সিলেটে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মী হত্যার ঘটনায় আটক ১, তছনছ বাসা-খোয়া গেছে কাগজপত্র

প্রকাশিত: ৯:৩২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২৬

সিলেটে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মী হত্যার ঘটনায় আটক ১, তছনছ বাসা-খোয়া গেছে কাগজপত্র

সিলেট নগরীর রায়নগরে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মী হত্যার ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের একজনকে আটক করেছে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। বুধবার (১২ ) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নগরীর রায়নগর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত বাবুল মিয়ার (৪০) স্থায়ী বাড়ি চাঁদপুর হলেও সে বর্তমানে রায়নগর এলাকায় আক্তার মিয়ার কলোনিতে বসবাস করছিল। বাবুল মিয়া পেশায় রংমিস্ত্রি ও কসাই।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মঈনুল জাকির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের হয়নি।

এরআগে বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে মিতালী ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

নিহতরা হলেন, বিয়ানীবাজার আখাখাজনা গ্রামের বাসিন্দা, বর্তমানে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫)।

জানা যায়, আব্দুস সাত্তার দীর্ঘদিন ধরে পরিবারসহ ওই বাসার দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন। তার চার সন্তানই বিদেশে থাকেন। যার মধ্যে দুইজন থাকেন যুক্তরাজ্যে ও দুইজন যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে বাসায় স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মী ছাড়া আর কেউ থাকতেন না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনলেও সেটিকে গুরুত্ব দেননি প্রতিবেশীরা। পরে সকাল ১০টার দিকে বাসার দরজা বন্ধ এবং দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে সন্দেহ হয়। বিষয়টি জরুরি সেবায় (৯৯৯) জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসার ভেতরের কক্ষগুলোতে পৃথকভাবে মরদেহ পড়ে ছিল এবং ঘরের আলমারি ও ওয়াড্রোব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। বাসার পেছনের দরজা দিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিঁড়ির দিকে রক্তের দাগও পাওয়া গেছে।

চাঞ্চল্যকর এই ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বৃদ্ধ দম্পতি আব্দুস সাত্তার (৮২) ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২)।

মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে। প্রায় ১৫-২০ দিন আগে ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঘটনার দিন সকালে বাবুল একটি ছুরি নিয়ে ওই বাসায় গেলে তাহমিনা তাকে ভেতরে ঢুকতে দেন। সেখানে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। তাকে বাঁচাতে সুরাইয়া বেগম ও পরে বাসার মালিক আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে ঘাতক বাবুল তাদের দুজনকে একইভাবে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনটি রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। পুলিশ কমিশনার আরও জানান, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে নিহত আব্দুস সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। মেঝেতে একটি দলিলের কপিও পাওয়া গেছে।

হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না পুলিশ। তবে নগরের রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধ ও মামলার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। কারণ, ওই মামলার একটি শুনানি আগামী ১৯ আগস্ট হওয়ার কথা ছিল।

নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেখানে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন আব্দুস সাত্তার। ২০২৩ সালে তিনি ওই সম্পত্তি নিয়ে স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২১১/২৩। পরে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলায় আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটির নম্বর ৭০/২৩ এবং আগামী ১৯ আগস্ট শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল।

আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক আরও বলেন, প্রতিটি শুনানিতে আব্দুস সাত্তার আদালতে হাজিরা দিতেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি শুনানিতে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ওই দিন সিরাজুল ইসলাম তাঁকে হুমকি ও খারাপ ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা, পরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে বাসার সিসিটিভি ক্যামেরাও বন্ধ ছিল। তবে পুলিশ বলছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই কেউ বাসায় প্রবেশ করে থাকতে পারে। বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে। রিকাবীবাজারের জায়গা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনজনকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য, আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম বাসায় একাই থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে একজন গৃহকর্মী থাকতেন। নিহত দম্পতির আত্মীয় মুন্না মিয়া জানান, বুধবার সকাল নয়টার দিকেও তাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপরই তাঁদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর চার সন্তান- দুজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুজন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তাঁদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। ফলে বুধবার পর্যন্ত নিহত দম্পতির সন্তানদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।


 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট