বিশ্ব রাজনীতিতে ভূমিকম্প : অহংকারের পতন ও প্রতিরোধের জয়

প্রকাশিত: ১০:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে ভূমিকম্প : অহংকারের পতন ও প্রতিরোধের জয়

মোঃ শামছুল আলম


ইতিহাস সাক্ষী, কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। ফেরাউন, নমরুদ, আবু জাহেল — সবাই একসময় নিজেদেরকে অপরাজেয় ভেবেছিলো! কিন্তু সময়ের স্রোতে সবাই হারিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরের এই এক সপ্তাহ বিশ্ব রাজনীতিতে ঠিক তেমনই এক ভূমিকম্প নিয়ে এসেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“বলুন, হে আল্লাহ! রাজত্বের মালিক! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন।” — (সূরা আলে ইমরান: ২৬)

এই আয়াতের বাস্তব রূপ আমরা এখন ওয়াশিংটন আর তেল আবিবে দেখতে পাচ্ছি।

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকার জনগণ এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও হাউজ — দুটোতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। মিশিগান থেকে আব্দুল এল-সায়েদ হয়েছেন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর! নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মুসলিম ও অভিবাসী প্রার্থীদের জয় প্রমাণ করে, আমেরিকা এখন আর ঘৃণার রাজনীতি চায় না।

এই ভোটে মানুষের ক্ষোভের বড় কারণ ছিলো ইরানের উপর অজনপ্রিয় যুদ্ধ। ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা, তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া — সবকিছু মিলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়।

এমনকি ভোটের দিন ট্রাম্প নিজেই ইসরায়েলকে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার সাহায্য বন্ধের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। যিনি নেতানিয়াহুকে “Complete and Total Endorsement” দিয়েছিলেন, তিনিই আজ চাপে পড়ে সুর বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।

রাসূল (সা.) বলেছেন: _”জালিমের জন্য দুনিয়াতে যেমন শাস্তি আছে, আখিরাতেও আছে। মজলুমের দোয়া আর আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।”

ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন হয়েছে। নেতানিয়াহুর জোট ৬৮ আসন থেকে নেমে এসেছে ৫৩ আসনে। ১২০ আসনের সংসদে সরকার গঠনের জন্য দরকার ৬১ আসন। তিনি এখন আর সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি এখন কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রী।

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ এখন দলগুলোর সাথে আলোচনা করছেন। বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, “ইসরায়েল নেতানিয়াহুকে আর বহন করতে পারবে না।” আরেক বিরোধী নেতা ইয়ার গোলান বলেছেন, “নেতানিয়াহু এখন দুই দলেই বিষাক্ত হয়ে গেছেন।”

তার সামনে এখন দুর্নীতির মামলা, আদালতের রায় আর ক্ষমতা হারানোর ভয়। আল্লাহ বলেন:
“আর ফেরাউন দেশে অহংকার করেছিলো এবং তার অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিলো… নিশ্চয়ই সে ছিলো বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত।” — (সূরা আল-কাসাস: ৪)

ক্ষমতার অহংকারে যারা নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরায়, তাদের পরিণতি ফেরাউনের মতোই হয়।

ইরানকে অনেকে শেষ হয়ে গেছে ভেবেছিলো, সেই ইরান এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে! ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ হামলা, সর্বোচ্চ নেতার উপর আঘাত, অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ — সবকিছুর পরেও ইরান ভাঙেনি। বরং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যেকোনো নতুন হামলার জবাব হবে “তাৎক্ষণিক, কার্যকর এবং ভৌগলিকভাবে সীমাহীন।”

ইরান শুধু একটা দেশের নাম নয়, এটা ধৈর্য, প্রতিরোধ আর আত্মমর্যাদার নাম। যারা ইরানকে চিনতো না, তারা এখন চিনছে — বোমা দিয়ে একটি জাতির ঈমানকে ধ্বংস করা যায় না।

এই নির্বাচনগুলো শুধু দুইজন নেতার হার-জিত নয়। এটা গোটা মানবতার জন্য একটা সতর্কবার্তা।

আমরা দেখেছি, যখন বিশ্বের নেতৃত্ব যুদ্ধবাজ, খুনি আর বেপরোয়া মানুষের হাতে যায়, তখন কী হয় —
গাজায় শিশুরা মরে, ইরানে বোমা পড়ে, ইউক্রেনে গ্রাম উজাড় হয়, আর সাধারণ মানুষের পকেট খালি হয়ে যায়। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় অল্প কয়েকজন, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয় কোটি কোটি নিরীহ মানুষকে।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে কত সুন্দরভাবে বলেছেন:

> “যে ব্যক্তি একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করলো, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করলো। আর যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করলো, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করলো।” — (সূরা আল-মায়েদা: ৩২)

তাই এখন বিশ্ববাসীর দোয়া একটাই — আল্লাহ যেন আর কোনো দেশের ক্ষমতা এমন হাতে তুলে না দেন, যারা বোমা দিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজে, যারা রক্ত দিয়ে রাজনীতি করে, যারা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুরো পৃথিবীকে যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দিতে পারে।

আমরা চাই, নেতৃত্ব আসুক তাদের হাতে —
যারা শান্তিকে ভালোবাসে, যারা মানবতাকে সম্মান করে, যারা শিশুর কান্না শুনে কষ্ট পায়, যারা যুদ্ধ নয়, কূটনীতি দিয়ে শান্তি আনতে চায়।

রাসূল (সা.) বলেছেন: _”তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সে, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।”

যুদ্ধবাজরা কখনোই মানবতার উপকারী হতে পারে না। তারা শুধু ধ্বংসই দিতে পারে।

এই ভূমিকম্প আমাদের শেখায় — ক্ষমতা, টাকা আর অস্ত্র চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী হলো সত্য, ন্যায় আর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল।

আজ ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ভোটের কাছে হেরেছে, কাল হয়তো আরও বড় পরাজয় আসবে। কারণ আল্লাহর ওয়াদা সত্যঃ
“আর তোমরা হতাশ হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।” — (সূরা আলে ইমরান : ১৩৯)


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট