সুনামগঞ্জের হাওরে বোরোর মনগড়া লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ক্ষোভ

প্রকাশিত: ৩:২১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০২৬

সুনামগঞ্জের হাওরে বোরোর মনগড়া লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ক্ষোভ

এক ফসলি বোরো ফসলের দেশ হাওর জনপদ সুনামগঞ্জ। বৈশাখে বিস্তীর্ণ হাওরে বছরের একমাত্র ফসল ফলে। বর্ষায় দিগন্তবিস্তারী পানি থৈ থৈ করে যখন, তখন কিছু মানুষ মাছ ধরে। তবে মাছ ধরায়ও রয়েছে ইজারাদারদের নিষেধাজ্ঞা। ঝুঁকিময় হাওরের বোরো ফসল প্রতি বছরই প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। কখনো আগাম বন্যা, কখনো পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণে তলিয়ে যায় কষ্টের ফসল। তখন হাহাকার শোনা যায় চারদিকে। হাওরের কৃষি অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কৃষক মাথার ঘাম পায়ে পেলে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সোনার ফসল ফলালেও এই ফসলের তথ্য এমনকি মওসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লুকোচুরি করতে দেখা যায় কৃষি বিভাগকে। বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে হাওরের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও প্রভাব পড়ছে। প্রকৃত তথ্যের অভাবে অনেক সিদ্ধান্ত ব্যাহত হয়। এতে ক্ষতি হচ্ছে হাওরবাসীরই। প্রতি বছর হাওরে বোরোর উৎপাদন ও আবাদের লক্ষ্যমাত্রার মনগড়া তথ্য টেবিলে বসেই সংশ্লিষ্টরা দিয়ে থাকেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মনগড়া ছকের ভিত্তিতে। বিশেষ করে বোরো মওসুমের শুরুতে ও মওসুম শেষে আবাদ ও উৎপাদন নিয়ে মনগড়া তথ্য দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

চলতি বছরও মনগড়া বোরোর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা পাঠিয়েছে কৃষি বিভাগ এমনটা জানিয়েছেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। কৃষকরা জানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিবছরই হাওরে পতিত জমির পরিমাণ বাড়ছে। হাওরের জমি ভরাট করে স্থাপনা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এতে ফসলি জমি কমছে। বাঁধের মাটিতে, নদী নাব্যতা হারিয়ে হাওর ও জলাশয়েও প্রভাব পড়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে জলাশয়, খালবিল ও ফসলি জমি। তবে বিভিন্ন স্থানে কিছু কৃষক পতিত জমিকেও ফলনের আওতায় নিয়ে আসছেন। নানা কারণে হাওরে বহুমুখি সংকট তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সরকারি হিসেবে উৎপাদন ও আবাদের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েই চলছে। তাই এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাওর নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে চলতি বছর আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। গতমাসে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা কেন্দ্রে পাঠিয়েছে। এবার জেলায় ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। হাওরের কৃষি আন্দোলনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন পুরনো রিপোর্টগুলো সামান্য এদিক ওদিক করেই ঘরে বসে কৃষি বিভাগ উৎপাদন ও আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এতে হাওরের কৃষির প্রকৃত তথ্য ওঠে আসছেনা। কৃষি বিভাগের গত কয়েক বছরের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কাছাকাছি অঙ্কের মধ্যেই হাবুডুবু খাচ্ছে কৃষি বিভাগ। ফসল ডুবেও গেলেও তারা মনগড়া প্রতিবেদন দেয়। কমিয়ে দেখায় ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র। বাড়িয়ে দেখাচ্ছে উৎপাদন। ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছিল। এই বছর ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫২১ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা পাঠানো হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪১০, ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪০৭ হেক্টর, ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে ২ লাখ ২২ হাজার ৩০০ হেক্টর, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ২ লাখ ২২ হাজার ৬৬৫ হেক্টর, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ১৫ লক্ষ মে.টন ধান উৎপাদন হয়েছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। অথচ আগাম হাওর ডুবে ও পচে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হাওরের অর্ধেক ফসলই নষ্ট হয়েছিল বলে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন ফোরামে দাবি করেছিলেন। সরকার লাখো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে এখনো নগদ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে ওই সময় কৃষিমন্ত্রীর সামনেই বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা প্রতিবাদ করেছিলেন কৃষি বিভাগের আবাদ, উৎপাদন ও ক্ষয়ক্ষতির মনগড়া পরিসংখ্যানের। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। এখানকার খাদ্য চাহিদা প্রায় ৪.৫ লাখ মে.টন পূরণ করে ৮-৯ লাখ মে.টন উদ্বৃত্ত থাকে। তবে এই পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন আছে। সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সহসভাপতি শাহ কামাল বলেন, শুধু বোরো ফসলের আবাদ, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই প্রশ্ন ওঠেনি। অন্যান্য বিভাগেরও একই চিত্র। প্রকৃত তথ্য ওঠে আসছেনা। একটি নির্দিষ্ট ছক ধরে মাঠের বাস্তবতা বিবর্জিত তথ্য দেখানো হয়। এতে হাওরের উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। হাওর আন্দোলনের নেতা সাইফুল আলম সদরুল বলেন, কৃষির প্রকৃত প্রতিবেদন নেই বলে র্স্ট্যাটেজিক রিপোর্ট দুর্বল। মনগড়া তথ্যের কারণে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই। প্রতি বছর বলা হয় বেশি চাষ হয়, উৎপাদনও উৎপাদনও এবং সুনামগঞ্জ খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। এসব কাগুজে রিপোর্টে দাবি করা হলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনা। মাঠ পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কৃষকের স¤পর্ক নেই। কেউ তাদের চিনেনা। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, একটা ছক ধরেই কৃষি বিভাগ প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা ও উৎপাদনের মনগড়া প্রতিবেদন দেয়। যা মূলত টেবিলে বসে পূর্বের রিপোর্টের ছক ধরে সামান্য এদিক-সেদিক করে করা হয়। জলবায়ু প্রভাবের বহুমুখি কারণে বিপর্যস্ত কৃষক। কৃষি সংকটের মুখে। সেই সংকট চিহ্নিত করে সমাধানের কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেই। বরং কিভাবে কৃষককে ঠকানো যায় সেই প্রতিবেদনই প্রতিনিয়ত তৈরি করা হচ্ছে। গবেষক আব্দুল হাই চৌধুরী শানু বলেন, কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা ও উৎপাদনের হিসেবটা অবৈজ্ঞানিক। এটা যে ঘরের টেবিলে বসে করা হয় কয়েক বছরের পরিসংখ্যান নিয়ে বসলেই বুঝা যায়। অথচ এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিজ্ঞানভিত্তিক ডাটা সংগ্রহ করা সহজ ছিল। কিন্তু একটি বানানো ছক দিয়েই তারা লুকোচুরির মনগড়া প্রতিবেদন দিয়ে জাতীয় কৃষি উন্নয়ন নীতিকে ব্যাহত করছে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে কৃষির বাস্তব চিত্র তুলে আনেন। আবাদের লক্ষ্যমাত্রা আমরা তৈরি করে কেন্দ্রে পাঠাই। কেন্দ্র থেকে আমাদের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।


 

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট