রংপুরে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার, হত্যার সন্দেহ

প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০২৬

রংপুরে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার, হত্যার সন্দেহ

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষকসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুইজনকে আটক করা হয়েছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে তালাবদ্ধ বাড়িটির তালা ভেঙে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।

নিহতরা হলেন: রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ওরফে জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)।

এই ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। সম্পর্কে তারা মামাতো ভাই। পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ওই দুজন মিলে চারজনকে হত্যা করেন।

পুলিশ বলছে, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিভিন্ন কক্ষের জিনিসপত্র এলোমেলো এবং টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার স্থানগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় পাওয়া গেছে।

গণপতি চক্রবর্তী শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। তার মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী রংপুরের কারমাইকেল কলেজে স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তাদের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে।

পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিবারের কাউকে মোবাইল ফোনে কল করে না পেয়ে স্বজনদের সন্দেহ হয়। তারা বাড়িতে এসে প্রধান দরজা বন্ধ পান। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পাশের বাড়ির প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢোকেন। পরে ঘরের জানালা খুলে ভেতরে সবকিছু এলোমেলো ও দুর্গন্ধ দেখতে পান। একপর্যায়ে মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।

পরে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ পুলিশের বিভিন্ন শাখার সদস্যরাও ঘটনাস্থলে যান।

ঘটনাস্থলে গণপতি চক্রবর্তীর ভাবি শেফালী রানী বলেন, শনিবার রাত ১০টার দিকে তারা খবর পান, বাড়ির কেউ ফোন ধরছেন না। পরে মেয়ে ও জামাইকে সঙ্গে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে সেখানে আসেন তিনি।

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা রানী বলেন, শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে প্রথমে তিনি বোনকে ফোন করেন। ফোন বন্ধ পান। পরে ভাগ্নি, দুলাভাই ও ছোট ভাগ্নেকে ফোন করেও সবার ফোন বন্ধ পান। এতে তার সন্দেহ হয়। এরপর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান তিনি।

মহানগর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমূল কাদের বলেন, পুলিশ ও সিআইডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

ওসি জানান, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ বাড়ির ছাদ থেকে, তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ তিনতলায় ওঠার সিঁড়ি থেকে এবং ছেলের মরদেহ খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছাদে একজন, চিলেকোঠায় দুইজন ও ঘরে একজনের লাশ পাওয়া গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে বলা যাচ্ছে না কীভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে লাশ দেখে ধারণা করা যাচ্ছে, তিন-চার দিন আগে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, বাড়ির যেসব স্থানে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণ রাখা হয়, সেগুলো ভাঙা এবং ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো পাওয়া গেছে। বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল। ডাকাতির ঘটনা হতে পারে—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে তদন্ত না করে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্বামী-স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। রবিবার (২৩ আগস্ট) ভোরে তাদের আটক করা হয়।

আটক দুই যুবক হলেন-সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তারা চার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আটক দুই যুবক হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। আমরা সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাব।’

নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলায় একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। হত্যার কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত জানতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

এদিকে রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে দুইজন খুনি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে উনাদের ছাদে আসে। বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। এ সময় শব্দ পেয়ে খালি গায়ে গলায় গামছা নিয়ে ছাদে ওঠেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। তখন ওই গামছা দিয়েই তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী শব্দ শুনে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠতে গেলে তাকে সিঁড়িতেই হত্যা করেন তারা। পরে শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন ওই দম্পতির মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ করে দিতে পারে; এমন আশঙ্কায় তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট