নজিরবিহীন সহিংসতায় প্রচারনা শেষ, সেনা টহলে পাল্টে যাচ্ছে সারাদেশে ভোটের চিত্র

প্রকাশিত: ১:৫৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৮

নজিরবিহীন সহিংসতায় প্রচারনা শেষ, সেনা টহলে পাল্টে যাচ্ছে সারাদেশে ভোটের চিত্র

দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারনা। নির্বাচনের প্রতীক পাওয়ার পর থেকে টানা ১৮ দিন প্রচার চালানোর পর শুক্রবার সকাল ৮টায় নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া প্রচারের সময়সীমা শেষ হয়েছে।

এদিকে নতুন করে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা না ঘটে সেজন্য সারাদেশে র‌্যাব-পুলিশ, বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনী টহল জোরদার করেছে। বিশেষ করে সেনাহিনীর টহল জোরদারে পাল্টে যাচ্ছে ভোটের মাঠের চিত্র। এতে আত্মগোপনে থাকা ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মী-সমর্থকরাও নতুন উদ্যমে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

আর মাত্র ৪২ ঘণ্টা পরই কাঙ্ক্ষিত ভোটপর্ব। ভোটাররা সেই আশায় আছেন। তারা ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য কোনো একটি দল/জোটকে ক্ষমতায় বসাবেন।

নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, এরই মধ্যে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচন সামগ্রী জেলায় জেলায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। শনিবার ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যাবে সব সামগ্রী। শেষ মুহূর্তে ব্যালট পেপারে কোনো পরিবর্তন এলে তা ছাপিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম রয়েছেন নির্বাচনী এলাকায়।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ভোটের পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা নির্বাচনী এলাকায় সভা-সমাবেশ, মিছিল ও শোভাযাত্রা করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে ১ জানুয়ারি বিকেল ৪টা পর্যন্ত সভা-সমাবেশ, মিছিল ও শোভাযাত্রা করা যাবে না।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলই অংশ নিচ্ছে। এক দশক পর ভোটের মাঠে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

এবারের নির্বাচনে সারা দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এক হাজার আটশর বেশি প্রার্থী। এর মধ্যে ৫০ জনের মতো রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, বাকিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের।

ইসি সূত্রে জানায়, এবার ৩০০ আসনে ভোটার ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার। নির্বাচনে ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্র ও দুই লাখ ছয় হাজার ৪৭৭টি ভোটকক্ষ রয়েছে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে গাইবান্ধা-৩ আসনে ভোট স্থগিত করে পুনঃতফসিল দেওয়া হয়েছে।

এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হচ্ছে। ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।

সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে মাঠের চিত্র

এদিকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে একপক্ষীয় প্রচারণায় ভোটের আকাশে ছিল গুমোট হাওয়া। ইসির ব্যর্থতা, আইন শৃংখলা বাহিনীর পক্ষপাতিত্ব আচরণ, গ্রেফতার, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলা-ভয়ভীতি প্রদর্শনে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক উদ্বেগ বিরাজমান। এমনকি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের বাসায় বাসায় গভীর রাতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানো এবং ভোট দিতে কেন্দ্রে না যাওয়ার প্রস্তাব, গেলে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারার নির্দেশে ভোট দিতে যাবেন কিনা তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে সংশয় ছিল। ভোট দেয়ার প্রস্তুতি হিসেবে কর্মজীবী মানুষ রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছেন সংশয়-আতঙ্ক নিয়েই।

কয়েকদিনের পরিচিত এই দৃশ্য পাল্টাতে শুরু করেছে বৃহস্পতিবার কিছু কিছু এলাকায় সেনাবাহিনীর গাড়ী দেখার পর থেকে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের অনেক এলাকায় সেনাবাহিনীর গাড়ী দেখা গেছে। সেনা সদস্যরা এলাকায় গিয়ে ভোটের পরিবেশের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।

শুধু নৌকা প্রতীকের পোষ্টার দেখে জানতে চেয়েছেন অন্য প্রতীকের পোষ্টার নেই কেন? মানুষ জানাচ্ছেন ভয়েই ধানের শীষের পোষ্টার লাগাতে সাহস পাচ্ছেন না ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির প্রার্থীরা। সেনা সদস্যরা ধানের শীষের পোস্টার লাগাতে বাধা দেয়া গুন্ডা-হোন্ডাদের নাম নিচ্ছেন। সেনারা নিজেদের মোবাইল নম্বর দিয়ে ঝামেলা হলেই ফোন করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টহলরত সেনা সদস্যরা মানুষকে ভোট দিতে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন এবং অভয় বাণী শোনাচ্ছেন। তারা বলছেন, ভোট দিতে যাবেন নির্ভয়ে।

কেউ আপনাদের ক্ষতি করতে পারবে না। ভয়ভীতি দেখালে ফোন করবেন সঙ্গে সঙ্গে আমরা এসে ব্যবস্থা নেব। বেশ কয়েকটি এলাকায় খবর নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

রাজধানী ঢাকায় গতকাল দেখা গেছে অন্যরকম দৃশ্য। ২৪ ডিসেম্বর সেনা মোতায়েন করা হলেও বৃহস্পতিবার সেনা সদস্যদের দেখা গেছে রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায়। সেনা বাহিনীর গাড়ী দেখে বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় ভোটারদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে এখন ভোট দিতে পারবো। ধানের শীষ প্রতীকের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে দেখা গেছে নতুন উৎসাহ উদ্দীপনা। কিন্তু নৌকা প্রতীকের কর্মী সমর্থকরা এতোদিন ফ্রি স্টাইলে যে প্রচার প্রচারণা, এলাকার বিএনপির প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ভীতি প্রদর্শন কিছুটা স্থমিত হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ধানের শীষের প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

নেত্রকোনা-৩ আসনের আটপাড়া উপজেলার গ্রামেগঞ্জে সেনাবাহিনীর গাড়ী যায়। স্থানীয়রা জানান, সেনা সদস্যরা এলাকায় ক্যাম্পের খোঁজখবর নিতে যায়। এ সময় তারা ভোটারকে নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অভয় দিয়ে সেনা সদস্যরা জানিয়েছেন, আপনারা ভোট দেবেন কোনো সমস্যা হলেই জানাবেন। ভোট দিতে ভয়ভীতি যারা দেখানোর চেষ্টা করবে তাদের কঠোর ভাবে দমন করা হবে। নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, সেনা টহল চলছে। অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে নোয়াখালী-৪ ও নোয়াখালী-৫ আসনে প্রচারণা বন্ধ রয়েছে।

সুশিল সমাজের প্রতিনিধিরা আশা করছেন, এতোদিন যাই ঘটুক না কেন, ভোটারদের মৌলিক অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।