২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:১৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৭
ড. সরদার এম. আনছিুর রহমান : তিন মাসের লন্ডন সফর শেষে বুধবার দেশে ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর যুক্তরাজ্যে খালেদা জিয়ার এটি ছিল তৃতীয় সফর। এর আগে ২০১৫ সালে ১৬ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন।
দেশে ফিরে বিপুল জনতার ভালবাসায় সিক্ত হলেন খালেদা। যথারীতি আদালত থেকে জামিনও পেয়েছেন তিনি। এবার দীর্ঘসফর শেষে লন্ডন থেকে দল ও দেশের জন্য কী বার্তা নিয়ে আসছেন বেগম জিয়া, এ দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
নানা ইস্যুর আড়ালেও দেশের রাজনীতির অন্দরমহলে চলছে শত হিসাব-নিকাশ। রোহিঙ্গা,প্রধান বিচারপতি এবং জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকার যে বেশ চাপের মুখে পড়েছে এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।সরকারি মহল এ কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করুক কিংবা নাইবা করুক, তারা যে চরম অস্বস্তিতে রয়েছে তা তাদের কথাবার্তা আর চালচলনেও প্রতীয়মান।
অন্যদিকে, বলা যায় জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বিএনপিও নতুন করে বেশ চাপের মুখে পড়েছে। লন্ডন সফর শেষে ৫ মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা,আইনি মোকাবেলা এবং জাতীয় নির্বাচনে তাদের অবস্থান নিয়ে রাজনীতিতে উত্তাপ বইছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার চাচ্ছিল খালেদা জিয়া লন্ডনেই থেকে যাক। তাদের সাম্প্রতিক কথা বার্তা থেকেও এমনটিই লক্ষ্য করা গেছে। যেমনটি উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘খালেদা জিয়া দেশে ফিরবেন কিনা দেখুন!’ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ফলে সরকারের এমন কামনা থাকলেও তাদের বিকল্প চিন্তাও ছিল,যেমনটি মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দ্রত সম্পন্ন করার। এমতাবস্থায় খালেদা জিয়া দেশে ফিরে গেলে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে যতদ্রুত সম্ভব তাকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো।
সরকারের এই প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকটি মামলা ইতোমধ্যেই বিচারের জন্য একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খালেদার লন্ডন সফর নিয়ে সরকারি মহলে যে কিছুটা টেনশন সৃষ্টি করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর টেনশন হওয়াটাও স্বাভাবিক। কেননা,রাজনীতিতে দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিচক্ষণতা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পর্কে কমবেশি সবাই অবগত।
ফলে জাতীয় নির্বাচনের আগে তার সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে যেমন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি থাকছে, তেমনি দলের সারাদেশের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও এর মাধ্যমে উজ্জীবিত হবেন। তাই বলা যায়, মা-ছেলে মিলে আগামী দিনের জন্য কী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন সেদিকেই সবার দৃষ্টি এখন।
তবে যে যাই বলুক না কেন, এই সময়টা যে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা ভুলে গেলে চলবে না। জীবনে অনেক পরিস্থিতি মোকাবেলা করলেও বর্তমানের মতো এমন প্রতিকূলতা ও জটিলতা আর কখনো মোকাবেলা করতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাই এখন দেখার বিষয় তিনি কতটা বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারেন।
পত্রপত্রিকা পাঠে এবং ঢাকা ও লন্ডনের বিভিন্ন সূত্রে যতদূর জানা যাচ্ছে তাতে, বিএনপির কোনো পক্ষেরই কথায় আর কান দিতে চাচ্ছেন না বেগম জিয়া। নিজের বুদ্ধিতে পথ চলার নীতি গ্রহণ করেছেন। দেশে ফিরে কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নামবেন। তবে রাজনীতিতে এ নিয়ে কৌতূহল অনেক। দলের নেতাকর্মী ও শুভাকাকাঙ্ক্ষীরা অধীর আগ্রহে বেগম জিয়ার দেশে ফেরার অপেক্ষা করছেন। তার অনুপস্থিতিতে তৃণমূলে দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায়ও কিছুটা ভাটা পড়েছে। আশা করছেন তিনি ফিরলেই সব ঠিকঠাক মত এগুবে।
তবে বিএনপি ও জামায়াত ঘরনার বুদ্ধিজীবীদের বাইরে তৃতীয় পক্ষেরও এ নিয়ে ভাবনা থেমে নেই। দলীয় গণ্ডির বাইরের বুদ্ধিজীবী ও পর্যবেক্ষকরাও এই পরিস্থিতিকে খালেদা জিয়ার জন্য বেশ জটিল ও প্রতিকূল হিসেবেই মনে করছেন। বিএনপি ঘরনার লোকজনদের কাছে আজকের এই বিশ্লেষণ কিছুটা তিক্ত মনে হলেও বাস্তবতার চরম সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়া যা করতে পারেন-
এক. আইনীভাবে মামলারগুলোর মোকাবেলা করে যতদ্রুত সম্ভব জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া।
দুই. দলের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেয়া।এবং একটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায়ে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে সম্ভাব্য বড় আন্দোলনের জন্যও দলকে প্রস্তুত করা।
তাই এখন দেখার বিষয় খালেদা জিয়া কোন পথে হাঁটেন। ১৯৮১ থেকে ২০১৭ এই ৩৭ বছরে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জিয়া পরিবারকে। এরশাদের শাসনামলে ‘৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় তাকে চরম জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়। অতঃপর ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়। এরপরও খালেদা জিয়া এমন একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রাজনীতিক। কখনো ক্ষমতায় থেকেছেন আবার কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো পদে নেই, নেই সংসদেও।
না থাকলে কী,দেশের জনপ্রিয় দলগুলোর অন্যতম বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী।দেশের মানুষের ‘ভোটের অধিকার’আদায়ের দাবিতে তার নেতৃত্বে চলছে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলন। মূলত জনগণকে ঘিরেই তার সবকিছু। সবমিলেই এখন রাজনীতিতে টিকে থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ম্যাডাম জিয়ার জন্য মঙ্গলজনক।
রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীতে দলের চাটুকররা প্রশংসার বুলি উড়িয়ে নিজেরাই খালেদাকে ঘিরে রাখেন, এতে মাঠের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ কী ভাবছেন সেটা জানা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় তাকে। এছাড়া দলের প্রভাবশালী নেতারাও নিজেদের ও সম্পদ রক্ষায় সরকারের সাথে গোপন আঁতাতে খালেদাকে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করেছেন। ফলে তাকে এখন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিজেরই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবশেষে বলবো, মামলা মোকাবেলার পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে টিকে থাকা, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রেখে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ায় ম্যাডামের বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ আন্দোলনের ফল ঘরে তুলতে হলে তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। এতে সরকার ও বুদ্ধিজীবীরা যাই বলুক না কেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিজয়ী হলে সব কিছুই একদিন মুছে যাবে। ফলে দল এবং দেশের স্বার্থেই খালেদা জিয়াকে এখন বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুতে হবে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আগামী দিনে তিনি কোন পথে হাঁটেন সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D