশ্রমিকের কথা না হয় বাদই দিলাম।
অথচ ইসলাম এসেছে দরিদ্র মানুষের কাঁধে চড়ে আর মহান আল্লাহর নৈকট্য ও জান্নাত লাভের বড় মাধ্যমও ওই দরিদ্র জনগোষ্ঠী। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতে গিয়ে বলেন: হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মিসকিন অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দান করুন এবং মিসকিনদের দলের সঙ্গে আমার হাশর করুন।
তখন হজরত আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল কেন? উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! মিসকিনরা ধনীদের থেকে ৪০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আয়েশা! তুমি কোনো মিসকিনকে আমার দরজা থেকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। অন্তত একটি খেজুরের টুকরা হলেও তাদের দিয়ো। হে আয়েশা! মিসকিনদের ভালোবেসে তাদের নিজের কাছে স্থান দিয়ো। তাহলে আল্লাহ কাল কিয়ামতের দিন তোমাকে নিজের কাছে স্থান দান করবেন। (তীরমিজী-ইবনে মাজাহ)গৃহকর্মীদের অধিকার।
গৃহকর্মীদের জন্মের পর তার মা-বাবা আদর করে যেই নাম রেখেছেন আমরা তাদের সেই নামে ডাকিনা। আমরা আধুনিক হয়ে গেছি! তাই তাদেরকে কাইল্যা, ধইল্যা, বুয়া, বেটি ইত্যাদি ও নামের বিকৃত উচ্চারণে ডাকে থাকি, যা তাদের অধিকারের পরিপন্থী এবং তাদের প্রতি চরম উপহাসের শামিল।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অন্য কোনো পুরুষকে উপহাস না করে। কেননা হতে পারে উপহাসকারী অপেক্ষা সে উত্তম। আর কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীকে উপহাস না করে। কেননা হতে পারে উপহাসকারিণী অপেক্ষা সে উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ কোরো না এবং মন্দ নামে ডেকো না। কেউ ইমান আনার পর কাউকে মন্দ নামে ডাকা গুনাহর কাজ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা করে না, তারাই জালেম। (সুরা আল হুজুরাত : ১১)
সারা মাস কাজ করার পরেও ঠিক মতো পারিশ্রমিক, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার কিছুই পাচ্ছে না গৃহকর্মীরা।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক হাদিসে কুদসিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : কিয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির মানুষের বিবাদী হব। ১. ওই ব্যক্তি, যে আমার নামে প্রতিজ্ঞা করার পর তা ভঙ্গ করে। ২. ওই ব্যক্তি, যে কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করে। ৩. ওই ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার কাছ থেকে কাজ পুরোপুরি আদায় করে নেয়, কিন্তু তার পারিশ্রমিক ঠিকমতো দেয় না। (সহিহ বুখারি)
মানুষের জীবনের প্রয়োজনেই বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার উদ্ভব। দরিদ্র মানুষরা আর্থিক প্রয়োজনে ধনীদের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু ধনীদের জীবনের একটি প্রহরও চলতে পারে না গরিব মানুষের সহযোগিতা ছাড়া। এই যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, এটিই সামাজিক বন্ধন। আর এ বন্ধনটি যদি আন্তরিকতা ও মানবিক বোধের দ্বারা সংরক্ষিত হয়, তাহলেই সামাজিক শান্তি স্থায়ী রূপ পায়।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন নারী ও একজন পুরুষ থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন গোত্র ও শ্রেণিতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিতি অর্জন করতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ-সব কিছুর খবর রাখেন। (সুরা আল-হুজুরাত : ১৩)

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D