প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরঃ ঢাকা-নয়াদিল্লীর যৌথ সম্মতিতে যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত

প্রকাশিত: ৩:২৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২২

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরঃ ঢাকা-নয়াদিল্লীর যৌথ সম্মতিতে যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ঢাকা ও নয়াদিল্লী যৌথ সম্মতিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে উভয়পক্ষ এসব সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্বের চেতনায় বৃহত্তর সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দৈনিক অধিকারের পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো-

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রেলসংযোগ উন্নয়ন সম্পর্কিত

>> টঙ্গী-আখাউড়া লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর,

>> বাংলাদেশ রেলওয়েতে রেলওয়ে রোলিং স্টক সরবরাহ,

>> ভারতীয় রেলওয়ের স্বনামধন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ,

>> বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার উন্নতি নিশ্চিতে আইটি-সংক্রান্ত সহযোগিতা প্রদান।

বাংলাদেশ-ভারত রেলসংযোগের উন্নয়নে গৃহীত নতুন উদ্যোগ

>> কাউনিয়া-লালমনিরহাট-মোগলঘাট-নিউ গীতালদহ রেল সংযোগ,

>> হিলি ও বিরামপুরের মধ্যে রেলসংযোগ স্থাপন,

>> বেনাপোল-যশোর রেলপথ ও সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং রেলস্টেশনের মানোন্নয়ন,

>> বুড়িমারী ও চ্যাংড়াবান্ধার মধ্যে রেলসংযোগ পুনঃ স্থাপন,

>> সিরাজগঞ্জে একটি কনটেইনার ডিপো নির্মাণ।

এসব অগ্রগামী প্রকল্পের জন্যে বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগিতার অধীনে একাধিক আর্থিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকল্পসমূহের অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশের অনুরোধে অনুদানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২০টি ব্রডগেজ ডিজেল লোকোমোটিভ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত।

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে রক্ষায় পদক্ষেপ

ভারত থেকে বাংলাদেশে চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থায় দুদেশের মধ্যে পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

মানুষ ও পণ্যের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চলাচলের সুবিধা নিশ্চিতকরণ

আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে চলমান উন্নয়নমূলক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্নকরণ, যার মধ্যে চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন সীমান্ত ক্রসিংগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসন এবং বাণিজ্য-সম্পর্কিত অবকাঠামো রয়েছে।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা

>> একটি শান্ত ও অপরাধমুক্ত সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ত্রিপুরা সেক্টর থেকে শুরু করে সমগ্র সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন অংশগুলোতে কাঁটাতার নির্মাণের কাজ শেষ করার বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত একমত হয়।

>> সীমান্ত রক্ষাবাহিনী কর্তৃক পদক্ষেপের মাধ্যমে সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাসকরণ। অস্ত্র, মাদক ও জাল টাকার চোরাচালান এবং পাচার রোধে বিশেষত নারী ও শিশুপাচার রোধে পারস্পরিক সহযোগিতাও প্রশংসিত হয়েছে।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে লড়াইয়ে প্রতিশ্রুতি

>> উভয়পক্ষই সন্ত্রাসবাদের সব রূপ ও অভিব্যক্তি নির্মূলে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে;

>> এ অঞ্চল ও এর বাইরে সন্ত্রাসবাদ, সহিংস চরমপন্থা এবং মৌলবাদের বিস্তার প্রতিরোধে ও সে সম্পর্কিত পদক্ষেপে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে ঢাকা-নয়াদিল্লী।

দ্বিপাক্ষিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সংযোগ বৃদ্ধি

>> উভয়পক্ষ বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল মোটরযান চুক্তি কার্যকর করার প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছেন। এটি বাস্তবায়ন হলে চারটি দেশের সীমান্তে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহন নিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করা সম্ভব হবে।

>> উপ-আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে মহেন্দ্রগঞ্জ (মেঘালয়) থেকে হিলিকে (পশ্চিমবঙ্গ) সংযুক্তকারী একটি নতুন হাইওয়ে নির্মাণকল্পে একটি বিশদ প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরির প্রস্তাব করেছে ভারত। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়কেও তাদের অংশগ্রহণে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে।

>> বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে ভারতের ভূখণ্ডে নির্দিষ্ট ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন/বিমানবন্দর/সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে ভারতের বিনামূল্যের ট্রানজিট ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে বাংলাদেশিদের রপ্তানির সুযোগ করে দিয়েছে নয়াদিল্লী। এটি নেপাল ও ভুটানে রফতানিকারী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদেরকে এরই মধ্যে দেওয়া বিনামূল্যের ট্রানজিট সুবিধার বহির্ভূত।

পারস্পরিক লাভজনক দ্বিমুখী বাণিজ্য

>> ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত চুক্তির অধীনে সফল পরীক্ষামূলক চালান সম্পন্ন হয়েছে।

>> ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগকারী মৈত্রী সেতুটিও চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে এবং ভারত বাংলাদেশকে রামগড়ে অবশিষ্ট অবকাঠামো, অভিবাসন এবং শুল্ক সুবিধা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য অনুরোধ করেছে।

>> দ্বিমুখী ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য, ভারতীয় পণ্যের ওপর বাংলাদেশ কর্তৃক আরোপিত বন্দর নিষেধাজ্ঞা অপসারণে আবারও জোর দেওয়া হয়।

>> উভয়পক্ষের বাণিজ্য বিষয়ক কর্মকর্তাদেরকে ২০২২ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে এবং ২০২৬ সালের আগে এটি সম্পূর্ণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ বাংলাদেশ তার এলডিসি অবস্থা থেকে উন্নীত হবে এবং বর্তমানে ভোগ করা শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত সুবিধাগুলো ধরে রাখতে উদ্যোগ নেবে।

>> বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্য চলাচলের সুবিধার্থে, দেশের ব্যস্ততম স্থলবন্দর, বেনাপোল-পেট্রাপোল আইসিপিতে একটি দ্বিতীয় মালবাহী গেট নির্মাণের উদ্দেশ্যে তহবিল গঠনের জন্য ভারতের দেওয়া প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

>> বঙ্গবন্ধুর ওপর যৌথভাবে নির্মিত বায়োপিক- ‘মুজিব: দ্য মেকিং অব ন্যাশন’ খুব শিগগির শেষ হবে এবং আগামী বছর মুক্তি পেতে পারে।

>> মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্রের যৌথ প্রযোজনা এবং দুর্লভ ভিডিও ফুটেজের যৌথ সংকলনে সম্মত হয়েছে উভয়পক্ষ।

>> ২০১৮ সাল থেকে বিনামূল্যে ভারতের নামকরা হাসপাতালে ১০০ জনেরও বেশি বীর মুক্তিযোদ্ধাকে চিকিৎসাসেবা প্রদানে ভারতের উদ্যোগ গভীরভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

সহযোগিতার ভবিষ্যৎ ক্ষেত্র

>> ভারতে বাংলাদেশী স্টার্ট-আপ প্রতিনিধি দলের প্রথম সফর।

>> সুন্দরবন সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগ।

>> মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, গ্রিন এনার্জি, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং অর্থ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত পরিষেবাগুলোতে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

আঞ্চলিক সমস্যা

>> ভারত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে আশ্রয় দেওয়া এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা হয়েছে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত এসব লোকদের নিরাপদ, টেকসই এবং দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতে ভারত তার অব্যাহত প্রতিশ্রুতির ওপরে জোর দিয়েছে।

>> ভারত বিমসটেক সচিবালয়ের আয়োজনে এবং এর অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশের অবদানের প্রশংসা করেছে। ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় পক্ষ তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট