পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল সিলেট

প্রকাশিত: ৯:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২০

পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল সিলেট

মঈনুল হক বুলবুল : বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান উদ্দিন আহমদের (৩৩) হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে সিলেট। তিন দিন ধরে নগরী থেকে শুরু করে জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি উঠেছে।

লাগাতার ফাঁড়ি ঘেরাও, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, প্রতিবাদী গান ও অবস্থান কর্মসূচি থেকে দায়ীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করানোর দাবি করছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ধারাবাহিক এই আন্দোলনের ঢেউ গিয়ে লেগেছে ‘সিলেটি’ অধ্যুষিত লন্ডনেও। বিচারের দাবিতে সেখানেও মানববন্ধন করেছে প্রবাসী বাঙালিরা।

আন্দোলনকারীরা বলছে, রায়হান হত্যার বিচারের দাবিতে তিন দিনে শুধু সিলেট নগরীতে ৩০টির বেশি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে অন্তত তিনবার বন্দর বাজার ফাঁড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনতা। তারা এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে এবং বিচারের দাবি তুলেছে। এই হত্যাকাণ্ডকে দুঃশাসনের জ্বলন্ত প্রমাণ বলে আখ্যায়িত করেছে আন্দোলনের নেতারা।

বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘সিলেট নিকট অতীতেও এমন ছিল না। গত কয়েক বছরে পুলিশ প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা প্রকাশ্যে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। এর চূড়ান্ত ফল হচ্ছে রায়হান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।’ এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানান নাগরিক সমাজের এই নেতা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী রায়হান হত্যাকাণ্ডকে ‘পুলিশি বর্বরতার চরম চিত্র’ বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এই মর্মান্তিক ও জঘন্য ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেটের সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত বলেন, ‘এমন একটি হত্যাকাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমরা কতটা অনিরাপদ। দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। কিন্তু এই ঘটনা মনে প্রশ্ন তুলে দেয়, আসলেই আমরা কতটা নিরাপদ? রাষ্ট্রকে অবশ্যই এর বিচার করে প্রমাণ করতে হবে যে, নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র আন্তরিক।



এদিকে ‘বাঙালি অধ্যুষিত’ যুক্তরাজ্যের লন্ডনেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হয়েছে। ‘ভয়েস অব জাস্টিজ, ইউকে’- এর সাধারণ সম্পাদক কে এম আবু তাহের চৌধুরী আজ বুধবার বিকেলে বলেন, ‘আজ থেকে লন্ডনেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা রায়হান হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমুলক বিচারের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেছে।’

প্রথমদিন লন্ডন সিটির আফতাব আলী পার্কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা বলেন, দেশে প্রতিদিন নৈরাজ্য বাড়ছে। এটা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করবে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

এদিকে পুলিশের নির্যাতনে খুন হওয়া রায়হানের বাড়িতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাফিউল আলম চৌধুরী নাদেল।

সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান উদ্দিন আহমদকে (৩৩) গত শনিবার রাতে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে। পরদিন রোববার সকালে তাঁর লাশ পায় পরিবার। পরে ওই দিন রাতে নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। এরই মধ্যে মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বজনদের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকা না পেয়ে রায়হানকে পুলিশি হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর পুলিশ দাবি করেছে, নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন রায়হান। তবে স্থানীয় কাউন্সিলর বলছেন, যে এলাকায় গণপিটুনির কথা বলা হচ্ছে সেখানকার সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজে এ ধরনের কোনোকিছু দেখা যায়নি।



এ ঘটনার পর গতকাল সোমবার ওই ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ছাড়া প্রত্যাহার করা হয়- সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেনকে।

থানাতেই রায়হানের মৃত্যু : তদন্ত কমিটি

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কোতোয়ালি থানাধীন বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তিন ঘণ্টা ১০ মিনিট ৪০ সেকেন্ড অবস্থানকালেই পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যু হয় রায়হান উদ্দিন আহমদের। এসএমপি গঠিত তদন্ত কমিটির প্রথম দিনের তদন্তে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান উপকমিশনার (ডিসি) আজবাহার আলী শেখ।

শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৩৮ মিনিটে নগরীর কাষ্টঘর এলাকা থেকে রায়হানকে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা আটক করেন বলে জানান এসএমপির উপকমিশনার আজবাহার আলী শেখ। তিনি জানান, ওই এলাকারও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ মিলেছে। সেখানে রায়হানকে গণপিটুনি দেওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সিসিটিভির ফুটেজ, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষী এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটা প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে, বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে জখম হয়েছেন রায়হান। পরে তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।



মামলা পিবিআইয়ে

রায়হান উদ্দিন আহমদের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলে এসএমপির মুখপাত্র জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, ‘সকালে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রায়হান আহমদ হত্যা মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

পলাতক এসআই আকবর

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কোতোয়ালি থানাধীন বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির প্রধান উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভুঁইয়া হঠাৎ করেই পুলিশের নজরদারির বাইরে চলে গেছেন। তাঁর কোনো খোঁজ পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসআই আকবর যাতে পালিয়ে ভারতে চলে যেতে না পারেন- এজন্য সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী সব থানা এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, গত সোমবার রাত ১১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত এসআই আকবর পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন। তখন তিনি নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এর পর থেকে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাকটিভ দেখাচ্ছে। তার অবস্থান চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। নিয়ম অনুসারে যাদের বরখাস্ত বা প্রত্যাহার করা হয় তাদের প্রতিদিনি পুলিশ লাইনে এসে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকের কাছে হাজিরা দিতে হয়। সেখানে তাদের হাজিরা নেওয়া হয়। কিন্তু আজকে এসআই আকবর সেখানে হাজিরা দিতে আসেননি।


  •