দুর্ঘটনায় শুধু জীবন রক্ষা নয়, স্বাভাবিক জীবনে ফেরাও জরুরি: ট্রমা চিকিৎসায় প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারির ভূমিকা

প্রকাশিত: ৭:১৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২৬

দুর্ঘটনায় শুধু জীবন রক্ষা নয়, স্বাভাবিক জীবনে ফেরাও জরুরি: ট্রমা চিকিৎসায় প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারির ভূমিকা

প্রফেসর ডা. মৃণাল কান্তি দাস : সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে আঘাত, অগ্নিদগ্ধ হওয়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় একজন মানুষ শুধু শারীরিক আঘাতই পান না; কখনো কখনো তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন, চলাফেরা, কর্মক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুরুতর দুর্ঘটনায় হাড় ভাঙা বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গের আঘাতের পাশাপাশি ত্বক, পেশী, স্নায়ু, রক্তনালি ও শরীরের নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গের পুনর্গঠন ও কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারির ভূমিকা।

অনেকের ধারণা, প্লাস্টিক সার্জারি মূলত সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা বাহ্যিক চেহারা পরিবর্তনের জন্য করা হয়। বাস্তবে এই বিশেষায়িত চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা হলো দুর্ঘটনা বা আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের শরীরের পুনর্গঠন করা এবং যতটা সম্ভব স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করা।

দুর্ঘটনার পর প্রথম অগ্রাধিকার জীবন রক্ষা
গুরুতর দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষ্য হলো জীবন-সংশয়ী সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, মাথা বা বুকের গুরুতর আঘাত এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মতো পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ট্রমা, অর্থোপেডিকস, নিউরোসার্জারি কিংবা অন্যান্য বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর মূল্যায়নও জরুরি। কোথাও গভীর ক্ষত, কোথাও ত্বক উঠে যাওয়া, আবার কোথাও পেশী বা হাড় উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। এসব আঘাতের চিকিৎসা নির্ভর করে ক্ষতের গভীরতা, রক্ত সরবরাহ, সংক্রমণের ঝুঁকি এবং আশপাশের অঙ্গের ক্ষতির ওপর।

ট্রমা চিকিৎসায় প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারি কেন প্রয়োজন?
রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারির উদ্দেশ্য হলো দুর্ঘটনা, পোড়া, সংক্রমণ বা অন্য কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শরীরের গঠন পুনর্গঠন করা এবং সম্ভব হলে কার্যক্ষমতা উন্নত করা। ক্ষতের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসায় ক্ষত পরিষ্কার করা ও মৃত টিস্যু অপসারণ, ক্ষত বন্ধ করা, ত্বক প্রতিস্থাপন বা স্কিন গ্রাফট, কিংবা শরীরের অন্য অংশ থেকে টিস্যু এনে ক্ষত ঢাকার জন্য ফ্ল্যাপ সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, দুর্ঘটনায় হাতের ত্বক ও নরম টিস্যু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ক্ষত বন্ধ করাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। হাতের নড়াচড়া, স্নায়ু ও টেনডনের কার্যক্ষমতা ফিরানো এবং রক্ত সরবরাহ বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে হয়। একইভাবে মুখমণ্ডলে আঘাতের ক্ষেত্রে ক্ষত নিরাময়ের পাশাপাশি মুখের পুনর্গঠন, চোখের চারপাশের টিস্যু এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলা বা খাওয়ার মতো কার্যক্রমের ওপর আঘাতের প্রভাবও বিবেচনা করতে হয়।

সব রোগীর একই ধরনের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। ক্ষতের অবস্থা, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার লক্ষ্য অনুযায়ী কখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, আবার কখনো রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার পর ধাপে ধাপে পুনর্গঠন করা হয়।

অগ্নিদগ্ধ ও জটিল ক্ষতে বিশেষায়িত চিকিৎসা
আগুন, গরম তরল, রাসায়নিক পদার্থ বা বিদ্যুতের কারণে পুড়ে গিয়ে ত্বকের বিভিন্ন স্তর এবং কখনো গভীর টিস্যু পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পোড়ার গভীরতা ও বিস্তৃতি অনুযায়ী তরল ব্যবস্থাপনা, ক্ষত পরিচর্যা, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

গভীর পোড়া ক্ষতে স্কিন গ্রাফট বা অন্যান্য পুনর্গঠনমূলক পদ্ধতি বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আবার ক্ষত শুকানোর পর দাগ, ত্বকের সংকোচন বা কনট্রাকচার তৈরি হলে তা অঙ্গের স্বাভাবিক নড়াচড়া সীমিত করতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পুনর্গঠনমূলক চিকিৎসা রোগীর কার্যক্ষমতা ফিরাতে সহায়ক হতে পারে।

পোড়া বা গুরুতর ক্ষতের ক্ষেত্রে নিজে থেকে কোনো রাসায়নিক পদার্থ, মলম বা ঘরোয়া উপাদান প্রয়োগ না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতের ধরন অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করতে হয়।

চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু ক্ষত সারানো নয়
একটি ক্ষত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এক বিষয় নয়। গুরুতর আঘাতের পর দাগ, পেশি বা টেনডনের ক্ষতি, স্নায়ুর সমস্যা কিংবা ত্বকের সংকোচনের কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হতে পারে। তাই চিকিৎসার পরিকল্পনায় ক্ষত নিরাময়ের পাশাপাশি হাত-পায়ের নড়াচড়া, অঙ্গের কার্যক্ষমতা, শরীরের গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কিছু ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, দাগের পরিচর্যা এবং পরবর্তী পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর মানসিক সুস্থতা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাও পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চিকিৎসার ফলাফল নির্ভর করে আঘাতের তীব্রতা, ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পরিমাণ, অন্যান্য শারীরিক জটিলতা এবং পুনর্বাসনের ধারাবাহিকতার ওপর।

এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে সমন্বিত চিকিৎসার গুরুত্ব
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীর চিকিৎসায় একাধিক বিভাগের সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে। ট্রমা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারির উপযুক্ত ভূমিকা নির্ধারণ করা হলে ক্ষত পরিচর্যা, টিস্যু পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব।

প্রতিটি দুর্ঘটনা ও রোগীর অবস্থা আলাদা। তাই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন কি না, কখন করা হবে এবং কী ধরনের পুনর্গঠন উপযুক্ত—এসব সিদ্ধান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থা ও বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিন
দুর্ঘটনার পর গভীর ক্ষত, অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণ, হাড় বা গভীর টিস্যু উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া, গুরুতর পোড়া কিংবা মুখমণ্ডল ও হাতের জটিল আঘাত দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। গুরুতর রক্তক্ষরণ হলে নিরাপদভাবে ক্ষতের ওপর পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে সরাসরি চাপ প্রয়োগ করে জরুরি সহায়তা নিতে হবে; ক্ষতের ভেতরে কোনো বস্তু গেঁথে থাকলে সেটি নিজে থেকে টেনে বের করা উচিত নয়।

দুর্ঘটনায় জীবন রক্ষা সর্বাগ্রে, কিন্তু চিকিৎসার লক্ষ্য সেখানেই শেষ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত শরীরের গঠন ও কার্যক্ষমতা যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধার করে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাসময়ে সঠিক মূল্যায়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারি এবং ধারাবাহিক পুনর্বাসন—এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই দুর্ঘটনাজনিত আঘাতের পর দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট – প্লাস্টিক, রিকন্সট্রাকটিভ অ্যান্ড কসমেটিক সার্জারি, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট