আফিয়া হত্যায় রিমান্ড শেষে স্বামী কারাগারে, মুন্নীর চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশিত: ৫:৩১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২২

আফিয়া হত্যায় রিমান্ড শেষে স্বামী কারাগারে, মুন্নীর চাঞ্চল্যকর তথ্য

সিলেট নগরীর বালুচরের ভাড়া বাসায় আফিয়া বেগম সামিহা (৩১) খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত মাজেদা খাতুন মুন্নি (২৯) আদালতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।

আফিয়াকে খুন করতে তার কথিত স্বামী নিয়াজেরও সম্মতি ছিল বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন মুন্নি।

এদিকে রিমান্ড শেষে নিহত আফিয়ার কথিত স্বামী নিয়াজ খানকে রোববার (২৮ আগস্ট) আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আনিসুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘নিয়াজের রিমান্ড শেষে রোববার বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পরে আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠিয়েছেন। এছাড়া মুন্নিকে গ্রেপ্তারের পরদিন আদালতে নেওয়া হয়েছিল। আদালতে মুন্নি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার দিবাগত (২৪ আগস্ট) রাতে নগরীর বালুচরের সোনার বাংলা আবাসিক এলাকার বাসায় দরজার তালা ভেঙে আফিয়া বেগম সামিহার (৩১) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আফিয়া বেগম (৩১) গোয়াইনঘাটের আজির উদ্দিনের মেয়ে।

এ খুনের ঘটনায় র‌্যাব আফিয়ার বাসার সাবলেট মাজেদা খাতুন মুন্নি ও পুলিশ কথিত স্বামীকে নিয়াজকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারের পর নিয়াজকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ডে নিলেও তার কাছ থেকে কোনো তথ্য উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

তবে গ্রেপ্তারকৃত মোছা. মাজেদা খাতুন মুন্নি আদালতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মুন্নি জানিয়েছেন- ‘বালুচরের ওই ভাড়া বাসায় তারা অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতেন। তাদের সহযোগিতা করতেন আফিয়ার কথিত স্বামী ইসমাইল নিয়াজ খান। এক পর্যায়ে আফিয়ার সঙ্গে মাজেদার ৭০ হাজার টাকার লেনদেন নিয়ে বিবাদ সৃষ্টি হয়। অপরদিকে নিয়াজের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না আফিয়ার। এ অবস্থায় নিয়াজের কথায় ও নিজের আক্রোশ মেটাতে আফিয়াকে খুন করেন মাজেদা। আফিয়াকে হত্যার জন্য মুন্নিকে ২ লাখ টাকা দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন নিয়াজ’।

পুলিশের একটি সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, সেকান্দর মহলের নিচতলার ওই ইউনিটটি প্রায় দুই বছর আগে ভাড়া নেন আফিয়া বেগম। এরপর থেকে তিনি তার শিশুকন্যা নিয়ে একাই ওখানে থাকতেন। গত ১৮ আগস্ট থেকে প্রতিবেশীরা আফিয়াকে দেখতে পাননি। ২৩ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে তার ঘরের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। এতে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সন্দেহ হয় এবং দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে তারা দেখতে পান- আফিয়ার ইউনিটের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া। এরপর তারা পুলিশে খবর দেন।

খবর পেয়ে পুলিশ রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজার তালা ভেঙে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে আফিয়ার মরদেহ খাটের পড়ে থাকতে দেখে। মরদেহ থেকে উৎকট দুর্গন্ধ বের হচ্ছিলো। মৃতদেহের পাশেই অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় আফিয়ার ১৪ মাস বয়সী শিশুকন্যা নুরিকে। তখন পুলিশ শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে দেখে দ্রুত তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। চিকিৎসা শেষে শিশুটি এখন সুস্থ এবং পুলিশের হেফাজতে আছে।

এদিকে, আফিয়ার মৃত্যু নিয়ে রহস্যজট সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরদিন তার বাবা, ভাই ও বড় বোন জানান- তাদের পরিবার হতদরিদ্র। আফিয়াকে বেশ কয়েক বছর আগে সিলেট মহানগরীতে এক নারী চিকিৎসকের বাসায় কাজ করার জন্য দেন। ওই নারী চিকিৎসক প্রায় ১০ বছর আগে আফিয়াকে নিয়াজের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের কয়েক বছর পর নিয়াজ প্রবাসে চলে যান। গত দুবছর আগে তিনি দেশে ফিরলে পরিবাারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আফিয়ার সঙ্গে কলহের সৃষ্টি হয়। এসময় আফিয়ার বাবার বাড়িতে এ বিষয়ে বিচারসালিশও হয়। পরে বিষয়টি আর সমাধানের পথে যায়নি এবং নিয়াজ ফের ওমানে চলে যান।

আফিয়ার বাবার পরিবারের লোকজনের অভিযোগ ছিলো- নিয়াজ কয়েক বছর ধরে আফিয়া ও তার সন্তানের ভরণ-পোষণ করছেন না। বিষয়টি নিয়ে আফিয়া স্বামীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করেন। কিছুদিন আগে নিয়াজ দেশে ফিরলে এ মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন। ৮ দিন আগে জামিন নিয়ে নিয়াজ কারাগার থেকে বের হন। এরপর থেকে তিনি লাপাত্তা ছিলেন।

কিন্তু নিয়াজকে গ্রেফতারের পর জানা যায়, তিনি কখনোই প্রবাসে ছিলেন না। আফিয়ার কাছে মিথ্যা বলে অন্যত্র থাকতেন। তার বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায়।

আফিয়া হত্যার ঘটনায় বুধবার (২৪ আগস্ট) তার মা কুটিনা বেগম বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এরপর বুধবার রাতেই সিলেটের দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি এলাকা থেকে কথিত স্বামী নিয়াজকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

অপরদিকে, আফিয়া খুনের ঘটনায় গত ২৫ আগস্ট বৃহস্পতিবার ভোরে হবিগঞ্জের বানিয়াচং থেকে মাজেদা খাতুন মুন্নি নামের এক নারীকে গ্রেফতার করে র‍্যাব-৯।

র‍্যাব জানায়, আফিয়া হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর রহস্য উদঘাটনে র‍্যাবও গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। তদন্তের এক পর্যায়ে আফিয়া হত্যাকাণ্ডে মাজেদা বেগম মুন্নি জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় । পরে গােয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-৯ আভিযান চালিয়ে মুন্নিকে বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) ভোরে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। মুন্নি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার সারংপুর গ্রামের আব্দুল গনির মেয়ে।

মুন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‍্যাব জানতে পারে- আফিয়ার সঙ্গে তার টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়ে তার দ্বন্দ্ব ছিলো। আফিয়ার বাসায় মাজেদা সাবলেট থাকতাে। কিন্তু বেশিরভাগ দিন মাজেদা বাসায় অবস্থান করতাে না। আফিয়ার নিকট মাজেদা বিভিন্ন সময় টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখতাে। একপর্যায়ে মাজেদার পাওনা টাকা আফিয়া দিতে অস্বীকার করে। ফলে আফিয়ার উপর ক্ষিপ্ত হয় মাজেদা এবং আফিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

ঘটনার দুইদিন আগে (১৮ আগস্ট) আফিয়ার বাসায় আসে মাজেদা। ঘটনার দিন (২০ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে আফিয়া ও মাজেদার মধ্যে পাওনা টাকা নিয়ে ঝগড়া হয়। পরে রাত ১২টার দিকে অকস্মাৎ মাজেদা রান্নাঘর থেকে শীল (পাটার শীল) নিয়ে এসে আফিয়ার মাথার বাম পাশে সজোরে পরপর ২টি আঘাত করে।

আঘাতের ফলে তৎক্ষণাৎ আফিয়া বিছানায় লুটিয়ে পড়ে। পরে ২১ আগস্ট ভাের আনুমানিক ৬টার দিকে মাজেদা ওই বাসা থেকে বের হয়ে একটি রিকশা ভাড়া করে নিয়ে আসে এবং বাসার দরজা বাহির থেকে তালা মেরে সে তার মালামাল ও আফিয়ার মােবাইল ফোন নিয়ে বানিয়াচংয়ে নিজ বাড়িতে চলে যায়। কিন্তু এ ঘটনায় আশ্চর্যজনকভাবে বাসায় আটকা পড়া আফিয়ার শিশুকন্যা বেঁচে যায়।

গ্রেফতারের পর মাজেদাকে শাহপরাণ থানায় হস্তান্তর করে র‍্যাব। পরে পুলিশ ২৬ আগস্ট শুক্রবার তাকে আদালতে প্রেরণ করলে সেখানে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন মাজেদা।

জবানব্ন্দীতে তিনি জানান- বালুচরের ওই ভাড়া বাসায় তারা অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতেন। তাদের সহযোগিতা করতেন আফিয়ার কথিত স্বামী নিয়াজ। এক পর্যায়ে আফিয়ার সঙ্গে মাজেদার টাকার লেনদেন নিয়ে বিবাদ সৃষ্টি হয়। অপরদিকে নিয়াজের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না আফিয়ার। এ অবস্থায় নিয়াজের কথায় ও নিজের আক্রোশ মেটাতে আফিয়াকে খুন করেন মাজেদা। আফিয়াকে হত্যার জন্য মাজেদাকে ২ লাখ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন নিয়াজ। কিন্তু খুনের পরপরই র‍্যাবের জালে ধরা পড়েন মাজেদা। নিয়াজ ও মাজেদা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট