২৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০২২
সন্তানের শিক্ষার কথা তুলতেই হবিগঞ্জে সুরমা চা বাগানের শ্রমিক স্বপ্না সাঁওতাল কাঁদতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘সকালে মেয়েটা কলমের টাকা চাইছে। ২০ দিন ধইরা কাজে যাই না। টাকা কই পাইতাম? দুইটা থাপ্পড় দিয়া কাজে চইলা আইছি। এখন কষ্টে বুকটা ফাইটা যাইতেছে। মা হয়ে একটা কলম না দিয়ে থাপ্পড় মারছি।’
চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানদের পড়াশোনার চিত্রই যেন ফুটে উঠল স্বপ্নার বক্তব্যে। এই জীবন তাকে কোনো স্বপ্ন দেখায় না, কেবলই কাঁদায়।
চা বাগানের শ্রমিকরা মজুরির বাইরে বাড়তি সুবিধার নামে মালিকপক্ষ যা বলে থাকে, তার মধ্যে পোষ্যদের শিক্ষার পেছনে যে ব্যয় দেখানো হয়, তা একেবারেই অপ্রতুল। ফলে শিক্ষার পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক।
দিনে একেকজন শিশুর পেছনে শিক্ষা ব্যয় ধরা হয়েছে দেড় টাকা, এই হিসাবে মাসে ৪৫ টাকা, যা মূলত দুটি খাতা কিনতেই খরচ হয়ে যাওয়ার কথা।
চা শ্রমিকরা দিনে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে টানা ১৯ দিন আন্দোলন করে ১৭০ টাকা মজুরি অর্জন করেছে।
যখন তারা ১২০ টাকা মজুরি পেত, তখন মালিকপক্ষ দাবি করে আসছিল, রেশন, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নানা খাতে খরচ মিলিয়ে ৪০১ টাকা ব্যয় করা হয় একেকজন শ্রমিকের পেছনে।
এখন দাবি করা হচ্ছে মজুরি ৫০ টাকা বাড়ায় শ্রমিকের পেছনে ব্যয় বেড়ে হবে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
আইন অনুযায়ী এসব সুবিধা কখনও মজুরির অংশ হতে পারে না। আবার খোঁজ নিয়ে দেখেছে, আবাসন বলতে যে ঘর দেয়া হয়, তাতে মাসে ২৩০০ টাকা মজুরি দেখানো হলেও তাতে নেই আবাসনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। এসব ঘরের ভাড়া সাত থেকে আট শ টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই।
রেশন বলতে যে সুবিধার কথা বলা হয়, তাও পর্যাপ্ত নয়। কেবল চাল বা আটা দেয়া হয়। কোনো কোনো বাগানে টানা ৫ বছর আটা দেয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আবার যাদেরকে ধানের জমি ইজারা দেয়া হয়, তাদের রেশন দেয়া হয় না। অনিয়মিত শ্রমিকরাও এই রেশন পায় না।
মাসে ২৩০০ টাকা মজুরি দেখিয়ে এই ধরনের ঘর দেয়া হয় চা শ্রমিকদের। ছবি দুটি সিলেটের সরকারি বাগান লাক্কাতুরা থেকে তোলা
এবার শিক্ষার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দৈনিক দেড় টাকা বরাদ্দের কথা। সেটিও আবার সরাসরি দেয়া হয় না।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী চা বাগানে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেই বাগান কর্তৃপক্ষকে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যে বাগানগুলোতে সরকারি স্কুল নেই, সেই বাগানের কর্তৃপক্ষ একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান করে দিলেও সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
সরকারি বইগুলো শিক্ষার্থীরা বিনা পয়সায় পেলেও দেয়া হয় না উপবৃত্তি, পোশাক বা খাতা। ব্যবস্থা নেই দুপুরের টিফিনেরও।
অধিকাংশ স্কুলেই প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করেন একজনমাত্র শিক্ষক।
শ্রমিকদের দাবি, লেখাপড়া করানোর ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক সংকট আর প্রতিবন্ধকতার কারণে লেখাপড়া করাতে পারছেন না। বেশির ভাগই প্রাথমিকেই ঝরে পড়ে। অর্ধেক মাধ্যমিক পর্যন্ত যায়। সেখানেও ঝরে পড়ে অর্ধেকের বেশি।
আরও পড়ুন: এই ঘর দিয়ে মাসে দেখানো হয় ২৩০০ টাকা মজুরি!
বেগমপাড়া বাগানের শ্রমিক মণি সাধু বলেন, ‘আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাবারই দিতে পারি না, লেখাপড়া কীভাবে করাব? বাগান থেকে একটা বই, খাতা কলম দেয়া হয় না। এত কম মজুরিতে কীভাবে লেখাপড়া করাব? ছেলেরা এখানে সেখানে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালায়। কিন্তু মেয়েরা কীভাবে রুজি করবে? তাই তারা হাইস্কুলে যায় না।’
সুরমা বাগানের অর্চনা বাউড়ি বলেন, ‘হাইস্কুলে গেলে অনেক টাকা লাগে। স্কুলের ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, বই-খাতা কিনতে অনেক সময় আমাদের সন্তানদের টাকা দিতে পারি না। তাহলে তারা কীভাবে লেখাপড়া করবে। আমাদেরও তো ইচ্ছে করে সন্তানদের লেখাপাড়া করাইতে। কিন্তু টাকার অভাবে পারি না। যাদের টাকা আছে, তারা শুধু লেখাপাড়া করাইতে পারে।’
‘মালিকদের উদ্যোগ লোক দেখানো’
চা বাগানের শিশুদের শিক্ষা সহায়তা প্রদানে কাজ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন- একডো।
বাগানের শিক্ষার চিত্র প্রসঙ্গে সংস্থাটি নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, ‘চা বাগানের শিক্ষা কার্যক্রম মূলত লোক দেখানো। মালিকপক্ষ চুক্তি আর শ্রম আইনের শর্ত পূরণের জন্য নামমাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু রাখে। সেখানকার স্কুলগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।
‘বেশির ভাগ স্কুলই এক কক্ষের। একটি কক্ষেই প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে ক্লাস নেয়া হয়। তাও একজনমাত্র শিক্ষক দিয়ে। শিক্ষকের জন্যও আলাদা কোনো কক্ষ নেই এসব বিদ্যালয়ে।’
তিনি বলেন, ‘এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতনও থাকে সামান্য। তাই ভালো মানের কোনো শিক্ষক বাগানের স্কুলে কাজ করেন না। ফলে সেখানকার শিক্ষার মানও খুব খারাপ। বাগানের স্কুল থেকে পাস করে আসা শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাইরের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায়ই টিকতে পারে না।’
চা শ্রমিকদের নিয়ে পিএইচডি করা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আশ্রাফুল করিম বলেন, ‘শিক্ষা নিয়ে মালিকদের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। স্কুলের নামে একটি ছাপড়া ঘর আর একজন শিক্ষক ছাড়া আর কিছুই নেই বেশির ভাগ বাগানে। শহর আর মহাসড়কের পাশের বাগানগুলো ছাড়া বাকিগুলোতে সরকারি বিদ্যালয়ও নেই।’
তিনি বলেন, ‘চা বাগান মালিকরাই তাদের হিসাবে দেখিয়েছেন, শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য দিনে ১.৫০ টাকা ব্যয় করেন তারা। এই যুগে দেড় টাকা দিয়ে কী শিক্ষা মিলবে?’
দায় সরকারেরও
লক্ষ্মীকান্ত এই অবস্থার জন্য সরকারকেও দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করলেও ১৬৭ চা বাগানের মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ১৭ টিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। বাকি বাগানগুলোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।’
সরকার পরিচালিত সিলেটের লাক্কাতুরা বাগানে একটি এনজিও পরিচালিত স্কুলে শিক্ষকতা করেন জেনি পাল। তিনি জানান, পড়ালেখার ব্যাপারে শিশুদের আগ্রহ রয়েছে। তবে বাবা-মায়েরা শিক্ষার খরচ বহন করতে পারে না। ফলে পঞ্চম শ্রেণির পরেই ঝরে পরে বেশির ভাগ শিশু।
তিনি বলেন, ‘বাগানের প্রাথমিকের পর আর পড়ার সুযোগ নেই। বাইরের বিদ্যালয়গুলোতে পড়ার মতো টাকা তাদের নেই। তাই পঞ্চম শ্রেণির পর বেশির ভাগ শিশুই আর স্কুলে যায় না।’
পাঁচ বছর ধরে চা বাগানের শিশুদের নিয়ে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঊষা। এই সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক নিগার সাদিয়া জানান, ‘অপুষ্টির কারণে চা বাগানের শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতিশক্তি অনেক কম। তারা কিছু মনে রাখতেও পারে না। এখানকার কোনো শিশুই তিন বেলা ভালো খেতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘বাবা-মা কাজে থাকায় দুপুরে চা শ্রমিকদের ঘরে রান্নাবান্না হয় না। ফলে চা বাগানের প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য মিড ডে মিল চালু করা প্রয়োজন। অথচ মিড ডে মিল দূরে থাকা শিক্ষা উপকরণগুলোই পায় না তারা।’
বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের চম্পা নাইডু বলেন, ‘বাগানে শিক্ষা বলতে একটি ভাঙা স্কুলঘর। এক বা দুইজন শিক্ষক। যারা আবার যোগত্যসম্পন্ন নন। এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর শিক্ষার আর কোনো সুযোগ নেই। অনেক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নেই।’
কালাগুল চা বাগানের শ্রমিক রতন কৈরির ছেলে ওই বাগানের বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। রতন বলেন, ‘ছেলেটার পড়ালেখায় আগ্রহ আছে। আমিও তারে পড়াতে চাই। কিন্তু স্কুল থেকে তো বইখাতা কিছু দেয় না। এগুলো আমি কিনে দিতে পারি না। আর পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর তো নতুন স্কুলে ভর্তি ফি ও বেতন দিতে হবে। এগুলো কোথায় পাব?’
বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা প্রসঙ্গে সিলেট বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের শিক্ষা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য নিজস্ব জমি থাকা আবশ্যিক। কিন্তু বাগানের জমি তো ইজারা নেয়া। তাই বাগানগুলোতে সরকারি বিদ্যালয় করা যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চা বাগানের জন্য এই শর্ত শিথিল করা হয়েছে। ফলে বাগানের অনেক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। আরও কিছু করার প্রক্রিয়ায় আছে।’
তিনি দাবি করেন, বাগানের ভেতরে সরকারি বিদ্যালয় না থাকলেও বাগানের আশপাশ এলাকায় দুই শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
তবু বদলাচ্ছে দিন
তবে ইদানীং কষ্ট করে হলেও সন্তানদের পড়ানোর দিকে ঝোঁক কিছুটা বেড়েছে। যে কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধার-দেনা করেও পাঠানো হচ্ছে সন্তানদের। তবে সেখানেও নানা বাধা।
হবিগঞ্জের বেগমখান বাগানের পরেশ বাগতি বলেন, ‘আমাদের বাগানের অনেক ছেলে কলেজে পড়ে। প্রতি বছর বাগান থেকে ১৮ থেকে ২০ জন ছেলে এসএসসি পাস করছে। কিন্তু কলেজ পর্যায়ে পড়তে গিয়ে অনেকেই ঝরে পড়ে। মেয়েরা কলেজ পর্যায়ে নেই বললেই চলে।’
কেউ কেউ অবশ্য কলেজ পেরিয়ে আরও দূরে যাচ্ছে, যাদের হাত ধরেই দিন বদলের স্বপ্ন দেখছে শ্রমিকরা।
একই জেলার চাঁন্দপুর বাগান, বেগমখান, চন্ডিছড়া ও লস্করপুর চা বাগানের শিক্ষার্থীরা ৬ কিলোমিটার দূরে চুনারুঘাট কলেজ, দেওয়ন্দি বাগানের শিক্ষার্থীরা ৮ কিলোমিটার দূরের শায়েস্তাগঞ্জ কলেজ, আমু ও নালুয়া বাগানের শিক্ষার্থীরা ৭ কিলোমিটার দূরের আমরোড কলেজ এবং সুরমা, জগদীলপুর, নোয়াপড়া, তেলিয়াপাড়া বাগানের শিক্ষার্থীদের অন্তত ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের মাধবপুর কলেজে গিয়ে পড়তে হয়।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ। তবে এর সিংহভাগই ছেলে। আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করছে ২০ শতাংশ।
‘শ্রমিকরা এখন আগের চেয়ে সচেতন। তারা না খেয়ে হলেও সন্তানদের লেখাপড়া করাতে চান। যে কারণে শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। এমনকি বিভিন্ন ভার্সিটিতে অন্তত ২০০ চা শ্রমিক সন্তান লেখাপড়া করছেন। আমি তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ছাত্র-যুব সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বীরেন ভৌমিক বলেন, ‘বাগান থেকে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কিছু দেয়া হয় না। তাও সেই বিদ্যালয়গুলোতে একজনের বেশি শিক্ষক নেই। আধুনিক যুগে এসেও কি আমাদের সন্তানরা কেবল নাম-দস্তখতই শিখবে?
‘আমরা শিক্ষিত যুবকরা চা বাগানে শিক্ষার হার বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি মেয়েদেরকেও যেন কাজে না দিয়ে লেখাপড়া করানো হয় সে জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করে যাচ্ছি।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D