রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর আলী ওয়াকিউজ্জামানের দাফন সম্পন্ন

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, মে ২৮, ২০২২

রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর আলী ওয়াকিউজ্জামানের দাফন সম্পন্ন


রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় মুক্তিযুদ্ধে ৪নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আলী ওয়াকিউজ্জামানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বাদ আসর হযরত শাহজালাল (র.) এর দরগা মসজিদে জানাজা দরগা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজার নামাজ শেষে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এসময় সেনা প্রদানের পক্ষ থেকে পুষ্পাঞ্জলি অর্পন করা হয়। এর আগে সিলেটের জেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে পৃথক গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। সময় সিলেটের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ও মরহুমের স্বজনরা শেষ শ্রদ্ধা জানান।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী ওয়াকিউজ্জামান বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে সিলেট নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহির রাজিউন। তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।
মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে আলী ওয়াসিকুজ্জামান চৌধুরী অনি ও আলী ওয়াসিমুজ্জামান চৌধুরী রণিসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। গত মার্চ মাসে আলী ওয়াকিউজ্জামানের স্ত্রী ফৌজিয়া জামান চৌধুরীও না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
মেজর (অব.) আলী ওয়াকিউজ্জামান ১৯৪৯ সালের ১৩ এপ্রিল ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যশোর মিশনারী স্কুলে প্রথম শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পিতা সুবেদার মেজর (অব.) নাইমুজ জামান চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জুনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকায় তিনি চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ক্যান্টনমেন্ট স্কুল, কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ফতেহাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এবং পরবর্তীসময়ে রাওয়ালপিন্ডি (চাকলালা) সেন্ট্রাল গভর্মেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও রাওয়ালপিন্ডি গভর্মেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন।
১৯৭১ এর ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মেজর ওয়াকিউজ্জামান ৪ নম্বর সেক্টরের কৈলাশ শহর সাব সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব লাভ করেন। (কৈলাশ শহর যুদ্ধ পরবর্তীসময়ে মৌলভীবাজার সাব সেক্টর হিসেবে নামকরণ হয়) মৌলভীবাজার, কুলাউড়া, রাজনগর, শমসেরনগর ও ভারতের কৈলাশ শহর এলাকায় যুদ্ধের সময় তিনি বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কৈলাশ সেক্টরে যোগদানের পর থেকে বিজয় দিবস পর্যন্ত তিনি কুলাউড়ার শরিয়পুর ইউনিয়নের ন’মৌজা দখলে রাখতে সক্ষম হন। ভ‚ কৌশলগত কারণে ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুরোধ ছিল, যে কোনো মূল্যে নমৌজা দখল রাখতে যাতে পাকিস্তানিদের সামরিক তৎপরতায় ভারতীয় সীমান্ত শহর কৈলাশ শহর অচল না হয়ে পড়ে। মৌজা এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও দখল রাখার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এত বড় এলাকা মুক্ত রাখার জন্য বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকায় কারণে তৎকালীন লেফটেনেন্ট আলী ওয়াকিউজ্জামান ভারতীয় বাহিনীর প্রশংসা অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধের ৪নং সেক্টর কমান্ডার চিত্ত রঞ্জন দত্ত যুদ্ধ পরবর্তীসময়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন- নয়টা গ্রাম নিয়ে গঠিত একটি মৌজা-নাম নমৌজা। এটি ভারতের কৈলাশ শহরের বিপরীতে অবস্থিত ছিল।
স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তীসময়ে দেশ গঠনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহবানে তিনি প্রথমে বাংলাদেশ গণবাহিনীর সদস্য হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড লাভ করেন। ১৮ বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডজুটেন্ড ও প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া ১৯৭২-৭৩ সালে সৈয়দপুর ১৭ বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র কোয়ার্টার মাস্টার নিযুক্ত হন। এ সময় তিনি নওগাঁ জেলার আত্রাই এলাকায় নকশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক সফল অভিযান চালিয়ে তাদের দমন করেন। ১৯৭৪ সালে যশোর ১২ বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র অধীন কমান্ডো ট্রেনিং সম্পন্ন করেন। রংপুর ২৪ বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র উপ-প্রধান অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। পরে তিনি সৈয়দপুর আর্মি অ্যাডুকেশন অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন স্কুল এর প্রশিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
পরবর্তীসময়ে তিনি বিশ্বখ্যাত মিটসুবিশি গ্রুপ, হুন্দাই, অক্সিডেন্টাল, বাংলাদেশ অ্যারোমা টি’তে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি খাতের নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এলিট ফোর্সের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।


তথ্যসূত্র : সিলেট মিরর


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট