দেশের এই দূরাবস্থায় এসি রুমে রাজনীতি

প্রকাশিত: ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২২

দেশের এই দূরাবস্থায় এসি রুমে রাজনীতি

 অলিউল্লাহ নোমান


প্রতিবেদকঃ মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যে ভাল নেই সেটা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। টাকার এমন অবমূল্যায়ন নিকট অতীতে কখনো আর হয়নি। প্রতি ডলারের মূল্য ১১২ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি পাউন্ড ১২৫ টাকা। জ্বালানী মজুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। টান পড়েছে সেন্ট্রাল রিজার্ভে। এতে জ্বালানী তেল আমদানি করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানীর উপর চাপ কমানোর পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। তরল জ্বালানী দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বাড়ছে। শুরু হয়েছে ব্যাপক লোডশেডিং। যদিও সরকারের মন্ত্রিরা লোডশেডিং জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে বলে দম্ভোক্তি করেছিলেন। এখন লোডশেডিংয়ে মানুষের জীবনে নাভিশ্বস উঠছে। আরো ভয়নক খবর হচ্ছে, ইতোমধ্যে কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট দেয়ার জন্য সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় কাগজ আমদানি করতে না পারায় স্কুল-কলেজের পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাহলে বাংলাদেশও কি সেই পথে আগাচ্ছে। কারণ, কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট দেওয়ার নির্দেশনা বলে দিচ্ছে লক্ষণ বেশি ভাল নয়।

এরমধ্যেই গত ২৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ইন্ডিয়াপন্থি দালাল মিডিয়া হিসাবে পরিচিত ডেইলি স্টার জ্বালানী নিয়ে একটি নিউজ আপলোড করেছিল। এতে বলা হয়েছিল পেট্রোল ১৩ দিন এবং অকটেন ৯ দিন চলার মত মজুদ রয়েছে। ঘন্টাখানেক পরই নিউজটি প্রত্যাহার করে নেয় ডেইলি স্টার। পরবর্তীতে রাত ১১টা ২০ মিনিটে আবার আপলোড করে ভিন্ন ভাষা ও তথ্য দিয়ে। এতে মানুষ যা বুঝার বোঝে গেছে। শ্রীলঙ্কার মতই যে অর্থনীতি পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেটা এখন পরিস্কার।

দেশের এই পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদি সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা স্বভাবসুলভ চালাকির আশ্রয় নিয়েছেন। নরম স্বরে কথা বলেছেন। তাঁর কার্যালয় ঘেরাও করলেও বিএনপিকে বাঁধা দেবে না বলে উল্লেখ করেছেন। বরং চা-এর দাওয়াত দিয়েছেন বিএনপি নেতাদের। এই দাওয়াত নিয়ে আমার দেশ-এর সম্পাদক মহোদয় সম্পাদকীয়তে বিস্তারিত লিখেছেন। সুতরাং সেই দিকে আমি যাব না।

পাঠকদের একটু ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের কিছু ঘটনায়। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি নেতারা দুই দফা চা-নাস্তা খেয়েছেন গণভবনে। নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেন চিঠি দিয়ে সংলাপের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। চিঠিতে ব্যক্ত করা আগ্রহে সারা দিয়ে শেখ হাসিনা দ্রুত সংলাপের আয়োজন করেন। প্রথম দফা সংলাপে বিএনপি নেতারা তাদের মামলা মোকদ্দমার বিষয়টি উঠিয়েছিলেন। এতে শেখ হাসিনা অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বলেছিলেন, আপনাদের মামলার সব তথ্য ও তালিক দেন, এগুলো দেখব। আর যায় কই! বিএনপি নেতারা মনে করেছিলেন শেখ হাসিনা অত্যন্ত সদয় হয়েছেন। তারা ভেবেছিরেন মামলা থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। যদিও দলটির নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন একটি বানোয়াট মামলায় ফরমায়েশি রায়ে নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যাক্ত কারাগারে ছিলেন। কেউ কিন্তু বলেননি, আমাদের নেত্রীকে মামলা থেকে রেহাই দিয়ে আগে আন্তরিকতার প্রমাণ করুন। রায়টা বাতিলের ব্যবস্থা আগে করুন। এছাড়া আরো হাজার হাজার কর্মী ও তৃণমূল নেতা তখন বানোয়াট মামলায় কারাগারে ছিল। তাদের কথা তারা ভেবেছিলেন কি না আমার জানা নেই।

তবে, সংলাপ থেকে ফিরেই বিএনপি নেতারা নিজের মামলার বিস্তারিত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে সবাই একযোগে চাপ দেন মামলার নথি ফটোকপি করে দেয়ার জন্য। নেতাদের প্রচণ্ড চাপে রাতদিন খেটে ওই আইনজীবী মামলার নথি ফটোকপি করে দিয়েছেন। নেতারা মামলার বিস্তারিত হাতে পাওয়ার পর শেখ হাসিনার সাথে আবারো সংলাপের আগ্রহ প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় দফা সংলাপের আগ্রহেও শেখ হাসিনা সদয় হয়ে রাজি হন। সবাই মামলার নথি নিয়ে দ্বিতীয়বার গণভবনে হাজির হন। শেখ হাসিনা হাসিমুখে মামলার নথি ও তালিকা তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। বলেছিলেন তিনি দেখবেন।

কী দেখেছিলেন শেখ হাসিনা? তারপর কি মামলা প্রত্যাহার হয়েছিল? নেতারা কি রেহাই পেয়েছিলেন মামলা থেকে? উত্তর হচ্ছে না। বরং উল্টা ঘটেছিল। নির্বাচনের আগে একটি মামলাও প্রত্যাহার হয়নি। ভোটের ২ সপ্তাহ আগে থেকে বিরোধী জোটের প্রার্থীদের পিটিয়ে মাঠছাড়া করা হয়েছিল। বিরোধী জোটের প্রার্থীদের মাঠেই থাকতে দেয়া হয়নি। মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তখন। নির্বাচনের মাত্র ৪/৫ দিন আগে বরিশালে মুজিবুর রহমান সারোয়ারের সামনে থেকে নৌকায় ভাসমান একজন নেতাকে সাদা পোশাকে পুলিশ গ্রেফতারের দৃশ্য ভাইরাল হয়েছিল তখন। মুজিবুর রহমান সারোয়ার অসহায়ের মত দাড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ওই ভিডিওতে। পুলিশের তাড়া খেয়ে বিভিন্ন জেলায় হাজারো নেতাকর্মীর এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল।

নির্বাচনের আগের রাতে ভোটের চিত্র এবং ফলাফল সবারই জানা আছে। তারপরও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত অনেকে শীর্ষ নেতাই হাল ছাড়েননি। ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে লিড দিচ্ছেন। ইন্ডিয়া এবং আমেরিকার সিগন্যাল পেয়েই ড. কামাল হোসেন মাঠে নেমেছেন এমন কথা শোনা গিয়েছিল আশাবাদি নেতাদের মুখে। গভীর প্রত্যাশা নিয়ে ভোটের রেজাল্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। বড় টিভি’র স্ক্রিনে দলবেঁধে রেজাল্ট দেখার আয়োজন হয়েছিল। রেজাল্ট দেখে অনেক বড় নেতা মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার অবস্থাও হয়েছিল বলে ঘনিষ্টজনদের মুখে শুনেছি। নির্বাচনের মাঠের পরিস্থিতি দেখেও রেজাল্ট পর্যন্ত প্রত্যাশা ছিল। কারণ, তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল ইন্ডিয়া ও আমেরিকার সিগন্যালে ড. কামাল হোসেন মাঠে আছেন। কিন্তু সেই সিগন্যাল ফেইল করেছে শুচনীয়ভাবে। সেটা বুঝতে নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাদের।

শুধু সিগন্যাল ফেইল করেনি। নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন। তাঁর হাতে যেসব মামলার নথি দিয়ে এসেছিলেন নেতারা, সে গুলো নিয়ে শুরু হয় নাড়াচাড়া। নির্বাচনের পর এই মামলা গুলোর নথি ধরে চার্জশীট দেওয়া সহজ হয়েছিল সরকারের পক্ষে। মামলা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, নেতাদের চাপে যেসব মামলা দ্রততার সাথে ফটোকপি করে দিয়েছিলেন, প্রত্যেকটির চার্জশীট দেওয়া হয়েছে ৬ মাসের মধ্যে। এর কারণ হচ্ছে, শেখ হাসিনার হাতে মামলার ফাইল রেডি ছিল। এ গুলো তাঁর অধিনস্তদের হাতে দিয়ে বলতে পেরেছিলেন দ্রুত চার্জশীট এবং বিচার করা হউক। ওই আইনজীবী আরো জানান, যেসব মামলা তিনি ফটোকপি করে নেতাদের হাতে দিয়েছিলেন সব গুলোই বিচারের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। শেখ হাসিনা চাইলে আগামী নির্বাচনের আগে অনেক নেতাকে ফরমায়েশি রায় দিয়ে কারাদণ্ড দিতে পারবে।

সুতরাং সংলাপে গিয়ে শেখ হাসিনার মিষ্টি কথায় মামলার নথি দিয়ে নেতারা রেহাই পাননি। মামলা গুলোর চার্জশীট দ্রুত দিতেই বরং সহয়তা করেছিলেন।

দেশের অর্থনৈতিক দুরাবস্তা ও বিদ্যুৎ-জ্বালানীর এই মহাসঙ্কটেও আশায় বুক বেঁধে আছেন আমেরিকা একটা কিছু করে দেবে। জুডিশয়াল মার্ডারের পরিকল্পনাকারী ও আদেশদাতা ইন্ডিয়ান এজেন্ট সুরেন্দ্র কুমারের উপর ভরসার চিত্র আমরা অতি কাছে থেকে দেখেছি। ড. কামাল হোসেনের সিগন্যাল ফেইলের দৃশ্য জাতি দেখেছে। আমেরিকার উপর ভরসার শেষ দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় অছেন সবাই।

বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তৃতা-বিবৃতিতে উচ্চস্বরে বলেন, “দেশ যাবে কোন পথে-ফয়সালা হবে রাজপথে”। এই আওয়াজ শুনে অধির আগ্রহে রাজনীতিকদের উপস্থিতির জন্য অপেক্ষায় রাজপথ। দেশের এই দূরাবস্থায়ও কিন্তু রাজনীতিকে রাজপথে না নিয়ে এসি রুমে আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এখনো বিদেশী শক্তির ভরসায় ঘুরপাক খাচ্ছে বিরোধী জোটের রাজনীতি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট দৈনিক আমার দেশ-


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট