কানাইঘাটে নিজ মাদ্রাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত সাবেক এমপি ফরিদ চৌধুরী

প্রকাশিত: ৯:১৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২৬

কানাইঘাটে নিজ মাদ্রাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত সাবেক এমপি ফরিদ চৌধুরী

সিলেটের অন্যতম বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

শনিবার বাদ আসর (১৩ জুন) কানাইঘাট উপজেলার তালবাড়িতে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত জামেয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসা তালবাড়ীর মাঠে জানাজার নামাজ শেষে মাদ্রাসা প্রাঙ্গনেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপিসহ কেন্দ্রীয় জামায়াত, বিএনপি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণীপেশার হাজার হাজার মানুষ জানাজার নামাজে অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন মরহুমের ছেলে মাওলানা নাজমুস সাকিব।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ও জানাজা পুর্ব সংক্ষিপ্ত আলোচনা রাখেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সিলেট-৫ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুফতী মাওলানা মোহাম্মদ আবুল হাসান এমপি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহছানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর ফখরুল ইসলাম, সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা আমীর ইঞ্জিনিয়ার শাহেদ আলী, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েছ লোদী, সেক্রেটারী এমদাদ হোসেন চৌধুরী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট জেলা সভাপতি মাওলানা ইকবাল আহমদ, সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর হাফিজ মাওলানা মিফতাহুদ্দীন ও ড. নুরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমীর হাফিজ আনওয়ার হোসেন খান ও অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, মহানগর সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী, জেলা সেক্রেটারী ও জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, হবিগঞ্জ জেলা সেক্রেটারী কাজী মহসিন, মৌলভীবাজার জেলা সেক্রেটারী ইয়ামির আলী, সুনামগঞ্জ জেলা নায়েবে আমীর মুমতাজুল হাসান আবেদ, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ আল হোসাইন ও শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার প্রমূখ।

প্রসঙ্গত- এর আগে শুক্রবার (১২ জুন) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে সিলেট নগরীর সোবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তিনি স্ত্রী, ১ পুত্র, ৪ কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

পারিবারিক ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার, কিডনি, বার্ধক্যজনিত রোগসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। গত মে মাসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত দুইদিন ধরে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। শুক্রবার দিবাগত রাতে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের তালবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল ও সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রজীবনে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ইসলামী ছাত্রসংঘের সিলেট জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিলেট জেলার আমীর, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসন থেকে চার দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট সহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি সিলেট নগরীতে বেশ কয়েকটি শিক্ষা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নেপথ্যে ছিলেন। আশির দশকে তাঁর নেতৃত্বেই সিলেটে প্রথম জামেয়া ইসলামিয়া মিরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দি সিলেট ইসলামিক সোসাইটি, পাঠানটুলা জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা ও আল-আমিন জামেয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু নগরীতেই নয়, নিজ গ্রাম তালবাড়িতেও তিনি পৈতৃক সম্পত্তিতে ফাজিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে কাজ করে গেছেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকে তিনি ‘আনজুমানে খেদমতে কুরআন’ নামক সংস্থা গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এছাড়া তিনি নগরীর আল-হামরা শপিং সিটির অন্যতম উদ্যোক্তা ও ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

একজন সজ্জন ও সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ওলামা সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর এই চিরবিদায় সিলেট অঞ্চলের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশিষ্ট এই আলেমের মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। সিলেটবাসী একজন নির্লোভ ও সাদা মনের মানুষ হারানোর গভীর শূন্যতা অনুভব করছেন।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট