সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক এখন মরণ ফাঁদ : জনদুর্ভোগ চরমে

প্রকাশিত: ২:০০ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৭

সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক এখন মরণ ফাঁদ : জনদুর্ভোগ চরমে

সিলেট-জকিগঞ্জ ও আটগ্রাম-জকিগঞ্জ প্রধান সড়ক প্রায় চার বছর থেকে সংস্কার না করায় বেহাল রূপ ধারণ করেছে। সড়ক ও জনপথের আওতাধীন সিলেট-কালিগঞ্জ-জকিগঞ্জ সড়কের ৯১ কিলোমিটার ও স্থানীয় সরকারের অধীনে আটগ্রাম থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে সড়ক জুড়ে ছোট-বড় প্রায় হাজারো গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙ্গাচুড়া সড়কের কারণে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাস্তার ওপর যখন-তখন বিকল হয়ে পড়ে গাড়ি। ঘন্টার পর ঘন্টা সড়কে কাটে যাত্রীদের। এতে জনমনে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, জকিগঞ্জ-সিলেট সড়কের ৯১ কিলোমিটার ও স্থানীয় সরকারের অধীনে আটগ্রাম থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়ক যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চারখাই থেকে কালিগঞ্জ হয়ে জকিগঞ্জ পর্যন্ত সড়কে বেশ কয়েকটি বড়বড় গর্ত হয়ে পুকুরে রূপ নিয়েছে। বৃষ্টি হলেই গর্তগুলোতে পানি জমে থাকে। ফলে হরহামেশাই এসব গর্তে পড়ে নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে গাড়ি চালকদের। অনেক সময় দেখা যায় রিকশা-সিএনজিসহ ছোটখাটো গাড়িগুলো গর্তে পড়ে উল্টে যায়। এতে অনেকে গুরুত্বর আহত হচ্ছেন।

একাধিক চালকক জানান, সড়কে খুব বড় বড় গর্ত রয়েছে। এসব গর্তে গাড়ির চাকা পড়লে সহজে গাড়ি গর্ত থেকে তুলা সম্ভব হয়না। বৃষ্টির পর এসব গর্তে পানি জমে থাকে। এতে গর্তের গভীরতা বুঝে উঠতে পারেন না চালকরা। বৃষ্টির দিন যানবাহন গর্তে আটকে যায়। যাত্রীরা বেকায়দায় পড়েন। চলতি বছরে একাধিকবার পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতি সড়ক সংস্কারের দাবীতে লাগাতার পরিবহন ধর্মঘট পালন শুরু করলে দাবীর মূখে পড়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বড় বড় গর্তে ইট দিয়ে জোড়া তালি দিয়েছে। এই জোড়াতালির কারণে আগের চাইতে যানবাহন চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে আরো বহুগুণ।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, এ সড়ক দিয়ে রোগীদের নিয়ে জেলা সদরের বিভিন্ন হাসপাতালে যাওয়ার সময় ভাঙ্গা সড়কের ঝাঁকুনিতে অনেক রোগীর মৃত্যু ও প্রসুতি মা নিয়ে সিলেট যাবার পথে সড়কেই ডেলিভারী হওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে।

পরিবহন যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানী ও জেলা শহরের সাথে সীমান্তঞ্চলের জনপদের একমাত্র এ প্রধান সড়ক দিয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, মৌলভীবাজারের বড়লেখা, শ্রীমঙ্গল, জাফলংসহ বিভিন্ন উপজেলার লক্ষ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করেন। প্রতিদিন শতশত বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজি, মোটরসাইকেল, রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান, বিভিন্ন কোম্পানীর মালবাহী গাড়িসহ অফিসিয়াল সরকারী বেসরকারী যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সড়কটি খানাখন্দে ভরপুর হওয়ায় যানবাহন চলে ঝিমিয়ে। এ কারণে কর্মমূখী লোকজন সময় মত গন্তব্যে পৌছতে পারেন না। এখন লোকজন খুব বেশী প্রয়োজন ছাড়া এ সড়ক দিয়ে চলাচল করেন না। দুর্বিষহ হয়ে ওঠছে জনজীবন। প্রতিনিয়ত সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। ভাঙা সড়কের কারণে অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

মাইক্রোবাস চালক শাহারিয়া আহমদ বলেন, জকিগঞ্জ-সিলেট সড়ক যেন এক মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। রোদের দিনে ধুলা আর সামান্য বৃষ্টি হলেই কাঁদাজল আর সড়কের গর্তে পানি জমে সড়ক ছোট বড় কুয়ায় পরিণত হয়। চালকরা সড়কের ভাঙা অংশ থেকে গাড়ীকে বাঁচাতে ঝূঁকি নিয়ে হেলেদুলে যানবাহন চালাতেও দেখা যায়। এতে একদিকে যানবাহন ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন যানবাহন মালিকরা। অন্যদিকে গাড়ীর অস্বাভাবিক ঝাঁকুনিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা।

বাসযাত্রী কাওসার আহমদ বলেন, খনাখন্দে ভরপুর সড়কে চলাচল করতে কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে হয় অনেক সময়ে। প্রায় সময় ঝূঁকি এড়াতে একটা গাড়ী আরেকটা গাড়িকে সাইট দিতে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকে। সড়ক মেরামতের সময় নিম্নামানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণেই সড়কটি ঘনঘন নষ্ট হয়। জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ সড়কটি অভিভাবকহীন হওয়ায় এমন করুণ পরিণতি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

জকিগঞ্জ পৌর এলাকার ব্যবসায়ী বেলাল আহমদ বলেন, জকিগঞ্জ-সিলেট সড়ক এতো খারাপ তা কাউকে বলে বুঝানো যাবেনা। সিলেট থেকে মালামাল নিয়ে যে ট্রাক চালক একবার এ সড়ক দিয়ে জকিগঞ্জে আসে দ্বিতীয়বার ওই ট্রাক চালককে কোনো ভাবেই জকিগঞ্জে আনা যায় না। ভয় লাগে সিলেট শহর থেকে জকিগঞ্জে ট্রাকযোগে মালামাল আনতে। মাঝে মধ্যে সড়কের গর্তের মধ্যে ট্রাক আটকা পড়ে বিকল হয়। এতে মালামালও নষ্ট হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা জেলা শহরের সাথে সড়ক যোগাযোগও বন্ধ থাকে। মানুষের গালমন্দ শুনতে হয়।

জকিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ফারুক আহমদ বলেন- কোনদিনই জকিগঞ্জ-সিলেট প্রধান সড়কটি এভাবে বিধ্বস্থ হয়নি। বড় বড় গর্তের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সড়কে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সড়কটির প্রতি কর্তৃপক্ষের উদাসীন ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ যথাসময়ে সড়কটির রক্ষণাবেক্ষনের উদ্যোগ না নেয়ায় সরকারের প্রতি জনগন ক্ষোব্ধ হয়ে উঠছেন। যত দ্রুত সম্ভব সড়ক মেরামত করে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল রাখতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান।

জকিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী খলিল উদ্দিন বলেন- সড়কের অবস্থা খুবই নাজুক। এ সড়ক দিয়ে চলাফেরা করার সময় মনে হয় এই বুঝি গাড়ি উল্টে যাবে। তবুও ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। শুনেছি সড়ক উন্নয়নে ১৭৮ কোটি টাকা একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু সওজ কর্মকর্তারা টেন্ডার করতে বিলম্ব করছেন। এ কারণেই দিনদিন সড়কে মানুষের দূর্ভোগ বাড়ছে।

জকিগঞ্জ উপজেলা এলইজিডি প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার বলেন- স্থানীয় সরকারের অধীনে আটগ্রাম থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত সড়কের মেরামত কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সড়ক ও জনপদ বিভাগ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত বলেন- সড়কের সংস্কার কাজের জন্য টেন্ডারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে বর্ষা মৌসুম পরেই নভেম্বর ডিসেম্বর নাগাদ সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এখন আমাদের ফান্ড থেকে অতি ঝূঁকিপূর্ণ সড়কের অংশে কাজ চলছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য বিরোধী দলীয় হুইপ আলহাজ্ব সেলিম উদ্দিন বলেন- সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীণে সিলেট-গোলাপগঞ্জ-চারখাই-জকিগঞ্জ সড়ক উন্নয়নে ১৭৩ কোটি টাকা একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। সওজ কর্তৃপক্ষকে দ্রুত টেন্ডার করে কাজ শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট