কঙ্গোতে স্কুলে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৯

প্রকাশিত: ১২:৪২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬

কঙ্গোতে স্কুলে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৯

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলীয় শহর বুকাভুতে দুটি স্কুল ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী বলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

আগুনে দুই স্কুলের পাশাপাশি প্রায় ৩০০টি কাঠের ঘর পুড়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে বুকাভুর চিম্পুন্ডা এলাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়।

পরে দ্রুত তা পাশের উজামা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফুরাহা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঘনবসতিপূর্ণ ওই এলাকায় অধিকাংশ স্থাপনা কাঠসহ দাহ্য উপকরণে নির্মিত হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর স্কুল থেকে বের হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্কুলের বের হওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হওয়ার চেষ্টা করলে পদদলনের ঘটনা ঘটে।

কেউ কেউ জানালা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে। আবার আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, অনেক শিক্ষার্থীকে গুরুতর শ্বাসকষ্টের অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়।

স্থানীয় কর্মকর্তা প্যাট্রিস বুদুগের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, আগুন থেকে বাঁচতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এতে অনেকে একে অন্যের ওপর পড়ে যান এবং কেউ কেউ জ্ঞান হারান। পদদলনের ঘটনাতেও প্রাণহানি হয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অগ্নিকাণ্ডের পরপরই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বিদ্রোহী গোষ্ঠী এম২৩-এর মুখপাত্র লরেন্স কানিউকা প্রথমদিকে ২৪ শিক্ষার্থী নিহত এবং ২৯ জন চিকিৎসাধীন থাকার কথা জানান। পরে দক্ষিণ কিভু প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ নিহতের সংখ্যা ২৬ বলে জানায়। সর্বশেষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা অন্তত ২৯-এ পৌঁছেছে।

প্রাথমিকভাবে নিহতদের মধ্যে ১৯ জন মেয়ে ও পাঁচজন ছেলে শিক্ষার্থী থাকার কথা জানানো হয়েছিল। পরে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের হিসাবে ছেলেদের সংখ্যা সাত বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা ও পরিচয় নিয়ে এখনো তথ্য হালনাগাদ হচ্ছে।

এদিকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিপুলসংখ্যক আহতকে নেওয়া হয়েছে। এম২৩-এর মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৯ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং তাদের মধ্যে ২১ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। স্থানীয় এক নার্স জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী ও কয়েকজন শিক্ষককে গুরুতর শ্বাসকষ্টের অবস্থায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা হয়েছিল।

আগুন শুধু স্কুল দুটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাশের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাতেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ কিভু প্রদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০টি কাঠের ঘর আগুনে পুড়ে যায়।

ঘটনাস্থলের বর্ণনায় ধ্বংসস্তূপ, পুড়ে যাওয়া ঘর এবং টিনের বিকৃত কাঠামোর কথা উঠে এসেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং কী কারণে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল-তা জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, আগুনের সূত্রপাত একটি বাড়ি থেকে হয়ে থাকতে পারে। তবে আগুনের সুনির্দিষ্ট উৎস বা প্রাথমিক কারণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বুকাভু দক্ষিণ কিভু প্রদেশের রাজধানী এবং দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব কঙ্গোর সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুয়ান্ডার সমর্থনপুষ্ট বলে অভিযোগ থাকা এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠী শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে ওই অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির একটি প্রশাসন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

খনিজসম্পদসমৃদ্ধ পূর্ব কঙ্গোতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত চলছে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। বুকাভুতে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ড সেই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আরও কেউ আটকে আছে কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে এম২৩ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে হতাহতের সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত নয়। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের অবস্থা পর্যালোচনার পর মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আশঙ্কা করছেন।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন পূর্ব কঙ্গো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে মানবিক সংকটে রয়েছে। স্কুলে আগুনে এত শিক্ষার্থীর প্রাণহানি সেই সংকটের ভয়াবহতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট