একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ আজ

প্রকাশিত: ১:০৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ আজ

বিরোধীদলের দমন-পীড়ন, গ্রেফতার আর হয়রানির মধ্যে দিয়ে আজ রবিবার দেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ। ফলে সবার নজর আজকের ভোটের দিকে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা নিয়ে সঙ্ঘাত, সংঘর্ষ, গ্রেফতার, প্রার্থীদের হয়রানি, বিরোধী প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার সুযোগ না দেয়ার কারণে বিরক্ত সাধারণ মানুষ। এই নির্বাচন নিয়ে উৎসব-আমেজের চেয়ে বিরোধী জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা থাকলেও দেশের সংগ্রামী জনগণ ভোট দিতে পুরোপুরি উদগ্রীব ও প্রস্তুত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দলীয় সরকার ও জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে কোনো ভয়ভীতির তোয়াক্কা না করেই তারা বিপুলভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। সকাল ৮টা থেকে বিরতিহীনভাবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ২৯৯টি আসনে স্বতন্ত্রসহ ৩৯টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৮৬১ জন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আপত্তি সত্ত্বেও নির্বাচনে ছয়টি আসনের প্রায় সবগুলো কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোটগ্রহণ হবে। : দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে মানুষ যেভাবে মতামত প্রকাশ করেছেন তাতে অধিকাংশ মানুষের মাঝে উদ্বেগ এবং আতঙ্ক ভর করেছে বলে বোঝা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক কাজ করছে। : বিবিসি বাংলার ফেসবুক পাতায় একটি প্রশ্নের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়েছিল- আপনার এলাকায় নির্বাচন নিয়ে পাবলিক মুড কেমন? মানুষ কি ভোট দিতে আগ্রহী নাকি হতাশ? বিবিসির ফেসবুক পাতায় আড়াই হাজারের বেশি মতামত এসেছে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের উদ্বেগ এবং আতঙ্কের কথাই তুলে ধরেছেন। মহিন উদ্দিন সুমন নামে পরিচয় দেয়া এক ব্যক্তি বলেছেন, তিনি চাঁদপুর-৫ আসনের ভোটার। তিনি লিখেছেন, এখনো সবারই মাঝে ভয় কাজ করছে। কারণ মাঠে শুধু সরকার দল দেখছি আর এখনো গ্রেফতারের খবর পাচ্ছি। রুহুল আমিন নামে আরেক ব্যক্তি নিজেকে ভোলা-১ আসনের ভোটার হিসেবে পরিচয় দিয়ে অভিযোগ করেছেন, তার এলাকায় সন্ত্রাসী, পুলিশ, বিজিবি এবং র‌্যাব বাড়ি-বাড়ি গিয়ে বিএনপি নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে। মি: আমিন লিখেছেন, আমার এলাকায় ধম ধমে (থমথমে) পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জানি না ভোটের দিন কেন্দ্রে যেতে পারবো কি না। লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে মাহমুদুল হাসান লিখেছেন, ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ভোটারগণ। কুষ্টিয়া সদর আসন থেকে আকাশ নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, সেখানে এক ধরনের চাপা আতংক বিরাজ করছে সবার মাঝে। কেউ নির্বাচন নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে চাইছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। : তিনি লিখেছেন, সবাই চাচ্ছে ভালোয় ভালোয় ৩০ ডিসেম্বর পার হয়ে যাক। উৎসবমুখর পরিবেশ নেই। সর্বদা চাপা আতংক বিরাজমান। তবে শিহাব শাবাব জোসি নামে একজন ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তিনি নিজেকে ঝালকাঠি-২ আসনের ভোটার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, সেখানে পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক এবং দুই দল সমান প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একই সাথে মিছিল করতেছে। ভালোই লাগতেছে। সব মিলিয়ে আনন্দদায়ক পরিবেশ। ঈদ ঈদ লাগছে, লিখেছেন মি: জোসি। তবে সাইফুল ইসলাম মাসুম নামের আরেকজন লিখেছেন, আমার ২৪ বছরের জীবনে যে কয়েকটি বড় নির্বাচন দেখেছি, এইবারের মতো এত আতঙ্ক আর দেখিনি। বিরোধী দলের সব নেতা পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে থাকে। শতকরা ৭০ ভাগ মহিলা এইবার ভোট কেন্দ্রে যাবে না। নির্বাচন কমিশন কী বলছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অধিকাংশ ভোটার নির্বাচন নিয়ে তাদের উদ্বেগ-আতংক প্রকাশ করলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে আবারো দাবি করেছেন, নির্বাচন নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, আজকের ডেইলি স্টার পত্রিকায় পড়লাম যে, প্রার্থীর এজেন্টগণকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এটা কাম্য নয়। সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি অপরাধ না থাকলে পুলিশ কাউকে হয়রানি করবে না। নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, তাদের কারো জন্য নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। ভোট গ্রহণের দিন নিরাপত্তা বিধানের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। : অনেকে বলছেন- মানুষ ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে তো? কেউ বলছেন আমার ভোটটি আমি কেন্দ্র পর্যন্ত গিয়ে দিতে পারব কি? আবার কেউ বলছেন ভোটের দিন অনেক হাঙ্গামা হবে। আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমি চাই, আমাদের দেশে একটি শান্তিপূর্ণ অবাধ এবং সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সকল ধরনের গ্রেফতার, মামলা-হামলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হোক। দেশের সাধারণ ভোটাররা জানতে পারুক যে, তাদের ভোটের প্রার্থী কে। ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে নিরাপদে পৌঁছবার এবং নিরাপদে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নিজের ভোট প্রয়োগ করে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা না পেলে তারা কখনই ভোট কেন্দ্রে যাবে না। তা সত্ত্বেও দেশে হয়তো একটি নির্বাচন হবে। কিন্তু তা হবে নির্বাচনের নামে প্রহসন। যা আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাব মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করবে। দেশের জনগণ এতে আরোও বেশি হতাশায় নিমজ্জিত হবে। : ইসি সচিব বলেন, এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণ নিয়ে তারা কোনোভাবে শঙ্কিত নন। কারণ নিরাপত্তার জন্য প্রায় সাত লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা আছে। ভোটের দিন ইসির অনুমোদন ছাড়া কোনো যান্ত্রিক যানবাহন চলবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী, সরকারি গাড়ি, সেবা সংস্থা যেমন ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্ব^ুলেন্স, সংবাদপত্র পরিবাহী গাড়ি নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। : যেভাবে ফলাফল ঘোষণা : ফলাফল ঘোষণা প্রক্রিয়ার বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই ফলাফল ঘোষণা করা হবে। প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ শেষে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে কেন্দ্রেই ভোট গণনা করবেন। এ সময় সহকারী রিটার্নিং অফিসার প্রার্থীর এজেন্টরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। ভোট গণনা শেষে প্রিজাইডিং অফিসার লিখিত ফলাফল সংশ্লিষ্ট পোলিং এজেন্টদের সরবরাহ করবেন। পরে এ ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাবেন। রিটার্নিং অফিসাররা তা ইসিতে পাঠাবেন। ইসি ভবনের ফোয়ারা প্রাঙ্গণে স্থাপিত মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হবে। এ চত্বরে ইসি দশটি মনিটরের মাধ্যমে ফলাফল প্রদর্শন করবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, ইভিএমের ভোট কেন্দ্রে স্মার্টকার্ড বাধ্যতামূলক নয়। তবে নিয়ে গেলে ভোট দান সহজ হবে। : সচিব বলেন, সারা দেশে ভোটকেন্দ্রের জন্য এসএমএসের মাধ্যমে ভোটার এলাকা, ভোটার কেন্দ্র ও কেন্দ্রের নম্বর পাওয়া যাবে। গতকাল শনিবার থেকে এ সেবা চালু হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের নিরাপত্তায় ইসির তরফে প্রায় ৭ লাখের কাছাকাছি নিরাপত্তা সদস্য, সাত লাখ বেসামরিক কর্মকর্তা ও এক লাখ পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক ও অন্যরা থাকবেন।