|
প্রকাশিত: ১২:২২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) চলতি বছরের ১০ মাসে বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত সাত শিক্ষার্থী। বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই মৃত্যুর মিছিল থেমে থাকেনি অক্টোবরেও। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের কয়েকটি ঘটনায় একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে ক্যাম্পাসজুড়ে শোকের আবহ আরও গভীর হয়েছে। অকালেই নিভে যাওয়া এসব প্রাণের সঙ্গে হারিয়ে গেছে পরিবারের আশা, স্বজনদের স্বপ্ন আর সহপাঠীদের প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত সাত শিক্ষার্থীর মধ্যে তিন জনেরই মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে, দুজন সড়ক দুর্ঘটনায়, একজন আকস্মিক অসুস্থতায় এবং অন্যজন কীটনাশক পান করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায়। তাঁদের প্রত্যেকের মৃত্যুর ঘটনা আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে থাকা অবস্থায়ই তাঁদের জীবন থেমে গেছে।
বছরের শুরুতেই শাবিপ্রবিতে নেমে আসে শোকের ছায়া। গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র লালাখালে পানিতে ডুবে মারা যান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুসআব আমীন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।
বন্ধুদের সঙ্গে লালাখালে ঘুরতে গিয়ে গোসল করতে পানিতে নামেন মুসআব। তথ্য অনুযায়ী, তিনি সাঁতার জানতেন না। একপর্যায়ে পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতেই এমন আকস্মিক মৃত্যু সহপাঠীদের জন্য ছিল বেদনাদায়ক। যে বয়সে পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই থেমে যায় তাঁর পথচলা।
ফেব্রুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রতন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে থাকা এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আরও একটি পরিবারকে স্বজন হারানোর শোক বহন করতে হয়েছে।
১৫ মে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দিতে ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারান শাবিপ্রবির পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত বণিক। তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী বাজার এলাকায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন নদীতে তিন বন্ধু মিলে গোসল করতে নামেন শান্ত। এ সময় পানির গভীরতা ও তীব্র স্রোতে তিনি তলিয়ে যান। পরে তাঁকে উদ্ধারে কাজ শুরু হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে বিছানাকান্দিতে যাওয়া এই তরুণের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। ২২ বছর বয়সে তাঁর এমন মৃত্যু পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকে। পানিতে ডুবে প্রাণ হারানোর ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও পানিতে নামার ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন সামনে এনেছে।
১৬ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরের চৌকিদিখি এলাকার ব্রিটানিয়া সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপাঞ্জন ঘোষ।প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার দিকে সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। পরে সহপাঠীরা তাঁকে উদ্ধার করে নগরের দরগাহ গেট এলাকার নূরজাহান হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আবারও শোকের ছায়া নেমে আসে ক্যাম্পাসে। সুইমিংপুলে এমন দুর্ঘটনা ঘটায় সাঁতার কাটার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা, তদারকি ও জরুরি উদ্ধারসুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১১ অক্টোবর সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহাদাত রহমান নাবিল। কোনো কোনো প্রকাশিত তথ্যে তাঁর নামের সঙ্গে ‘সাদমান’ নামটিও এসেছে।মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের নির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি, শ্রেণিকক্ষের ব্যস্ততা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে থাকা একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের মধ্যে শোক ছড়িয়ে পড়ে।
১২ অক্টোবর মারা যান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিসান হাসান। হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই শিক্ষাবর্ষের মুসআব আমীনের মৃত্যুর পর একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থীর মৃত্যু শাবিপ্রবির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের জন্যও শোকের সংবাদ হয়ে আসে।
সাত শিক্ষার্থীর মৃত্যুর সর্বশেষ ঘটনাটি শাহরিয়ার বাঁধনের। রসায়ন বিভাগের এই শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যে গত ৪ অক্টোবর কীটনাশক পান করেন। পরে তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৩ অক্টোবর দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়। বাঁধনের স্থায়ী বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলায়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় নয় দিনের লড়াইয়ের পরও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
শাবির রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইকবাল আহমেদ সিদ্দিকী জানান, প্রাথমিকভাবে তাঁরা জানতে পেরেছেন, অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও কলহের জেরে বাঁধন বিষপান করেছিলেন।
এসব সব মৃত্যুর কারণ এক নয়। তাই প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপদে পানিতে নামার বিষয়ে সতর্কতা, সড়কে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা, সুইমিংপুলে পর্যাপ্ত উদ্ধারব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে কিছু ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
সাতটি মৃত্যু সাতটি পরিবারের জন্য তৈরি করেছে অপূরণীয় শূন্যতা। তাঁদের কেউ আর ফিরবেন না শ্রেণিকক্ষে, কেউ ফিরবেন না আবাসিক হলের পরিচিত কক্ষে, কেউ আর বন্ধুদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করবেন না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপত্তা ও সহায়তার ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা গেলে ভবিষ্যতে এমন অকালমৃত্যু ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

EDITOR & PUBLISHER :
DR. ARIF AHMED MOMTAZ RIFA
MOBILE : 01715110022
PHONE : 0821 716229
OFFICE : SHUVECHCHA-191
MIAH FAZIL CHIST R/A
AMBAKHANA WEST
SYLHET-3100
(Beside Miah Fazil Chist Jame Masjid & opposite to Rainbow Guest House).
E-mail : sylhetsangbad24@gmail.com
Hello : 01710-809595
Design and developed by M-W-D