সিলেটের পশুর হাট গুলো এখনো জমে উঠেনি

প্রকাশিত: ৬:৪৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৭

সিলেটের পশুর হাট গুলো এখনো জমে উঠেনি

ঈদের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। তবে এখনো জমে উঠেনি সিলেটের পশুর হাট। বিক্রেতাদের দাবি, পর পর কয়েকদফা বন্যার প্রভাবে ভাটা পড়েছে পশুর হাটের বিকিকিনিতে। এছাড়া যত্রতত্র পশুর হাট গজিয়ে উঠাকেও দায়ী করেছেন তারা।
গত এপ্রিল থেকে কয়েকদফা বন্যায় তলিয়ে যায় সিলেটের বিভিন্ন এলাকার মানুষের ঘর বাড়ি সহ কৃষি ফসল। যার ফলে পুঁজি সঙ্কটে আছেন ব্যাপারীরা। এছাড়াও যত্রতত্র অবৈধ পশুরহাট, চাঁদাবাজির কারণে ভাটা পড়েছে বৈধ পশুর হাটগুলোতে। ভারত থেকে বৈধ ও অবৈধ পথে গরু চলে আসার কারণে লোকসানের আশঙ্কাও রয়েছে খামারীদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গেলো বছর ঈদের দু’চারদিন আগে থেকে ভারত থেকে গরু আসা শুরু করায় লোকসান গুণতে হয়েছিলো খামারিদের। সারা বছরে সেই লোকসান পুষিয়ে উঠার আগেই আঘাত হানে সর্বগ্রাসী বন্যা। যার ফলে নিম্নাঞ্চলের বেপারীরা ব্যাপক খতিগ্রস্থ হন। এবারের ঈদে কিছুটা হলেও সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা থাকলেও ভারতীয় গরুর আমদানি, যত্রতত্র অবৈধ পশুরহাট ও চাঁদাবাজির কারণে তা আর সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন তারা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পাবনা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, রাজশাহী, যশোর সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেপারীরা গাড়ি বহর করে গরু নিয়ে সিলেটে আসলেও এইবার তার সংখ্যা খুব কম। তার কারণ হিসাবে বাজার সংশ্লিষ্টরা যত্রতত্র অবৈধ পশুরহাট, চাঁদাবাজি, বন্যার প্রভাব ও ভারতীয় গরুর আমদানিকেই দায়ী করছেন।
তারা মনে করছেন বন্যার কারণে মানুষের ঘর বাড়ির সাথে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও গরুর খামার। তাই খামার ব্যবসায়ীরা পড়েছেন লোকসানে। বন্যা কবলিত এলাকার খামারীরা গো খাদ্যের অভাবে আগেই লোকসানে বিক্রি করেছেন গরু। তাই অনেক খামারিরা দেউলিয়া হয়েছেন। তাছাড়া বন্যায় মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় এইবার কোরবানি দেওয়ার মতো মানুষের সংখ্যাও কম।
মঙ্গলবার সিলেটের প্রধান পশুর হাট কাজির বাজার ঘুরে দেখা যায় বাজারের বেশির ভাগ অংশ এখনো ফাঁকা রয়েছে। প্রতি বছর বাজার ভরে রাস্তা পর্যন্ত গরু ভর্তি থাকলেও এবার বাজারের ভিতরের অধিকাংশ জায়গাই খালি। পর্যাপ্ত পরিমাণে গরু এখনো বাজারে আসেনি। বিকিকিনিও নেই তেমন। বেপারীদের সাথে মোহালদারও অলস সময় কাটাচ্ছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় বাইর থেকে আসা বেপারীর সংখ্যাও প্রায় তিনগুণ কম। বাজারে ক্রেতার আনাগোনাও নেই তেমন। প্রায় ৪০ মিনিট রশিদ ঘরের সামনে দাঁড়ানোর পর দেখা যায় একটি গরুর রশিদ করা হচ্ছে।
কাজির বাজার পশুরহাটের ব্যবস্থাপক শাহাদাৎ হোসেন লুলন বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এইবার হাটের অবস্থা মন্দা। প্রতি বছর এক হাজারের অধিক ট্রাক গরু আসে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বাইর থেকেও অনেক ব্যবসায়ীরা গরু নিয়ে আসেন। এইবার তার তুলনায় অনেক কম। এখনো সর্বোচ্চ ১০০শ’ ট্রাক গরু এসেছে। রাস্তাঘাটে অবৈধ পশুর হাটে চাঁদাবাজির কারণে কাজিরবাজারে গরু আসতে পারছে না। এছাড়া আমাদের লোকাল বাজাররে বন্যারও কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে যত্রতত্র অবৈধ গরুরহাট ও রাস্তাঘাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে কাজিরবাজারে গরু আমদানি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
একই সময় কথা হয় স্থানীয় ব্যাপারী সোনা মিয়ার সাথে। সোনা মিয়া হতাশা নিয়ে বলেন, কোরবানির ঈদে ভালো ব্যবসা হবে এটাই আশা থাকে। কিন্তু গেলো বছর থেকে লোকসান গুণতে হচ্ছে। এইবারও লোকসান হবে। একেতো দেশে বন্যার কারণে মানুষ অভাবে থাকায় ক্রেতার সংখ্যা কম। অন্যদিকে ভারতীয় গরুর আমদানি। দেশে যে পরিমাণ গরু আছে তা দিয়েই মানুষের চাহিদা পূরণ হয়ে গরু থাকবে। এর মধ্যে ভারতীয় গরু আসা শুরু করায় আমরা বিপদেই আছি।
কথা হয় সিরাজগঞ্জ থেকে গরু নিয়ে আসা রেজাউল করিম ও কুষ্টিয়া থেকে আসা ইব্রাহীম এর সাথে। দুজনেরই একই কথা, দেশে বন্যা তাই অনেক খামার তলিয়ে গেছে। তাছাড়া মানুষ অভাবে এজন্য এইবার ব্যবসা মন্দা। তাছাড়া ভারতীয় গরু আসায় লোকসানের সম্ভাবনাই বেশি।
অন্যান্য বছরের তুলনায় এইবার বাহির থেকে আসা বেপারীর সংখ্যা কম না বেশি এমন প্রশ্নের জবাবে রেজাউল বলেন, অনেক কম। প্রতি বছর অন্তত দুইশত ব্যাপারী বাইরে থেকে আসে। এইবার সব মিলিয়ে ২০ থেকে পঁচিশজন বেপারী বাইরে থেকে এসেছে। রাস্তা ঘাটে জোড় করে গাড়ি থেকে গরু নামিয়ে অন্যান্য বাজারে নিয়ে যায়। তা না হলে চাঁদা দিতে হয়। তাই ব্যাপারীরা এখানে আসছে না।
বিকিকিনি কিরকম এমন প্রশ্নের উত্তরে ইব্রাহীম বলেন, বিকিকিনি নাই বললেই চলে। ঈদের বাকি মাত্র তিনদিন। এখনো ৩টি গরু বিক্রি করেছি।

এদিকে, গোলাপগঞ্জেও কোরবানির পশুর হাটগুলো এখনো জমে উঠেনি। উপজেলার পৌর সদর ও ১১টি ইউনিয়নের সবগুলো পশুর হাটেই এখন ক্রেতাদের ভীড় অপেক্ষাকৃত কম। এসব বাজারে দেশি গরুর পাশাপাশি বিদেশি গরুও উঠেছে। ছাগল, ভেড়াসহ ছোট কোরবানির পশুও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উপজেলার গোলাপগঞ্জ বাজার (এমসি একাডেমী মাঠ), ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসা বাজার, পুরকায়স্থ বাজার, মীরগঞ্জ মাদ্রাসা বাজার, শরীফগঞ্জ মাদ্রাসা বাজার, রাকুয়ার বাজার সহ ছোট-বড় সবকটি পশুর হাটে খবর নিয়ে জানা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় এই সময়ে এখনও জমে উঠেনি পশুর হাট।
উপজেলার সর্ববৃহৎ গোলাপগঞ্জ বাজারের ইজারাদার আব্দুল কাদির জানান, এখনও পশুর হাট জমে উঠেনি। তবে সাধারণ হাটে যে পরিমাণ পশু বিক্রি হতো তা অব্যাহত রয়েছে। কোরবানির দিন অরো ঘনিয়ে আসলে পশুর হাট পুরোদমে জমে উঠবে বলে আশাবাদী।
ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসা বাজারের ক্রেতা মখদ্দছ আলী নামের এক ক্রেতা জানান, গরুর চাহিদা এবং বাজেটকে প্রাধান্য দিয়ে গোলাপগঞ্জ বাজারে কোরবানির পশু কিনতে এসেছিলাম। বাজারে দেশি বিদেশি গরুর অনেক দাম। খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
গোলাপগঞ্জ বাজারের গরু বিক্রেতা এশাদ আহমদ আহমদ বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এই সময় পশুর হাট জমজমাট হয়ে উঠেনি। এদিকে পশুর হাটসমূহে ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ওসি (প্রশাসন) একে এম ফজলুল হক শিবলী জানান, উপজেলার সবকটি পশুর হাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রেরণ করা হয়েছে। সেই সাথে জাল টাকা শনাক্তকারী মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট